রাজনীতি

বিএনপির নয়া চেয়ারপার্সন জোবাইদা রহমান

রাজনীতি ডেস্ক: বিএনপি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে যে দৈন্যদশায় রয়েছে তা কাটিয়ে তুলতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের প্রভাবশালী সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে ক’টি প্রভাবশালী দেশ চাচ্ছে বিএনপি যেন নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে ক্লিন ইমেজের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে ইতিবাচক রাজনীতির পথে হাঁটেন।

বিশেষ করে দলটি যেন স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলোকে দূরে ঠেলে দিয়ে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আর তা করতে হলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের জায়গায় ক্লিন ইমেজের কাউকে বসানো দরকার। দেশী-বিদেশী মহল বিভিন্ন সময় ডাঃ জোবাইদা রহমানকে দলটির শীর্ষপদে বসানোর প্ল্যান করেছেন।

একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার স্থলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডাঃ জোবাইদা রহমানকে চেয়ারপার্সন করে দেশের রাজনীতিতে চমক দেখানোর পরিকল্পনা করেছে দলটি। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল দ্রুত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বিএনপি হাইকমান্ডকে পরামর্শ দিচ্ছে।

জানা যায়, সপরিবারে লন্ডনে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দলের শীর্ষপদে পরিবর্তনের বিষয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা তার পুত্রবধূ ডাঃ জোবাইদা রহমানকে জানিয়েছেন। দলের চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব নেয়ার পর কি করতে হবে সে ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ নির্দেশনা পাওয়ার পর দেশের রাজনীতিসহ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ডাঃ জোবাইদা রহমানও নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে শুরু করছেন। জোবাইদা রহমানের পূর্ব পুরুষেরা ভারতবর্ষের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাই রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে ডাঃ জোবাইদা বিএনপির হাল ধরলে দলের জন্য ইতিবাচক কিছু করতে পারবেন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

সূত্রমতে, পরিকল্পনা অনুসারে তারেক রহমানের স্ত্রীকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের পদে বসানোর বিষয়ে খালেদা জিয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখলেও তা বাস্তবায়ন করতে আরও কিছু সময় লাগবে। খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরা অনিশ্চিত হলে যাতে আপদকালে ডাঃ জোবাইদা রহমানকে চেয়ারপার্সনের পদে বসানো যায় সেজন্যই আগেভাগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা হয়েছে।

আর তাকে এ গুরুদায়িত্ব দেয়া হলেও দল পরিচালনা ও আন্দোলন কর্মসূচী পালনের কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমানের হাতেই থাকবে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সহসাই আদালত চূড়ান্ত রায় দিতে পারে। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরও ক’টি মামলার রায় হওয়ার পথে। তাই রায় হলেই কারাগারে যেতে হবে খালেদা জিয়াকে। আর তার ছেলে ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বেশ ক’টি স্পর্শকাতর মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তাই গ্রেফতার এড়াতে তার দেশে ফেরা অনিশ্চিত।

এ কারণেই আপদকালীন সময়ে দল যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় সে বিষয়টি মাথায় রেখেই মেধাবী ও ক্লিন ইমেজের অধিকারী পুত্রবধূ জোবাইদা রহমানকে বিএনপির চেয়ারপার্সন পদে বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন খালেদা জিয়া। তার এ সিদ্ধান্তের কথা এখনও প্রকাশ না হলেও বিএনপি নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন অঙ্গনে এ বিষয়টি নিয়ে ভেতরে ভেতরে আলোচনা চলছে।

এর আগে ওয়ান ইলেভেনের সময়ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী ডাঃ জোবাইদা রহমানকে বিএনপির শীর্ষ পদে বসাতে বিভিন্ন মহল থেকে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু তখন জোবাইদা রহমান কিছুতেই রাজনীতিতে আসতে রাজি না হওয়ায় সে যাত্রায় তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে স¶ম হন।

কিন্তু এবার খালেদা জিয়া লন্ডন সফরে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে একান্তে কথা বলে জোবাইদা রহমানকে রাজি করিয়েছেন। আর এ জন্যই খালেদা জিয়া লন্ডন যাওয়ার পর সেখানকার বিএনপি আয়োজিত যে ক’টি অনুষ্ঠান হয়েছে তাতে তারেক রহমানের পাশাপাশি জোবাইদা রহমানও খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন।

টানা আন্দোলন কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার পর বর্তমানে খালেদা জিয়া ছাড়াও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ অনেক সিনিয়র নেতা বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন। কোন কোন নেতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর যারা পলাননি তারাও ঝামেলা এড়াতে আপাতত দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। সিনিয়র ভাইসচেয়ারম্যান তারেক রহমানও গ্রেফতার এড়াতে লন্ডনে রয়েছেন। এ কারণে দলের কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিএনপির একটি বড় অংশ চাচ্ছে খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়ে গেলে ক্লিন ইমেজের অধিকারী তারেক রহমানের স্ত্রী ডাঃ জোবাইদা রহমানকে লন্ডন থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে দলের হাল ধরাতে। রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা না থাকলেও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী হওয়ায় সবাই তার নেতৃত্ব মেনে নেবেন। এ ক্ষেত্রে দলের ঐক্য বজায় রাখাও সম্ভব হবে।

খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর দেশে আসতে চেয়েছিলেন ডাঃ জোবাইদা রহমান। কিন্তু একপর্যায়ে তারেক রহমানই দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় জোবাইদাকে দেশে আসতে বারণ করেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার মামলার রায় অত্যাসন্ন হওয়ায় এখন তিনিই স্ত্রী জোবাইদা রহমানকে দেশে আসার ব্যাপারে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন।

প্রসঙ্গত : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিটহাউসে কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন খালেদা জিয়া। প্রথমে দলের ভাইসচেয়ারম্যান ও পরে চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব নেন তিনি।

রাজনীতিতে আসার পর বিভিন্ন সময়ে চারবার গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নবেম্বর প্রথম, ১৯৮৪ সালের ৩ মে দ্বিতীয়বার, ১৯৮৭ সালের ১১ নবেম্বর তৃতীয়বার এবং সর্বশেষ ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে গ্রেফতার হন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ২০০৭ সালে গ্রেফতার হয়ে এক বছর কারাগারে থাকলেও কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেননি খালেদা জিয়া।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে গ্রেফতার হন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে কিছুদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। ওই বছর ১১ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তারেক রহমানকে হাসপাতালে দেখতে যান। ওইদিনই স্ত্রী ডাঃ জোবাইদা রহমান ও একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান তারেক রহমান।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাস করে ১৯৯৫ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন ডাঃ জোবাইদা রহমান। তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা হিসেবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে কার্ডিওলজি কোর্সে অধ্যয়নরত ছিলেন ডাঃ জোবাইদা রহমান।

২০০৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তার ছুটি মঞ্জুর ছিল। সরকারী চাকরি বিধির ৩৪ ধারা অনুসারে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে কেউ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার চাকরিচ্যুতির নিয়ম রয়েছে। তাই ছুটি শেষ হওয়ার ৫ বছর ১০ মাস পর ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট তাকে চাকরিচ্যুত করে সরকার।

ডাঃ জোবাইদা রহমান প্রয়াত : নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের বড় মেয়ে। মাহবুব আলী খানের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৩ নবেম্বর সিলেট জেলার বিরাহীমপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। ১৯৮২ সালে দেশে সামরিক আইন জারিকালে এ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। এক পর্যায়ে তিনি যোগাযোগ ও পরে কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৪ সালের ৬ আগস্ট মাত্র ৫০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। মাহবুব আলীর বাবা ব্যারিস্টার আহমদ আলী খান ছিলেন নিখিল ভারত আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ)। জোবাইদার মা ইকবাল মান্দ বানু বর্তমানে ধানম-ির নিজ বাসায় বসবাস করছেন। তিনি স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, সংগঠক ও সমাজসেবী।

ডাঃ জোবাইদা রহমানের একমাত্র মেয়ে জাইমা রহমান বর্তমানে লন্ডনে পড়ালেখা করছেন। তাই বিএনপির হাল ধরার জন্য জোবাইদা রহমান দেশে ফিরে এলে মেয়ে জাইমা রহমান তার বাবা তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে থেকে যাবেন বলে জানা গেছে।

ডাঃ জোবাইদা রহমান দলীয় শীর্ষপদে আসছেন কিনা বিএনপির ক’জন সিনিয়র নেতার কাছে জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তারেক রহমানের সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বিএনপির এমন একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, বিএনপি এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তারেক রহমান কবে দেশে ফিরবেন তার কোন সম্ভাবনা নেই। আর দেশে আসলে তাকেও গ্রেফতার করা হবে বলে তথ্য রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সামনে আরও কঠিন সময় আসলে দলের শীর্ষপদে কাউকে দায়িত্ব দিতেই হবে। এ কারণেই দলের উচ্চ পর্যায় থেকে ক্লিন ইমেজের অধিকারী তারেক রহমানের স্ত্রী ডাঃ জোবাইদা রহমানকে দলের শীর্ষপদে নিয়ে আসার কথা চিন্তা করা হচ্ছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close