ফিচার

একটি চলচ্চিত্রের অপমৃত্যু ও বাকস্বাধীনতার স্বরূপ

আমরা সবাই জানি- শিল্প-সাহিত্য, চলচ্চিত্র-নাটক, সঙ্গীত-নৃত্য এসব যে কোনো জাতির সভ্যতা-সংস্কতির পরিচয় বহন করে। একবিংশ শতাব্দীর এই যুগে এসব ক্ষেত্রে যে জাতি যতবেশী উন্নত, তারা ততবেশী সভ্য হিসেবে পরিচিত। এদিক থেকে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বাঙালী জাতির অন্যরকম সুনাম-সুখ্যাতি রয়েছে বিশ্বব্যাপী।

এক্ষেত্রে যে অঙ্গনের সবচেয়ে বড় অবদান তা হলো- সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র । কেননা, এসব অঙ্গনে যারা কাজ করেন তারা প্রতিনিয়ত কর্ম ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে সমাজকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেন । সমাজের পুরাতন কুসংস্কারকে ভেঙে নতুন সভ্যতার বিনির্মাণ করেন।

আর চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যে কোনো জাতির পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। সমাজ গঠনে এর ভূমিকা অপরিসীম। চলচ্চিত্র দেশের কথা বলে, মানুষের জীবন সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলে। চলচ্চিত্র মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। তাই চলচ্চিত্রে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জাতিসত্তা, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংশ্লিষ্ট সবকিছুর সাথে জড়িত। এ শিল্পের মাধ্যমে আমরা জাতিসত্তার সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলতে পারি।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে গৌরবোজ্জ¦ল ইতিহাসের সর্বত্র চলচ্চিত্রের অবদান রয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির ধারক, বাহক ও বিকাশে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীরা প্রশংসনীয় ভূমিকাও পালন করে আসছেন।

আমরা এও জানি, ১৮৯৫ সালে পৃথিবীর বুকে লুমিয়ার ব্রাদার (যুক্তরাষ্ট্র), এই উপমহাদেশে হীরালাল সেন আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনক আবদুল জব্বার খান সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সমাজ বিবর্তনে ভূমিকা পালন করেন। যতদূর জানা যায়, ১৯৫৬ সালের ৩ আগষ্ট আবদুল জব্বার খান মুখ ও মুখোশ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেই থেকে চলমান ঘটনা নিয়ে আমাদের এই সমাজ বিবর্তনে ভূমিকা রাখছে এই অঙ্গন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আমাদের চলচ্চিত্রের পরিচিতও খুব একটা কম নয়। ১৯৯১ সালে ‘পথের পাঁচালী’ নামে বাংলা চলচ্চিত্র অস্কার পুরস্কার লাভ করে সুনাম কুঁড়িয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি ‘রানা প্লাজা’ চলচ্চিত্র নিয়ে সরকার যেসব নাটক মঞ্চস্থ করছে তা যেন ফ্লিমকেও হার মানিয়েছে। এ যেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের চরম দুর্দিন। দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছরে ইতোপূর্বে এত আইনী লইয়ের রাষ্ট্রপতির আদেশে এভাবে কোনো চলচ্চিত্রের উপর নিষেধাজ্ঞারোপ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

কলাকৌশলীদের দীর্ঘ লড়াইয়ে সেন্সর বোর্ডের কাচির তলা এবং আদালতের কাঠগড়া থেকে বেরিয়ে আসলেও অবশেষে রাষ্ট্রপতির আদেশে আটকে গেল। ১৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির ওই আদেশে বলা হয়, ‘সিভিল রিভিউ পিটিশন নং ১৯১/২০১৫ শুনানিকালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণের আলোকে ফিল্ম সেন্সর আপিল কমিটি কর্তৃক রানা প্লাজা নামক চলচ্চিত্রের আপিল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত সেন্সর সার্টিফিকেট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলো এবং রানা প্লাজা নামক চলচ্চিত্র সমগ্র বাংলাদেশে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলো।’

এদিকে বারবার বাধা আর নিষেধাজ্ঞায় হতাশ ছবিটির কলাকৌশলীরা। পরিচালক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘শুধু আমার ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটছে। সাভারের রানা প্লাজা ধ্বস এবং ১৭ দিন ধরে ধ্বংসস্তুপের নীচে আটকে পড়া পোশাক শ্রমিক রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি বাণিজ্যিক ধারার প্রেমের সিনেমা এটি। ছবিটিতে নেতিবাচক কিছু নেই। বরং ছবিটির মধ্যে গার্মেন্টস মালিক-শ্রমিক আরও সচেতন হওয়ার সুযোগ খুঁজে পাবেন।’

রেশমা’র ভূমিকায় অভিনয়কারী পরি মণি বলেন, ‘এ খবর শোনার পরই আমার কান্না পাচ্ছিল। কারণ ছবিটির সঙ্গে অনেক অনুভূতি জড়িয়ে আছে। একটি সন্তান যদি বারবার আহত হয়, তাহলে সেটা কারোই ভালো লাগে না। এই ছবি আমার কাছে সন্তানের মতো।’

প্রসঙ্গত, সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনা নিয়ে নির্মিত ‘রানা প্লাজা’ চলচ্চিত্রটি গত ৪ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এতে নানা ভীতিকর দৃশ্য দেখানোর অভিযোগ করে গত ২০ আগস্ট হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। ২৪ আগস্ট শুনানি শেষে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন ও সম্প্রচারের ওপর ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। পরে এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান চলচ্চিত্রটির প্রযোজক শামীমা আক্তার। তাঁর আবেদন নিষ্পত্তি করে ৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন। এরপর আপিল বিভাগের ওই স্থগিতাদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য সিরাজুল ইসলাম আবেদন করলে সেটি খারিজ হয়ে যায়। এরপর সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এর আগে প্রায় আট মাস সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকার পর হাইকোর্টের রায় নিয়ে ১১ জুলাই ছবিটি ছাড়পত্র পায়। ছবির প্রধান চরিত্র দুটিতে অভিনয় করেন সাইমন ও পরীমণি।এছাড়াও অভিনয় করেন আবুল হায়াত, প্রবীর মিত্র, মিজু আহমেদ, শিরিন আলম, কাবিলা, রেহেনা জলি প্রমুখ। চলচ্চিত্রটি ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের দৈর্ঘ্যের কাহিনী গড়ে উঠেছে ‘রানা প্লাজা’ ধ্বসের ১৭ দিন পর ধংসস্তুপ থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া রেশমা আক্তার নামে এক পোশাককর্মীকে কেন্দ্র করে।

এদিকে মুক্তির আগেই বারবার বাধার মুখোমুখি ‘রানা প্লাজা’ চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়েছে। কয়েক দফায় পোস্টার, ব্যানার, প্রমোসহ বিভিন্ন ধরণের প্রচারণাসহ হল বুকিংয়ের টাকা ফেরত দিতে গিয়ে অর্ধ কোটি টাকা ক্ষতির শিকার হয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে মারা যান ১১শ’র বেশি শ্রমিক, আহত হয় বহু। ঘটনার ১৭ দিন পর ধংসস্তুপ থেকে জীবিত রেশমা উদ্ধারের ঘটনা গোটা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এনিয়েই মূলত: সিনেমাটি নির্মিত হয়। কিন্তু এটি প্রদর্শনে সরকারের নিষেধাজ্ঞায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

চলচ্চিত্র শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, যে কোনো দেশের জনগণের বাকস্বাধীনতার অন্যতম প্রতীকও বটে। কেননা, চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই উঠে আসে বর্তমান সময়ের গল্প, আর তা সমাজকে বদলাতে সহায়তা করে। তাই সরকার কর্তৃক চলচ্চিত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিচয় নয়।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকতা ও নাগরিকের বাকস্বাধীনতার উপর যে ধরনের খড়গ হস্ত চালানো হচ্ছে, তা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। নানাভাবে গণমাধ্যম কর্মীরা হচ্ছেন লাঞ্ছিত এবং নিগৃহীত। গণমাধ্যম হয়ে পড়ছে কোণঠাসা; আর শাসক-কর্তাদের রক্তচক্ষু, আমলাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র এবং দুনীতিবাজ ও চেরাকারবারীরা গণমাধ্যম কর্মীদের দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।এতদিন ধরে আইসিটি এ্যাক্টের অপব্যবহারের যে আশঙ্কা করেছিলাম তা যেন এখন সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

দেখা যাচ্ছে এই আইসিটি এ্যাক্ট অনুযায়ী সামাজিক গণমাধ্যমে নাগরিকদের মতপ্রকাশের ন্যূনতম অধিকারটুকু যেমন খর্ব হচ্ছে, তেমনি জীবনাশঙ্কার কথা প্রকাশ করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এমন কি চলচ্চিত্র নির্মাণেও এখন খড়গ নেমে এসেছে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের সাথে সরকারের এর চেয়ে অগণতান্ত্রিক আচরণ আর কী হতে পারে! যা করা হচ্ছে তা নজিরবিহীন ও বলদর্পী ক্ষমতার অসৎ চর্চা।। এসব ঘটনা ‘আইন ও ক্ষমতার নিকৃষ্ট প্রয়োগ’। সরকারের এসব তৎপরতার সাথে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের সম্পর্ক সাংঘর্ষিক।

এক্ষেত্রে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে- ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম যে রিটটি করেছিলেন, সেখানেও সরকারের লোকজনের একটা সমর্থন ছিল। কিন্তু আইনী লড়াইয়ের শেষ বিচারে যখন হেরে গেল, তখন আমরা দেখলাম সরকারের হস্তক্ষেপ- প্রজ্ঞাপন জারি তথা রাষ্ট্রপতির আদেশে এর সেন্সর সার্টিফিকেট স্থগিত করে প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। যা একবারেই সবার অনাকাঙ্খিত ছিল।

এ ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো- ‘রানা প্লাজা’ চলচ্চিত্রটির কলাকৌশলীরা তো ঢাকঢোল পিটিয়েই অনেক প্রক্রিয়া শেষে মাঠে নেমেছিলেন। তখন কেন এ বিষয়ে আপত্তি করা হলো না? লাখ লাখ টাকা খরচ করে যখন এটি নির্মাণ করা হলো তখন কেন এ ধরনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা তথা বাধার সৃষ্টি করা হলো? ফলে নির্বাহী আদেশে সরকারের এ ধরনের হস্তক্ষেপ যেমনটি আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য তেমনি নাগরিকের বাকস্বাধীনতার জন্যও এক অশনি সংকেত।

সবশেষে সরকারেরর প্রতি আহবান থাকবে- ‘রানা প্লাজা’ চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনের উপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করা হোক। অন্যথা এ ঘটনা যেমনটি জাতির জন্য একটি মন্দ নজির হয়ে থাকবে তেমনি সত্য ঘটনার আলোকে এরপর আর কেউ চলচ্চিত্র বানাতে রাজি হবে না। আর চলচ্চিত্রের নির্মাতা ও কলাকৌশলীরা যদি বর্তমান সময়ের গল্প তুলে ধরতে না পারেন, তাহলে চলচ্চিত্র কীভাবে আমাদের সমাজ বদলাতে কাজ করবে?

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক এবং কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close