অন্য পত্রিকা থেকে

বেগম জিয়ার লন্ডনের সভায় বিশৃঙ্খলাঃ তারেক রহমান কি ভেবে দেখবেন (ভিডিও)

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ: লন্ডনে ঈদ ছিলো বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫। এদিন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে থাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে প্রবাসীদের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের জন্য লন্ডনের বার্কিং এর একটি হলে সমাবেশের আয়োজন করেছিলো।

আয়োজনকারীরা ছিলেন বিএনপির বর্তমান কমিটি এবং তত্বাবধানে ছিলেন তারেক রহমান। এরকমভাবেই লন্ডনের কমিউনিটিতে ধারণা বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিলো এবং দাওয়াত যখন দেয়া হয়েছিলো তখন বেছে বেছে দেয়া হয়েছিলো।

এই দাওয়াতে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ব্রিটেনের বিভিন্ন পেশায় কর্মরত- যারা মূলধারার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পেশা তথা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, সলিসিটর, ব্যারিস্টার, কাউন্সিলর, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী অনেকেই। ছিলেন বাংলা মিডিয়ার সাংবাদিক এবং বিএনপি দলীয় নেতা কর্মীরা।ছিলো নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি পেশাজীবী বেসরকারি সিকিউরিটির লোকজন।

০১) বেগম জিয়া একজন রাজনীতিবিদ, তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সব চাইতে বড় যে পরিচয়- তাহলো তিনি খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। বিএনপির দলীয় সর্বোচ্চ নেত্রীর উপস্থিতিতে প্রবাসীদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়- স্বাভাবিকভাবেই অনুষ্ঠানটি যে বিরাট গুরুত্ব রাখে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

একদিকে যেমন খালেদা জিয়া- চেয়ারপার্সন, অপরদিকে দলের ভাবী নেতা ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, আছেন দলীয় সর্বোচ্চ ফোরামের আরো কয়েকজন নেতা, ব্যবসায়ী এবং জিয়া পরিবারের আগামীর উত্তরসূরীরাও। এরকম অনুষ্ঠান যে হবে উন্নতমানের দলীয় চিন্তা চেতনা প্রবাসীদের সাথে শেয়ার করার সুন্দর এক উপস্থাপনা- সেটা নিয়ে ছিলো দেশে এবং বিদেশে অনেক আগ্রহ ও ব্যাপক জল্পনা।

একদিকে দেশে যেমন জল্পনা ছিলো আজকে বেগম জিয়া কি বলেন, অপরদিকে প্রবাসী পেশাজীবী যারা দেশের রাজনীতির খোজ খবর একটু আধটু রাখেন,তাদের মধ্যে জল্পনা ছিলো বিএনপি বাংলাদেশ নিয়ে এবং বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষিতে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কি ভাবছে- সেই সব জানা যাবে এমন জল্পনা ছিলো কমিউনিটিতে।

[youtube id=”Xgww3eWkf4A” width=”600″ height=”350″]

দেশের এবং লন্ডনের এই দুই জল্পনা ও আশার মধ্যে গুড়েবালি ঢেলে দেয় বিএনপির দলীয় নেতা কর্মীদের উচ্ছৃংখল আচরণ- এমনকি দলীয় ভাইস চেয়ারম্যান বার বার বলার পরেও বিএনপি নেতা কর্মীদের উচ্ছৃঙ্খল আচরন কিছুতেই বন্ধ হচ্ছিলোনা। এমনি অবস্থায় দলীয় চেয়ারপার্সনকে ধাক্কা-ঠেলা এমনকি মঞ্চে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায়ও দলটির নেতা কর্মীদের মধ্যে সামান্যতম শৃঙ্খলা ও শালীনতার উদ্রেক না হওয়ায়- সভায় আগত অতিথি সকলেই বিস্মিত ও হতবাক হয়ে যান।

দলীয় নেতা কর্মীদের উচ্ছৃঙ্খল আর হৈ চৈ এমনকি সিকিউরিটি বেষ্টনি বেধ করে মঞ্চে উঠে হৈ হুল্লুড আর খেলার মাঠের মতো নোংরামি আচরন- হতবাক হয়ে বেগম জিয়া যখন বলেন, এখানে দেখছি দেশের মতো অবস্থা- তখনো দলটির নেতা কর্মীরা হাততালি দিতে থাকেন, যা দৃষ্ঠি কঠুই শুধু লাগেনি, বিবেক বোধ শক্তি হারিয়ে তারা ছবি তোলার জন্য হয়ে পরেন বেপরোয়া। এমনি অবস্থায় বেগম জিয়াকে বক্তৃতা বন্ধ করে দিতে হয়। হলে তখন চলছিলো হুড় মুড়িয়ে মঞ্চে উঠার উম্মত্ত প্রতিযোগিতা।

এখানে যারা ছিলেন, যারা উচ্ছৃঙ্খল আচরন করেছিলেন, হৈ চৈ করেছিলেন, নেত্রীকে ধাক্কা ধাক্কি দিয়েছিলেন- এরা সবাই বিএনপির নেতা কর্মী, অন্য কেউ নয়।এদের এই উচ্ছৃংখলতা নতুন নয় । তারেক রহমান যখন লন্ডনে প্রথম অনুষ্ঠান করেন পামট্রিতে- সেখানেও ছিলেন বিএনপির নেতা কর্মী।

এরপরেও তারেক রহমান লন্ডনে আরো পাচটি অনুষ্ঠান করেছেন। মোট এই ছয়টি অনুষ্ঠান। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে বিএনপি দলীয় নেতা কর্মীরা হৈ চৈ আর উচ্ছৃংখল আচরন করেছেন। একটি অনুষ্ঠানও তারেক রহমান তার টিম দিয়ে পরিপূর্ণ শৃংখলার সাথে করতে সক্ষম হননি।

সর্বশেষ বেগম জিয়ার উপস্থিতিতে এমন ন্যাক্কারজনক ভাবে অনুষ্ঠান উপহার দিলেন- যখন প্রয়োজন ছিলো জনগনের নির্দেশনা পাওয়ার। প্রশ্ন হলো- এরকম উচ্ছৃঙ্খল আচরন করার জন্য অনুষ্ঠান কেন তাহলে? এগুলো কি এড়ানো যায়না ?

ঈদ শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে যে সব ব্রিটেন প্রবাসী পেশাজীবী ছিলেন তারা কেউই এরকম ছবি তোলার জন্য কিংবা বেগম জিয়ার পাশে দাড়ানোর জন্য ক্যামেরার পোজ বা মঞ্চে উঠার জন্য ধাক্কা ধাক্কি হৈ চৈ করেননি। কারণ এরা প্রত্যেকেই নিজেদের নর্মস, ভদ্রতা, শৃংখলা, রুচি এবং সভা সমাবেশের কোরাম, ডেকোরাম, ইত্যাদি সম্বন্ধে বিস্তর অবগত।

যে সব সাংবাদিক দাওয়াত পেয়ে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে লন্ডনের সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে ব্যাপক পরিচিত নাহাস পাশা, সায়েম চৌধুরী, পারভেজ সহ অনেককেই সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিলো। দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গেলেন- আর যদি স্থান সংকুলান করার মতো অবস্থা না থাকে তাহলে একটু দৃষ্টি কটু কি মনে হয়না। এই সাংবাদিকগণ কোথাও এভাবে জায়গা চেয়েতো নিতে পারেনা।

আবার অনুষ্ঠান চলাকালিন সময়ে অজোপাড়াগায়ের মতো হুট হুটিয়ে টেবিল উঠিয়ে চেয়ার বিছিয়ে অতিরিক্ত হউক কিংবা অন্যদের জায়গা দেয়ার ব্যবস্থার জন্য হউক- প্রোটোকল ও অনুষ্ঠানের সৌজন্যতা ও মান কোন পর্যায়ে নিয়ে যায় সেটাও আগে ভাগে কি ভাবা উচিৎ ছিলোনা? সিনিয়র সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসনের বসার জায়গার জন্য মানবজমিনের তানজির রাসেলকে শেষ পর্যন্ত না বসার গো ধরলে নজরুল ইসলাম বাসনকেও দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া গত্যন্তর ছিলোনা।

বেগম জিয়াকে মন্ত্রী রিসিভ করবেন মাইকে ঘোষণা দেয়া হলো- অথচ পুরো অনুষ্ঠানে একটি মুহুর্তের জন্যও এমন কোন দৃশ্য চোখে না পড়ায় অনেকের কাছে দৃষ্ঠি কটু লেগেছে। যদি এমন না হয় বা আয়োজন না থাকে, তাহলে এরকম জাতীয় পর্যায়ের নেত্রীর উপস্থিতিতে উদ্ভট ঘোষণা না দিলেই কি নয় ?

একটি অনুষ্ঠান করার জন্য কিছু নিয়ম কানুন, শৃংখলা, মাইন্ড ম্যাপ, রানিং অর্ডার ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে দলীয় সর্বোচ্চ নেত্রীর উপস্থিতিতে ব্রিটেনের মতো জায়গায় যখন এরকম কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর জন্য থাকে অনেক প্ল্যান, প্রোগ্রাম, পরিকল্পনা। সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা বডির অধীনে সুনির্দিষ্ট করে বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ ভাটোয়ারা করে দেয়া হয়।

প্রিয় তারেক রহমান, আগামী দিনে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন, সামনে অনেক কাজ। সব সময় অগুছালো কাজ করলে রাজনীতি এগিয়ে নেয়া যাবেনা। কেবল সমালোচনা নয়, পজিটিভ কিছু কথাও এখানে তুলে ধরতে চাই- নির্মোহ এক আলোচনা হিসেবে। কারণ আপনার দলীয় কোন কর্মী বা নেতা অথবা দলীয় সাংবাদিক কখনো এমন কিছু লিখবেনা বা বলবেননা- সেটা আপনি যতো ভুল ত্রুটি করেননা কেন।

ক) অনুষ্ঠান করার আগে আপনি আপনার তত্বাবধানে একটি নির্দিষ্ট আকারের ( ৪/৫) জনের অথবা ১ জনের একটি অনুষ্ঠান কমিটি করে সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব দিন- এই অনুষ্ঠানটি সার্বিকভাবে সফল করে তোলার জন্য। তাদেরকে পুরো দায়িত্ব বন্টন ও ভাগ করে দিন- কে কি দায়িত্ব পালন করবে। সেই কমিটি অনুষ্ঠানের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করবে(এ টু জেড)তার অধীনস্ত কর্মীদের সাথে নিয়ে বিভিন্ন দায়িত্ব বন্টন করে। সব কিছুর হেড থাকেন আপনি।

খ) লন্ডনে অনেক নামকরা ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের সাথে সিটিং করুন, আলোচনায় বসুন। আপনার রিকুয়ারম্যান্টস উপস্থাপন করুন। তারাও আপনাকে সব কিছু প্রেজেন্ট করবে। তাদেরকে দায়িত্ব দিন এধরনের বড় আকারের অনুষ্ঠান করার জন্য।

গ) নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সিকিউরিটি ফোর্সের বা এজেন্সির সাথে বৈঠকে বসুন, তাদের দায়িত্ব দিন সবিস্তারিত ভাবে- পুরো অনুষ্ঠানের নিয়ম শৃঙ্খলা, অনুষ্ঠানের রানিং অর্ডার তাদের সরবরাহ করুন- দেখবেন নিরাপত্তার জনিত কোন সমস্যা অনুষ্ঠানে দেখা দিবেনা। দলীয় কোন নেতা কর্মীর দ্বারা অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভেঙ্গে মঞ্চে লাফিয়ে উঠে বেগম জিয়াকে ধাক্কা দেয়ার উপক্রম হবেনা।

ঘ) দলীয় ভলান্টিয়ারদের ঠিক করে অনুষ্ঠানের আগে তাদের নিয়ে বসুন, তাদের ব্রিফ করুন কি করতে হবে, কি না করতে হবে, হৈ চৈ কিভাবে কন্ট্রোল করতে হবে- তাদের পুরো বিষয় নিয়ে নিজের ধারণা উপস্থাপন করেন।

ঙ) অতিথি যাদের দাওয়াত দেয়া হবে, সে হউক সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী যেই হউন- তাদের আসনের ব্যবস্থা কনফার্ম করুন। আর অনুষ্ঠানের দরন বুঝে আগে ভাগে আসন বন্টন করুন, অতিরিক্ত আসন আগে থেকে নির্ধারিত করে রাখুন, কমিউনিটির বয়োজ্যেষ্ট, সিনিয়রদের একটু সুবিধাজনক আসন দেয়ার ব্যবস্থা রাখুন।

চ) যে কমিটি করেছেন, তাদের নিয়ে বসুন, তাদের বুঝার চেষ্টা করুন, এরা কি চায়, কি করতে পারবে, কি পারবেনা- পুরো মাইন্ড ম্যাপ নেয়ার চেষ্টা করুন। অহেতুক দায়িত্ব ও ভরসা এদের কাঁধে না দিয়ে অনুষ্ঠান করার মতো দক্ষতা, যোগ্যতা, আর নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষায় নিবেদিত ও সঠিক লোকগুলোকে দিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করেন, এতে কমিটির কোন ক্ষতি কিংবা ছোট হওয়ার বা পাশ কাটানোর মতো বিষয় নয়। কারণ যে যে কাজে দক্ষ ও এফিশিয়েন্ট তাকে দিয়ে সেই কাজ করান।

ছ) অনুষ্ঠান পরিচালনা, উপস্থাপনার উপর নির্ভর করে একটি অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেমন হবে, হলে লোকজন কি রকম আচরন করবে উপস্থাপকের উপস্থাপনার মধ্যেই অনেকটা নির্ভর করে। দলীয় সেক্রেটারি ঠিক- দলের জায়গায়, জাতীয় নেতা নেত্রীকে নিয়ে এরকম অনুষ্ঠানে আজকাল প্রফেশনাল অনেক বাংলাদেশি উপস্থাপক পাওয়া যায়- সেদিকেও নজর দিন।

প্রিয় তারেক রহমান, আপনাকে পরামর্শ দেয়ার জন্য নয়। তবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নেতা নেত্রীদের কিছু নেগেটিভ পজেটিভ বিষয় আলোকপাত গণতন্ত্রের জন্য সুন্দর ও শুভনীয়।

একটি অনুষ্ঠান যদি একবার উচ্ছৃঙ্খল হয়- মেনে নেয়া যায়, দ্বিতীয়বার যদি একই রকম হয়- প্রশ্ন আসে, তৃতীয়বার যদি একই রকম হয়- সফলতা, ব্যর্থতার প্রশ্ন আসে, চতুর্থবারও যদি একই রকম হয়- তখন নেতার ক্যারিশম্যাটিক অবস্থান প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যায়। পাঁচটি নয়, ছয়টি অনুষ্ঠানই একই অবস্থা- তখন কি মনে হয়। এই মনে হওয়া থেকেই আজকের এই অবতারনা। অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close