রাজনীতি

লল্ডনে বিএনপির মাস্টার প্লান

রাজনীতি ডেস্ক: প্রায় চার বছর পর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর সর্বো”চ গুরুত্ব পাচ্ছে বিএনপিতে। এটিকে ব্যক্তিগত সফর বলা হলেও কার্যত দলের ষষ্ঠ কাউন্সিল, ভবিষ্যত আন্দোলনের রূপরেখা, মধ্যবর্তী নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন এবং সর্বোপরি যুগের সঙ্গে মানানসই করে দলকে ঢেলে সাজানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসবে লন্ডন থেকেই।

এ কারণেরই দলের নেতাকর্মীরা তাদের নেত্রীর এই সফরকে দেখছেন আধুনিক বিএনপির যাত্রা হিসেবে।

বিএনপিকে শক্তিশালী করতে পুনর্গঠনের আওয়াজ অনেকদিন থেকেই শোনা যায়। সঠিক নেতৃত্বের দায়িত্ব আরো যোগ্যদের নিকট তুলে দেয়ার আহ্বান আটকে আছে সিদ্ধান্তহীনতায়। কেন্দ্রের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া থমকে আছে ঘোষণার মধ্যেই।

সারাদেশে বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনে চলছে স্বেচ্ছাচারিতা আর অনিয়ম। যদিও খালেদা জিয়া লন্ডন সফরের আগে বলে গেছেন পকেট কমিটিকে তিনি অনুমোদন দিবেন না।

দায়িত্বশীল নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়া ছাড়া ভাগ্যে মিলছে না পদ-পদবি। কেন্দ্রের কাছে অভিযোগ জানিয়েও লাভ হচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা কেন্দ্র পর্যন্ত আসার ক্ষমতাও রাখেন না। তাই তারাও চুপ। এমনটাই অভিযোগ দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের।

২০০৬ সালে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর লন্ডনে খালেদার এটি দ্বিতীয় সফর। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফেরার পথে তারেককে দেখতে তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া গত বছর ওমরাহ করতে সৌদি আরবে গেলে তারেকও লন্ডন থেকে সেখানে গিয়েছিলেন। এরপর আর মা-ছেলের দেখা হয়নি।

দলের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়া লন্ডন সফরে তার ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একান্তে কিছু সিদ্ধান্ত নিবেন। তবে তিনি চেয়েছিলেন দলের বেশ কিছু বিষয়ে পরামর্শ নিতে বিশ্বস্ত কোনো নেতাকে তারেক রহমানের কাছে পাঠাবেন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত সেই ভাবনা থেকে সরে এসে নিজেই লন্ডন সফরে গেলেন।

দলীয় একটি সূত্র জানায়, বিএনপির দলটির তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পুনর্গঠন করা হচ্ছে। স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, যুগ্ম-মহাসচিবসহ নির্বাহী কমিটির প্রতিটি পর্যায় থেকে বাদ যাচ্ছেন নিষ্ক্রীয়রা। এদের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন অপক্ষোকৃত তরুণ, দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, যোগ্য ও মেধাবী নেতারা।

একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর বিএনপি এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকেও ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বিএনপির চেয়ারপারসনের লন্ডন সফরে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে বলে সেখানকার কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

লন্ডন বিএনপির একজন নেতা জানিয়েছেন, কঠিন সময় অতিক্রম করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি। এ মুহূর্তে জেলে থাকা নেতা-কর্মীদের জামিনে মুক্ত করাই দলটির সর্বো”চ অগ্রাধিকার। এর পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করাই মূল চ্যালেঞ্জ। বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে দলের শীর্ষ দুই মা-ছেলের আলোচনায় এগুলোই স্থান পাচ্ছে।

বিএনপির পঞ্চম কাউন্সিলের পর দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পান প্রয়াত নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ তিনি মারা যান। এরপর দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত আছেন। আদালত থেকে জামিন নিয়ে দেশের বাইরে গিয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসা শেষে প্রায় পৌনে দুই মাস পর দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি বিমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামবেন তিনি।

তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করার ব্যাপারে ইতিবাচক দলের হাইকমান্ড। আসন্ন কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারমুক্ত করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

বিএনপি সূত্র জানায়, দলের সর্বো”চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির ১৯ সদস্যের মধ্যে বেশ কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। কয়েকজন নিষ্ক্রীয়। দলের কোনো কার্যক্রমে তারা অংশ নিচ্ছেন না। ড. আর এ গনি, বেগম সারোয়ারী রহমান দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। শামসুল ইসলাম মারা গেছেন। এ ছাড়া বর্তমানে কারাগারে আছেন মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এই চারজনসহ আরো দু-একজনকে স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা চলছে। স্থায়ী কমিটি থেকে সরিয়ে তাদের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হতে পারে।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুলকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হলে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব হিসেবে রুহুল কবির রিজভী আহমেদের নাম আসতে পারেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম-মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করা হবে। ছাত্রদলের প্রাক্তন নেতাদের নির্বাহী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চিন্তাভাবনা চলছে। এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবদক দল, মহিলা দলও আমূল পরিবর্তন আসছে।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পর দল পুনর্গঠন করে বিএনপি। ২০০৯ সালের জুন মাসে এক সঙ্গে ৭২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। ঐ বছর ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল। পরের বছর জানুয়ারিতে গঠন করা হয় ৩৮৬ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী কমিটি। তিন বছর মেয়াদী কমিটির সময় আড়াই বছর আগেই শেষ হয়েছে। এর আগে দুই দফা কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শেষপর্যন্ত করা হয়নি।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close