অন্য পত্রিকা থেকে

ঈদের একাল: সম্পর্কের আকাল

শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া: এক ফালি বাঁকা চাঁদের হাসি নিয়ে বছর ঘুরে ঈদ আসে। দুনিয়াজুড়ে মুসলমানরা মেতে ওঠে উৎসবের আনন্দে। যুগে যুগে সে আনন্দের ধরন পাল্টায়।

শৈশবে পরিবারে পালা গরু কোরবানি দিতে দেখেছি। সে গরু দেড়-দুই বছর ধরে অনেক যত্নে পালা হতো। হাট থেকে যে গরু কেনা হতো, সেটাও গেরস্তের পালা গরু। ‘ভারতীয় গরু’ বলে কোনো কথা শুনিনি। ভারতীয় বা নেপালি গরুর জন্য কাউকে অপেক্ষা করতেও দেখিনি।

কোরবানির পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দরদামে এক ধরনের আন্তরিকতা দেখা যেত। বিক্রেতা আকাশছোঁয়া দাম হেঁকে নিলামের ঢঙে গ্যাঁট হয়ে থাকতেন না, ক্রেতারাও দাম একটু বাড়িয়ে কিনতে দ্বিধা করতেন না। সেরকম বাণিজ্যিক বিকিকিনি ছিল না।

এখন কোরবানির সময় ভারতীয় আর নেপালি গরু না এলে বাজার জমে না। দরদামে থাকে শতভাগ বাণিজ্য। কে জিতল, কে ঠকল, কারটা সরস, কারটা নীরস—এই হিসেব চলে দিনরাত। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার মতো মহানগরে অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, গতিশীল জীবনধারার কারণে ঈদের আনুষ্ঠানিকতার ধরনও গেছে বদলে।

শৈশবে দেখেছি, আগে গরুর মাংস কাটা হতো পরিবারের সদস্য বা নিকট স্বজনদের দিয়ে। এমনকি অবস্থাপন্ন বাড়ির বড় কর্তাও লুঙ্গি কাছা মেরে চামড়া ছিলতে লেগে যেতেন। এখন কোরবানির সময় কর্তাব্যক্তিরা বড় জোর গরুর গলায় ছুরি চালানো পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কেউ কেউ তো দেখাই দেন না। আবার এমন দৃশ্যও দেখা যায়, কর্তা পেছনে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, কাটাকুটি করছেন ভাড়াটে লোকজন।

ঢাকায় সাধারণত সবজি বিক্রেতা, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, গাড়িচালক, দোকানি—এরাই কোরবানির পশু কাটাকুটির কাজ করেন। পেশাদার মাংসবিক্রেতা হলে তাঁর দর আরও উঁচুতে। প্রতি হাজারে ২০০ টাকা। অর্থাৎ ৫০ হাজার টাকা দামের একটি কোরবানির গরু পুরোটা কেটেকুটে তাঁরা দশটি হাজার টাকা গুনে নেবেন। এমন ১০টি গরু পেলে কয়েক ঘণ্টায় লাখপতি!

কোরবানির পশু কেনার সময় অনেকে কাটাকুটির লোকজনকে সঙ্গে নেন। এ জন্য আলাদা বকশিশ দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পশুর দামের ওপর এই বকশিশ নির্ভরশীল। তবে তা হাজার টাকার নিচে নয়। কাটাকুটির লোকজনের মধ্যে যাঁরা চালাক-চতুর, গরু-ছাগল কেনার সময় তাঁদের লক্ষ্য থাকে একটু বেশি দামের মধ্যে কেনা। তাহলে শতকরা হিসেবে মজুরির পাল্লাও ভারী হবে।

কোরবানির মাংস বিলোনোর ক্ষেত্রে স্বজন ও পড়শিরা অগ্রগণ্য। এখন অনেক ক্ষেত্রেই পড়শিরা উপেক্ষিত। কারণ ফ্ল্যাট-সংস্কৃতির এ যুগে পাশের জনকেই কেউ চেনেন না, সারা বছর খোঁজ তো দুরের কথা। ফলে দেওয়া-থোয়ার আর হয় কীভাবে?

স্বজনদের বাড়ি মাংস দেওয়ার ক্ষেত্রে গাড়ি থাকলে খুব কাজ দেয়। অনেকে গাড়ি ভরে মাংস নিয়ে বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসেন। গাড়ি না থাকলে যাত্রাবিভ্রাট আর বিড়ম্বনার কথা ভেবে অনেকে যেতে চান না। এমনও দেখেছি, একজন আরেকজনকে ফোনে বলছেন, ‘ধরো, তোমার বাড়িতে আমি মাংস দিয়েছি, তুমিও আমার বাড়িতে দিয়েছো। ব্যস, যাওয়া-আসার দরকার নেই।’

পশুর বর্জ্য ফেলা নিয়ে চলে আরেক কেলেঙ্কারি। অনেকেরই ভাবটা এমন-কোরবানি তো হয়েই গেল, বর্জ্যটা কোনোমতে কোথাও নিকেশ করতে পারলেই হলো। এ কারণে যত্রতত্র আবর্জনায় ভরে যায়। ঈদের পরের কয়েকটা দিন রাস্তায় চলাফেরা করা দায়।

এর পরও মহানগরগুলোতে ঈদ আসে মহা আনন্দ নিয়ে। যাঁদের ফ্রিজ ভরা মাংস, অনেকে ঈদের পর সময় সুযোগ বুঝে স্বজন, শুভানুধ্যায়ী, বন্ধু-বান্ধবকে দাওয়াত করে খাওয়ান। অনেকে বাসার ছাদে শিক কাবাব ও বারবিকিউ উৎসবের আয়োজন করেন। এ আনন্দের রেশ থাকে অনেক দিন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close