ফিচার

নিরাপদ নগরীতে দুর্ঘটনা কেন ঘটে?

আহমাদ উল্লাহ: ১১ সেপ্টেম্বরে শুক্রবার মক্কায় তুমুল বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় নির্মাণকাজে নিয়োজিত ক্রেন ভেঙে ঘটে গেল মক্কার ইতিহাসের পঞ্চম বড় দুর্ঘটনা। হস্তি বাহিনীর আক্রমণের পর অত্যাচারী শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের যুগে ঘটেছিল দ্বিতীয় হতাহতের ঘটনা। যাতে হাজ্জাজের আক্রমণে একজন সাহাবিসহ বহু লোক নিহত হন। আর তৃতীয় হতাহতের ঘটনা ছিল ১৯৭৯ সালে শিয়াদের বিদ্রোহের সময়। তখনও বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল।

১৯৮৯ সালে দু’টি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ফলে ঘটেছিল আরেকটি বড় দুর্ঘটনা। তাতে একজন নিহত ও ১৬ জন আহত হন। আর সর্বশেষ মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে গেল গতকাল শুক্রবার। এতে এখনও পর্যন্ত ১০৭ জন নিহত ও ১৮৪ জন আহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে।

এই ঘটনায় মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে রক্ষক্ষরণ শুরু হয়েছে, নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

আল্লাহ তাআলা কোরআনের একাধিক জায়গায় মক্কাকে “নিরাপদ” ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কেন মক্কায় দুর্ঘটনা ঘটে এবং হতাহতের সংবাদ আসে? ক্রেন দুর্ঘটনার পর এই প্রশ্নটি হয়তো বহু মানুষের মনেই জাগ্রত হয়েছে।

সুরাতু আলে ইমরানের ৯৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন –‘যে ব্যক্তি সেখানে (মক্কার হারাম) প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে’। সুরাতুল আনকাবুতের (আয়াত নং ৬৭) আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-‘তারা কি দেখে না যে, আমি (মক্কা নগরীকে) একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল করেছি। অথচ এর চতুপার্শ্বে যারা আছে, তাদের ওপর আক্রমণ করা হয়’। সুরা তীনে আল্লাহ তা’আলা মক্কাকে নিরাপদ শহর হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুরাতুল বাকারায় (আয়াত ১২৫) আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-‘আর স্মরণ করো তখনকার কথা যখন আমি এই গৃহকে (কা’বা) লোকদের জন্য কেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল গণ্য করেছিরাম’।

কোরআনে বর্ণিত উপরোল্লেখিত মক্কা ও মক্কার মসজিদকে “নিরাপদ” বলে আখ্যায়িত করার বিখ্যাত কয়েকটি ব্যখ্যা নিম্নরূপ-

(১) আয়াতে উল্লিখিত নিরাপত্তা বলতে জাহেলি যুগের নিরাপত্তার কথা বোঝানো হয়েছে। তখন হারামে কেউ প্রবেশ করলে আর তাকে কেউ কোনো ধরনের আক্রমণ করতো না। অনেকে সাধারণ অর্থে হারামে প্রবেশকারীর নিরাপদ থাকার অর্থ করেছেন। অর্থাৎ হারামকে আল্লাহ তা’আলা এতোটা মর্যাদা ও গম্ভীরতা দান করেছেন যে, কোনো খুনির কাছ থেকেও কেউ সেখানে খুনের বদলা নিয়ে নিজের হাত রক্তে রাঙাতে চায় না।

(২)হারাম শরিফের নিরাপত্তার মানে হলো, মানুষের গোনাহের ফলে আল্লাহ প্রদত্ত যে আজাব-গজব নাজিল হয়ে থাকে, তা থেকে মক্কার এই মসজিদ নিরাপদ থাকবে। (এই দু’টি ব্যখ্যা ইমাম তাবারির তাফসিরগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।) যেমনটি (সুরাতুল বাকারা ১২৬ নং আয়াতে) ইব্রাহীম আ. দোয়া করেছিলেন।

(৩) পৃথিবীর কোনো শহর ও জনপদ দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে না। কিন্তু মক্কা এবং মদিনা নগরীতে সে প্রবেশ করতে পারবে না। এমর্মে সহিহ বোখারি ও মুসলিমে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর আলোকে অনেক মুফাসসির বলেন-মক্কা ও তাতে প্রবেশকারীর নিরাপত্তা বলতে মানবেতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিতনা দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকার কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে।

(৪) অনেকের মতে, এখানে “সংবাদসূচক শব্দ” ব্যবহার করা হলেও উদ্দেশ্য নির্দেশ জারি করা। যা কোরআনের বহুল প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ একটি পদ্ধতি। উদ্দেশ্য হলো, শাসকরা যেন হারামে প্রবেশকারীদের কোনো প্রকার অনিষ্ট সাধন না করেন, বরং তাদের নিরাপত্তা বিধান করেন। ইমাম জাসসাসসহ অনেকেই এমনটি ইঙ্গিত করেছেন।

(৫) অনেকে বলেছেন, মক্কার হারামে প্রবেশকারীকে নিরাপদ বলার অর্থ হলো, সেখানে কোনোরূপ দণ্ড বাস্তবায়ন চলবে না। সুতরাং সেখানে কোনো খুনি বা কাফেরকে হত্যা করা যাবে না, চোরের হাত কাটা যাবে না ইত্যাদি।

মোদ্দাকথা হলো, নিরাপত্তা’র ব্যখ্যায় আজো পর্যন্ত কোনো তাফসিরবেত্তা এ কথা বলেননি যে, মক্কা ও হারামের নিরাপদ হওয়ার অর্থ-‘মক্কায় মনুষ্যসৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না’। বরং অন্য দশটি শহরের মতো মক্কাতেও এসব ঘটনা ঘটতে পারে। সুতরাং সেসবের সাথে কোরআনে বর্ণিত নিরাপত্তার ঘোষণার কোনো সাংঘর্ষিকতা নেই।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close