ফিচার

সন্ত্রাসবাদ ও প্রশাসনের সক্ষমতা

একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ‘সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কমকাণ্ড’ বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়।বলা যায়, সম্পদ ও অন্যান্য বিষয়ের মত এটিও অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি বিষয়।তবে সাম্প্রতিককালে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের ধারাবাহিক হত্যা-খুন ও নৈরাজ্য অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে-যা দেশের অভ্যন্তরে বসবাসরত দেশি-বিদেশি নাগরিক এবং পর্যটকদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।

সম্প্রতি দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা আর তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলার ঘটনায় সর্বত্র এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একের পর এক সংঘটিত ঘটনায় কোনোভাবেই আশ্বস্ত করা যাচ্ছে না দেশি-বিদেশিদের।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড় বইছে।এছাড়াও দেশের বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দা ও প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। আলোড়িত হচ্ছে বিশ্ব গণমাধ্যমেও।আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বেগ-উৎকন্ঠা প্রকাশ ও নিন্দায় সরব।

ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের সতর্কতা জারির প্রেক্ষিতে অনেক বিদেশি বাংলাদেশ সফর স্থগিত করেছে, পর্যটকদের আনাগোনাও কমে গেছে। ফলে এটা শুধু সামাজিক নিরাপত্তার বিষয় নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়ন-স্থিতিশীলতা তথা অস্তিত্বকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে এতটা চ্যালেঞ্জের মুখে আর কখনও পড়তে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাই সর্বমহলে প্রশ্ন উঠেছে, আজকের এমন পরিস্থিতি কেন উদ্ভব হলো, কারা এ জন্য দায়ি আর প্রতিকারই বা কি?

আমরা কি দেখলাম, দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা আর তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলার পরপরই তা একটা রাজনৈতিক রূপ দেয়া চেষ্টা হয়েছে। কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রের হর্তা-কর্তা ও পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য খুবই উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে ওইসব ঘটনায় বেশ কয়েকজন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মিদের গ্রেফতার করে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টাও করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাতে কী!এই ধারাবাহিক সন্ত্রাস কি থামবে, না বাড়বে? আর এসব হত্যাকাণ্ডকে যে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করুক না কেন, জনজীবনের নিরাপত্তা দেয়ার ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্র ও সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।ফলে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ অপচেষ্টা অপরাধ প্রতিরোধে তাদের সক্ষমতাকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জানি না, এভাবে আর কত খুনের কথা শুনতে হবে আমাদেরকে!সরকার ও পুলিশ প্রশাসন কোনো হত্যারই রহস্য উন্মোচন এবং হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে পারছে না। পুলিশের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ভাষায় বলা হচ্ছে- পরিকল্পিতভাবেই প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের দিয়ে একই পদ্ধতিতে দেশকে অস্থিতিশীল করতে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। আর এই বলেই দায় সারছে তারা।

অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে প্রতি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই এর দায় স্বীকার করেছে আইএস কিংবা অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলো।কিন্তু আমাদের দক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা জোর দিয়েই দাবি করছেন-বাংলাদেশে আইএস কিংবা অন্য কোন জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। তাদের এই দাবি কতটুকু সত্য তা অবশ্য প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে সংগঠনগুলোর স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি।

আসলেই বাংলাদেশে এই জঙ্গিসংগঠনগুলোর তৎপরতা আছে কি, নেই।সেটা স্পষ্ট করার দায়িত্বও কিন্তু সরকার-প্রশাসনের। ফলে বিষয়টি নিগঢ়ে গিয়ে তা খতিয়ে দেখা উচিত, অন্যথা বাংলাভাই তথা জেএমবির চেয়েও এর ভয়াবহতা কঠিন রূপ নিতে পারে। কেননা, বিগত বিএনপি জোট সরকার প্রথম দিকে বাংলাভাই-জেএমবিকে মিডিয়ার সৃষ্টি দাবি করলেও পরবতীর্তে তা রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে আজ সহজেই আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে- জনগণের ট্যাক্সের বিশাল অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রের এই সংস্থাগুলো আসলেই কি অপরাধী চিহ্নিত করতে সক্ষম, না তাদের দুর্বলতার কারণেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে! প্রসঙ্গত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভাষ্য অনুসারে ধরেই নিলাম কোনো জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব আমাদের দেশে নেই । তবে এসব সন্ত্রাস- হত্যাকাণ্ড কারা ঘটাচ্ছে?

আর এটা বের করার দায়িত্ব কার? মনে প্রশ্ন জাগে, প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষ খুন হয়, এসময় আমাদের এতো দক্ষ পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা কোথায় থাকেন? আর এতো ক্ষমতাধর সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্র কী করে!

বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা কী দেখলাম- কোনো হত্যাকাণ্ডেরই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। মাঝেমধ্যে সন্ত্রাসী ধরার নামে পুলিশ প্রশাসন নাটক মঞ্চস্থ করলেও বরাবরই অপরাধীরা থেকে গেছে ধরা ছুঁয়ার বাইরে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর সন্ত্রাসীরা ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।এটা যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার জন্য খুবই উদ্বেগজনক।

ফলে এই হত্যাগুলো শুধুই হত্যাই নয়, আমাদের দেশে যে অগণতান্ত্রিক চর্চা আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলে আসছে সেটারই ধারবাহিতা এসব হত্যাকাণ্ড! কেননা, হত্যাকাণ্ডের পর কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই ঢালাওভাবে কোনো না কোনো পক্ষকে দায়ি করা হয়।

এবারও এর কোনো ব্যত্যয় হয়নি। তাই এ হত্যা মিশন আমাদের নাগরিকদের জন্য যেমন হুমকি তেমনি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি স্বরূপ। এসবের বিচার না হলে যে আরও হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

ভিন্ন মত দমন-নিপীড়নের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিই এধরনের হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করছে।ফলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে যেমনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা আবশ্যক, তেমনি ঘটনার পরপরই তদন্ত ব্যতিরেকে কোনো পক্ষের উপর দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। নিরপেক্ষভাবে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত জড়িতদের বের করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে সব ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের নাগরিকদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় নেতৃবৃন্দকে হানাহানি বন্ধ করে ঐক্যের মোহনায় দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সংবিধান ও আইনের বিধি বিধান বলে রাষ্ট্র পরিচালনার পথে হাঁটতে হবে।তবেই আশা করা যায়- রাষ্ট্রে শান্তি ফিরে আসবে।

আমরা কোনো অজুহাত শুনতে চাই না, এক্ষেত্রে কোনো ভেদাভেদ দেখতে চাই না। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই নিরাপদে বসবাস করার অধিকার চাই।সেটা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।আর যারা নাগরিকদের এই অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে একমাত্র তাদেরই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার অধিকার, অন্যথায় যারা ব্যর্থ হবে তাদের ক্ষমতায় থাকা উচিত নয়।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলামলেখক, ই-মেইল- sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close