ফিচার

অশনি সংকেত

গেল কয়েক বছর থেকেই আমাদের দেশে অজ্ঞাত সন্ত্রাসী কর্তৃক হত্যাকাণ্ড চলছে।একের পর এক ব্লগার, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও ইসলামী চিন্তাবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ খুন হচ্ছেন।কিন্তু ওইসব ঘটনায় কোনটিরই জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারেনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।

ঘটনার পর বরাবরই পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবেই প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের দিয়ে একই পদ্ধতিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। এসব ঘটনার পর আমরাও কয়েকদিন প্রতিবাদমুখর হয়ে এবং লেখালেখি করে থেমে যাচ্ছি, আর ক’দিন পর ফের সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।

কিন্তু এবার বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনা আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গেল ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় কূটনৈতিকপাড়ায় ইতালির নাগরিক এনজিওকর্মী সিজার তাভেলাকে যেভাবে হত্যা করা হয় ঠিক একই কায়দায় ৩ অক্টোবর দুপুরে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মাহিগঞ্জ গ্রামে জাপানের নাগরিক কুনিও হোশিকে (৬৫) হত্যা করা হয়।

এরই মধ্যে দুইটি হত্যায় জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করেছে। এক সপ্তাহেরও কম সময়ে এই দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে সর্বমহলে । আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক নাড়া দিয়েছে।এবারও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- হত্যাকাণ্ড দুটির ধরন, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া একই। কিন্তু এ পর্যন্ত জড়িত কাউকে গ্রেফতার কিংবা কোনো ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আন্তর্জাতিক জঙ্গিসংগঠন আইএস এই হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করলেও সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়েই বলা হচ্ছে এখানে আইএস এর কোনো অস্তিত্ব নেই। স্বরাষ্টমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অচিরেই এই দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার মোটিভ উদ্ধার এবং জড়িতদের গ্রেফতারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অতীতের এ ধরনের আশ্বাসের কার্যকর কোনো প্রতিফলন আমরা দেখতে পায়নি।

কেননা, এরআগে অভিজিত, অনন্ত ও ওয়াশিকুর রহমান বাবু আরো বেশ কয়েকজন মুক্তমনা লেখক-ব্লগারকে হত্যার পরও আনসার বাংলা ৭ নামে এক জঙ্গি সংগঠন তাদের টুইটে একই ভঙ্গিমায় দায় স্বীকার করেছিল। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ওইসব ঘটনার মোটিভ উদ্ধারে যথেষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে আশাব্যঞ্জক তেমন কোনো কিছু দেখতে পায়নি। অভিজিৎ হত্যার তদন্তে বাংলাদেশ পুলিশের পাশাপাশি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইও তদন্ত করলেও এ পর্যন্ত কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই।

দুই বিদেশী নাগরিক খুনের ঘটনা সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এটা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত। এসব হত্যাকাণ্ডই প্রমাণ করে যে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো আজ কতটা দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে।

এটা খুবই উদ্বেগের কারণ যে, নাগরিকদের আশ্বস্ত হওয়ার মতো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করতে পারছি না। কেননা, প্রতিহিংসার রাজনৈতিক পরিবেশে বরাবরের ন্যায় এবারও দুই বিদেশী হত্যার পর কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান ঢালাওভাবে মন্তব্য করলেন। তিনি প্রতিপক্ষকে দায়ি করে বললেন- এই হত্যার পেছনে বিএনপি জামায়াতের মদদ রয়েছে। যদিও আইনী প্রক্রিয়ায় তদন্ত ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভাষ্য অনুসারে ধরেই নিলাম আইএস বলে কোনো জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব এ দেশে নেই, দুই বিদেশী হত্যার দায় স্বীকার করে যে বিবৃতি তাও ভিত্তিহীন। তবে এই হত্যা কে বা কারা ঘটিয়েছে এটা বের করার দায়িত্ব কার? নিশ্চয় সরকারের তথা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর। প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষ খুন হয়, তখন জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন ভোগী র্যা ব-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কোথায় থাকে? তাদের কাজটাই বা কি?

ফলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’অপচেষ্টা এবং অপরাধ প্রতিরোধে তাদের সক্ষমতাকে নিয়েও নতুন করে আমাদের ভাবনার সময় এসেছে। তাদের জবাবদিহীতার আওতায় আনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

তবে এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যাই বলা হোক না কেন, এবার বিদেশী নাগরিক হত্যার ঘটনায় সবার উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কেননা, এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহল তথা বিদেশীদেরকে আমাদের সম্পর্কে যে বার্তা দিয়েছে তাতে বিদেশী নাগরিকদের মনে বাংলাদেশ সফরে এক ধরনের আতঙ্কের জন্ম দিবে। এতে এদেশে আসতে বিদেশীরা ক্রমেই অনাগ্রী হতে পারেন।

আর এটা অব্যাহত থাকলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনীতি, শিক্ষা ও ক্রিড়াঙ্গনসহ সার্বিক বিষয়ের উপর যে একটা বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

ফলে এই হত্যাকাণ্ড শুধুই হত্যা! না, আমাদের দেশে যে অগণতান্ত্রিক চর্চা চলে আসছে সেটারই ধারবাহিতা? কেননা, হত্যাকাণ্ডের পর কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই ঢালাওভাবে কোনো একটি পক্ষকে দায়ি করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত ছাড়া কারো উপর দায় চাপানো মানে মামলার তদন্তকে প্রভাবিত করা তথা প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করা। এতে প্রকৃত অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে বরাবরই অনেকটা নিরাপদে থেকে যাচ্ছে।

ফলে এই হত্যাকাণ্ড শুধু বিদেশী নাগরিকদের জন্যই নয়, আমাদের সবার জন্যই হুমকি স্বরূপ। এর বিচার না হলে আরও যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এটা লক্ষ্যনীয় যে, আমাদের দেশে মূলত: গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকার কারণে পরস্পরকে দোষারোপ, ভিন্ন মত দমন-নিপীড়নের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিই এধরনের হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করছে।ফলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে যেমনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা আবশ্যক, তেমনি ঘটনার পরপরই তদন্ত ব্যতিরেকে কোনো পক্ষের উপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।নিরপেক্ষভাবে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত জড়িতদের বের করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’অপচেষ্টা এবং অপরাধ প্রতিরোধে তাদের সক্ষমতাকে নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় নেতৃবৃন্দকে হানাহানি বন্ধ করে ঐক্যের মোহনায় দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সংবিধান ও আইনের বিধি বিধান বলে রাষ্ট্র পরিচালনার পথে হাঁটতে হবে। তবেই বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কোনো অজুহাত শুনতে চাই না, যে কোনো মূল্যে এসব হত্যার প্রতিকার চাই। আর যাতে কোনো দেশী-বিদেশী নাগরিককে হত্যাকাণ্ডের শিকার না হতে হয় সে ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ চাই। সবশেষে, দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার নিন্দা জানানোর মতো আমার ভাষা নেই। নিহতদের শোকাহত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এখানেই শেষ করলাম।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলামলেখক, ই-মেইল- sarderanis@gmail.com

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close