ইসলাম থেকে

ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ্জ্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: যে পাঁচটি ভিত্তির ওপর ইসলাম দাঁড়িয়ে রয়েছে তার মধ্যে হজ অন্যতম স্তম্ভ। এটা শুধু অন্যতম স্তম্ভই নয় বরং সবচেয়ে কঠিন তথা কষ্টসাধ্য অবশ্য পালনীয় সাবজেক্টও বটে।

হজ ফরজ হওয়ার জন্য যে শর্তগুলো প্রয়োজন তা হলো : ১. মুসলমান হওয়া, ২. গোলাম না হওয়া অর্থাৎ স্বাধীন হওয়া, ৩. সুস্থ হওয়া অর্থাৎ রোগাক্রান্ত না হওয়া, ৪. উন্মাদ বা পাগল না হওয়া ৫. পারিবারিক খরচাদি বাদে মক্কা সফরের মতো অর্থ থাকা, ৬. মহিলাদের সাথে স্বামী বা মুহরেম পুরুষ থাকা, ৭. বালেগ হওয়া। এছাড়া হজ সম্পাদনকারীর জন্য রাস্তার নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

হজ ফরজ হওয়া সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন- মানুষের ওপর আল্লাহর এ অধিকার রয়েছে যে, যার এ ঘর পর্যন্ত পৌঁছাবার সামর্থ্য রয়েছে সে যেন এর হজ সম্পন্ন করে আর যে এ নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করবে, তার জেনে রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি কিছুমাত্র মুখাপেক্ষী নন (সূরা আল ইমরান, আয়াত : ৯৭)

কুরআনুল কারীমের উল্লিখিত আয়াতে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য হজ অবশ্য পালনীয় একটি ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হজ অস্বীকারকারীকে মহান রাব্বুল আলামীন শুধু ভৎসনাই করেনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

হজ অন্যান্য ইবাদত থেকে একটি ব্যতিক্রমী আনুষ্ঠানিক ইবাদত। হজ সম্পাদন করতে হলে অর্থ ও শারীরিক পরিশ্রম দুটোই প্রয়োজন। মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের নিকট থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ দুটোরই সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কুরবানি দাবি করেছে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন- হে বিশ্বাসী লোকেরা।

আমি কি তোমাদেরকে এমনি একটি ব্যবসায়ের কথা বলে দেবো? যা তোমাদেরকে পীড়াদায়ক আজাব থেকে রক্ষা করবে। তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আর জিহাদ (পরিশ্রম) কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল সম্পদ ও নিজেদের জান-প্রাণ দ্বারা। আর এতে তোমাদের জন্য অতীব উত্তম যদি তোমরা বুঝতে পার বা জান (সূরা সাফ, আয়াত : ১০-১১)।

জিহাদ শব্দের যে ব্যবহার পবিত্র কুরআনে করা হয়েছে এর অর্থ ও প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা এ সমস্ত সাধারণ অর্থেই এর প্রয়োগ।

পৃথিবীতে আমরা যা দেখতে পাই তা হলো মানুষকেই পরিশ্রমের মাধ্যমে খাদ্য ও উৎপাদন করতে হয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জিনিসকে স্বীয় বুদ্ধি ও আল¬াহর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রূপান্তর ঘটিয়ে ব্যবহার উপযোগী করতে হয়। নিত্যনতুন আবিষ্কার জীবন পদ্ধতির মানোন্নয়ন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অগ্রগতির ক্ষেত্রে চিন্তা-গবেষণার বৈচিত্র্য নয়াদিগন্তের দ্বার উদঘাটনসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্বারা অত্যাশ্চর্য উদ্ভাবন দিয়ে সমাজ জীবনের পরিবর্তন ও পরিবর্ধনে অবিশ্বাস্য রকমের ভূমিকা রাখছে।

মানুষ ব্যতিরেকে আর অন্য কোনো জীবের ক্ষেত্রে এ সমস্ত বৈশিষ্ট্য প্রযোজ্য কি না তা আমার জানা নেই। এ আলোচনা থেকে একথা পরিষ্কারভাবে বুঝা গেলো যে, মানুষকে আল¬াহ রাব্বুল আলামীন শ্রম নির্ভর করেই সৃষ্টি করেছেন আর তাঁকে তিনি কঠোর শ্রম সাধনা করেই সার্বিক উন্নতি করতে হবে। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন- আমি মানুষকে শ্রম নির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি (সূরা বালাদ, আয়াত : ৩)

এ আলোচনায় আমি যা বুঝাতে চেয়েছি তা হলো হজ মানুষের আর্থিক ব্যয়ের সাথে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম লব্ধ একটি ইবাদত যা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম খুঁটি। মানুষকে খিলাফাতের দায়িত্ব পালন করতে হলে অবশ্য কষ্টসাধ্য শ্রম সাধনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। মুসলমানদের জন্য হজ অবশ্যই এ রকম একটি পরীক্ষাক্ষেত্র।

পবিত্র হজের দ্বিতীয় যে শিক্ষণীয় দিক তা হলো বিশ্ব মুসলিমের এক মহামিলন সমাবেশ। পৃথিবীর সব ভাষা, গোত্র, বর্ণ শাসক-শাসিত, আঞ্চলিকতা, সঙ্কীর্ণ জাতীয়তা এবং ভূখণ্ডগত পরিচয়কে উপেক্ষা করে সব মানুষ এক আদম (আ.) এর সন্তান ও আল্লাহর বান্দা এ সত্যকে বাস্তবে রূপায়নের অকৃত্রিম চিত্রই হলো হজ।

বিশ্বের প্রতিটি মুসলমানই ভাই ভাই তার অনুশীলন এ হজব্রত পালনের মাধ্যমে হয়ে যায়। এ মর্মে পবিত্র কুরআনুল কারীমে যথার্থই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন- অবশ্যই মু’মিনগণ পরস্পরে ভাই ভাই (সূরা হুজরাত)

বিশ্বের সব মানুষ একদিন হাশরের মাঠে আল¬াহর দরবারে হাজির হবে। আর পৃথিবীতে প্রতিবছর হজযাত্রীরা সেলাই বিহীন দু’খণ্ড সাদা কাপড় পরিধান করে আল্লাহর ঘর তাওয়াফের মাধ্যমে সে কবর তথা পরকালের কথাই স্মরণ করে থাকে।

বিশ্ব মানবতার সভ্যতা, সংস্কৃতি ও তাদের আল্লাহপ্রদত্ত জীবন-যাপন পদ্ধতি কাবাকে কেন্দ্র করে কিভাবে গড়ে উঠতে পারে তার প্রতিচ্ছবি হজের মাধ্যমে পরিস্ফূটিত হয়ে উঠে। মানুষ এবং জ্বিনকে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। এ ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দু আল্লাহ বানিয়েছেন মক্কার কাবাগৃহকে। এ মর্মে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন- এ কথা নিঃসন্দেহ যে, মক্কায় অবস্থিত ঘরখানাকেই মানুষের ইবাদতের ঘর হিসেবে সর্বপ্রথম তৈরি করা হয়েছে। (সূরা আল ইমরান, আয়াত : ৯৬)

পৃথিবীতে মক্কা এবং কাবাগৃহ এমন এক স্থানে অবস্থিত যেখানে মানুষের জীবন-যাপন অতি কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মরু অঞ্চলের পাহাড় পর্বতবেষ্টিত দুর্গম অনূর্বর ভূমিতে মহান রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছায় মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম (আ.) স্বীয় স্ত্রী হজরত হাজেরা (আ.) ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)কে এ জনমানবহীন মরু অঞ্চলে রেখে আসেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার অপার মহিমায় সেখানে জমজম কূপের সৃষ্টি হয়।

সাধারণত যেখানে পানির উপস্থিতি থাকে সেখানে পাখির কলতান লক্ষ্য করা যায়। অনেক দূর থেকে বনি জরহুম গোত্রের একটা বাণিজ্য কাফেলা মক্কার বিরান মরুভূমির উপর পাখি উড়তে দেখে সেখানে উপস্থিত হয় এবং হজরত হাজেরা (আ.)-এর অনুমতিক্রমে জনবসতি গড়ে তোলে। ঐ জনবসতি ও ইসমাইল (আ.) বংশধরেরাই মক্কার কুরাইশসহ বিভিন্ন গোত্রসমূহের উদ্ভব ঘটে এবং অধূনা মক্কা নগরীর গোড়াপত্তন হয়। মক্কার কাবাই হলো বিশ্ব মুসলিমের আদি ও আসল আইনের উৎস ভবন যা মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক তথা আদর্শিক রাজধানীও বটে।

এখানে একটা প্রশ্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে, বিশ্ববাসীর সভ্যতা, সংস্কৃতি, দর্শন, গবেষণা, প্রশাসন, বিচারসহ সার্বিক আদর্শের কেন্দ্রভূমি বিশ্বের একটি মনোমুগ্ধকর বিলাসবহুল অঞ্চলে হওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু তা না হয়ে একটি রুক্ষ আবহাওয়ার অন্তর্ভুক্ত উষর অঞ্চলে হওয়ার অর্থ কি?

এ প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ- আর তা হলো বিশ্বে বৈরী পরিবেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী পরিশ্রমী, কষ্টসহিষ্ণু, ধৈর্যশীল ও সাহসী হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশ্বের সর্বশেষ পয়গম্বরকে দিয়ে সারা দুনিয়ায় যে আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ করাবেন তার সহযোগীদেরকেও সে রকম অভাবনীয় গুণের অধিকারী, ধৈর্যশীল ও সাহসী হতে হবে যা একমাত্র বৈরী পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে বেড়ে উঠা জনগোষ্ঠীর দ্বারাই সম্ভব।

মক্কার মুশরিক কাফেররা আকাক্সা করতো যে, তাদের নগরটা যদি আরো প্রশস্থ, ভূমিটা শস্য-শ্যামলীমায় ও পরিবেশটা বিলাসবহুল হতো তাহলে কতই ভালো হতো। এ সম্পর্কিত একটা ঘটনা এভাবে উলে¬খ করা যেতে পারে যে, একদা আবু জেহেলসহ কুরাইশদের নেতারা মহানবী (সা.)কে একটা বৈঠক ডেকে পাঠালো এবং তারা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর নিকট যে কয়টা প্রস্তাব পেশ করলো তার একটা ছিল এ রকম : হে মুহাম্মদ (সা.)! আমরা যে কয়টা প্রস্তাব পেশ করলাম তোমার কাছে তার কোনোটাই যদি যুক্তিযুক্তভাবে গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে আর একটা কথা শোন।

তুমি তো জান, দুনিয়ায় আমাদের মতো সঙ্কীর্ণ আবাসভূমি আর কারো নেই, পানির অভাব ও অন্যান্য উপকরণের দৈন্যের কারণে আমরা যেরূপ দুঃসহ জীবন যাপন করি, পৃথিবীতে আর কোনো জাতি এমন জীবন যাপন করেন না। সুতরাং তোমার যে প্রভু তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন তার কাছে প্রার্থনা কর যেন তিনি এ পাহাড়-পর্বতগুলোকে দূরে সরিয়ে দেন যাতে আমাদের আবাসভূমি আরো প্রশস্থ হয় এবং তিনি যেন ইরাক ও সিরিয়ার নদনদীর মতো আমাদের এ দেশেও নদ-নদী প্রবাহিত করে দেন …।

তাহলে আমরা তোমার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবো …। রাসূলুল¬াহ (সা.) তাদেরকে বললেন, এসব ব্যাপার নিয়ে আমি তোমাদের কাছে আসিনি। আল্লাহ আমাকে যে জিনিস দিয়ে পাঠিয়েছেন তাছাড়া আর কোনো কিছু আমার ইখতিয়ারে নেই। আর যা দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে তা আমি তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। এটা যদি তোমরা গ্রহণ কর তাহলে এটা দুনিয়াতে ও আখিরাতে তোমাদের সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দেবে (সিরাতে ইবনে হিশাম)।

এ উদাহরণের দ্বারা আমরা এ কথা বুঝতে পারি যে, এ সঙ্কীর্ণ ভূমিকেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বাছাই করে এখানে নিদর্শনসমূহ স্থাপন করে বিশ্ববাসীর সামনে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। এ মর্মে তিনি ঘোষণা করেন- ‘এতে সুস্পষ্ট নির্শনসমূহ রয়েছে ইবরাহীম (আ.) এর ইবাদতের জায়গাও রয়েছে’ এর অবস্থা এই যে, এতে যেই প্রবেশ করল সে নিরাপদ হলো (সূরা আল ইমরান, আয়াত : ৯৭)

বর্ণিত আয়াতে নিদর্শনগুলো কিছু পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। আল¬াহ তাঁর নিজস্ব ঘরকে উষর ও ধূসর মরুভূমির ওপর যে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং আল্লাহর ঘরের নিকটে আসলে যে, পূর্ণ নিরাপত্তা সবাই পায় তার নজির স্থাপন করেছেন। এভাবেই আল্লাহর আইন বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু মানুষ কেন সকল প্রাণীই ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক বিচার পাবে।

যেমন আইয়্যামে জাহেলিয়াতের বর্বর যুগেই কাবার হেরেমে কেউ প্রবেশ করলে সে নিরাপত্তা লাভ করতো। এসব বিষয় কাবাকেন্দ্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাতেই মানুষ লক্ষ্য করতে পারে এবং হজ ও ওমরাহ হলো তার বাস্তব প্রশিক্ষণ।

এরপর আমি কুরবানি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করতে চাই। শরীয়তের পরিভাষায় কুরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য চূড়ান্ত বা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার। শব্দগত অর্থে ক্বরব থেকে যে কুরবানির উৎপত্তি হয়েছে তার অর্থ নৈকট্য লাভ। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য আল্লাহর হুকুম পালনকে সবকিছুর ওপরে স্থান দেয়া।

মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম (আ.) এর ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্তকে আমরা আনুষ্ঠানিক পশু কুরবানির মাধ্যমে উপস্থাপন করে থাকি। ইবরাহীম (আ.) এর জীবনটাই ছিল কুরবানির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জালিম শাসক নমরূদ কর্তৃক অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়া, তাওহীদ সম্পর্কিত বিতর্কে নমরূদের ওপর জয়লাভ, মিসরে অত্যাচারী শাসকের হাতে স্ত্রীসহ গ্রেফতার হয়ে নিগৃহীত হওয়া স্ত্রী ও শিশু পুত্রকে ইসমাঈল (আ.)কে মক্কার জনমানবহীন মরু অঞ্চলে রেখে আসা এসবই ছিল তার জীবনের এক একটি কুরবানির দৃষ্টান্ত।

এসব কিছু করেছিলেন তিনি এক আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সন্তুষ্ট তথা তার হুকুম পালনকে একমাত্র কর্তব্য মনে করে। ইবরাহীম (আ.) দ্বীনই যে আমাদেরকে অনুসরণ করতে হবে এবং বিশ্বনবী (সা.)-এর শরীয়তই যে, পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা তা পবিত্র কুরআন এবং হাদীসে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হয়েছে।

এ মর্মে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন- বল! আল্লাহ সত্য বলেছেন, তোমাদের সকলেরই একমুখী হয়ে ইবরাহীম (আ.)-এর পন্থা অনুসরণ করা কর্তব্য। (সূরা আল ইমরান, আয়াত : ৯৫)

মানুষকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টির সেরা জীব করে বিশ্বে খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। প্রচেষ্টা, কর্মে, দর্শনে, প্রেম-ভালোবাসা ও চিন্তায় একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকেই মানুষের অন্তরে স্থান দিতে হবে। অন্যকোনো সত্ত্বাকে নয়।

আর এর বাস্তব উদাহরণ হলেন পৃথিবীতে আম্বিয়ায়ে কেরামগণ। জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম (আ.) ছিলেন মুসলিম জাতির জন্য জ্বলন্ত উদাহরণ। ইবরাহীম (আ.)র আল¬াহপ্রেম ছিল নজিরবিহীন। পৃথিবীতে মানুষ নিজ, নিজের পরিবার, সন্তান-সন্তুতি, ধনসম্পদ, বন্ধু-বান্ধব ও পারিপার্শ্বিকতার প্রতি আকর্ষণ জন্মে এবং অন্তরে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। আর এটা হওয়াটা স্বাভাবিক।

তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রেম ও ভালোবাসা হতে হবে নিরঙ্কুশ তথা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আল্লাহর জন্য সবচেয়ে প্রিয় ও মহব্বতের বস্তুকে হাসিমুখে ত্যাগ করাই হলো তাঁর আনুগত্য তথা প্রকৃত ইবাদত। ইবরাহীম (আ.) তাওহীদের দাওয়াত ও ইসলামী সমাজ গঠনের পথে অসংখ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃদ্ধ বয়সে পুত্র সন্তান ইসমাইল (আ.)কে লাভ করলেন। তার একমাত্র বংশপ্রদীপ স্বীয় পুত্র ও স্ত্রীর প্রতি মহব্বত সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আল্লাহ তায়ালা সেই শিশুপুত্র ও তার মাকে জনমানবহীন উষর মরুভূমিতে আল্লাহর ইচ্ছায় রেখে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করার মাধ্যমে ইবরাহীম (আ.)-এর এ পর্বের পরীক্ষা নেয়া হলো। এরপর এলো সে চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষার সন্ধিক্ষণ। পৃথিবীতে সবচেয়ে মহব্বতের বস্তু শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.), কিন্তু আল্লাহর দান এ সন্তান, কখনো মহব্বতের ক্ষেত্রে রাব্বুল আলামীনের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। আল্লাহ এ পুত্রের কুরবানি চান তাঁর পিতা ইবরাহীম (আ.)-এর নিকট থেকে।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করেন- তোমরা কিছুতেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা (আল্লাহর পথে) সেসব জিনিস ব্যয় করবে যা তোমাদের নিকট প্রিয় (সূরা আল ইমরান, আয়াত : ৯২)

হজরত ইবরাহীম (আ.) স্বীয় পুত্রকে কুরবানি করতে উদ্যত হলেন- আল্লাহ তাঁর নবীর কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে পুত্রের পরিবর্তে পশুকে কুরবানি হিসেবে গ্রহণ করলেন। ইবরাহীম (আ.)-এর এ সুন্নাতকে আমাদের ওপর জারি আছে। আমরা যে পশু কুরবানি করি তার অর্থ হলো মনের যাবতীয় পশুবৃত্তিকে জবাই করে এক আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজকে সোপর্দ করা। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ঘোষণা করলেন- পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছে না। কিন্তু তোমাদের তাকওয়া তাঁর নিকট অবশ্যই পৌঁছে। (সূরা হজ, আয়াত : ৩৭)।

১০ জিলহজ কুরবানির দিনকে বিশ্বনবী (সা.) ঈদের দিন হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ঈদ অর্থ খুশি। মানুষ যখন খুব জটিল ও কঠিন কাজ সম্পাদন করে তখন অনাবিল আনন্দ লাভ করে। কুরবানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সম্পন্নের দিন যে ঈদ বা খুশি তা একমাত্র আল্লাহর শোকরিয়া আদায়ের জন্যই। আল্লাহ আমাদের হজ ও কুরবানির ফায়দা লাভের তাওফিক দান করুন। আমীন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close