ফিচার

একজন রিদাদ ও সাংবাদিকতার সংবেদনশীলতা

আমরা জানি, সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সাংবাদিকতা একটি মহত পেশা—এ কথা আজ নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।উদ্ভব ও বিকাশের পটভূমিতে সাংবাদিকতা সত্য, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অবিরাম প্রয়াস। এই প্রয়াসের মূল চালিকাশক্তি একজন সাংবাদিকের নিজ পেশার প্রতি আপসহীন নীতি, দায়িত্ববোধ ও সাহস।কিন্তু আজ আমাদের বাংলাদেশের সাংবাদিকরা কি সেই ভুমিকায় উত্তীর্ণ হতে পারছেন? না, তা আজ নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ!

এ বিষয়ে অনেক ঘটনা-বিতর্ক থাকলেও সেগুলো এখানে আনতে চাই না।শুধু ছোট একটি ঘটনা পাঠকদের সামনে অবতারণা করতে চাই।

আমরা জানি, গেল শনিবার জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন আততায়ীর হাতে খুন হন।তার বড় ছেলে রিদাদ ফারহান, এবার জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেএসসি) পরীক্ষার্থী।প্রিয় বাবার হাত ধরেই তার পরীক্ষার হলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ দেয়নি দুর্বৃত্তরা।বাবার নিথর দেহকে হাসপাতালের মর্গে রেখেই রোববার সকালে পরীক্ষার হলে ছুটে যেতে হয় রিদাদকে।

প্রিয় পাঠক, বুঝতে পারছেন ১৪ বছর বয়সী একজন কিশোরের জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাবাকে হারানো কতটা শোকের, কতটা নিঃসঙ্গতা।এরপর আবার পরীক্ষা!রিদাদ ওর বাবার মৃত্যুর খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন।পরীক্ষা দিতে চায়নি। সবাই ওকে বুঝিয়ে পরীক্ষা দিতে পাঠিয়েছে।রাজধানীর উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার হল।

যা জেনেছি ও শুনেছি তাতে- ভারাক্রান্ত মন, চোখে পানি নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ রিদাদের, আর সেই চোখের পানিতেই ভিজেছে পরীক্ষার খাতা।এতো গেল রিদাদের কথা।

এবার আসি আমাদের সাংবাদিকদের কথায়।পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেলে যা দেখেছি আর প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে যা শুনেছি তাতে রীতিমত হতবম্ব হয়েছি।

উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের ভাষ্যমতে, রিদাদ পরীক্ষার হলে বসার কিছু সময় পরই কিছুসংখ্যক সাংবাদিক সেখানে ভিড় করেন।এরমধ্যে দুইজন সাংবাদিক বিনা অনুমতিতে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করে ফটো তুলেছেন।শুধু তাই নয়, পরীক্ষা শেষে সাক্ষাৎকার নিতে আরো বেশ কিছুসংখ্যক সাংবাদিক স্কুল গেটে জড়ো হয়।

পরীক্ষা শেষে সাংবাদিকদের এড়াতে শিশু রিদাদকে অধ্যক্ষ তার নিজ কক্ষে কিছু সময় বসিয়ে রেখে পরে স্কুলশিক্ষকরা মিলে তাকে গাড়িতে তুলে দেন।এজন্য পরের পরীক্ষায় শিক্ষামন্ত্রনালয়ের কাছে শিশুটির জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষের এসএম কানিজ ফাতেমার আক্ষেপ ‘আমি বুঝতে পারছিলাম না, ওই সাংবাদিকদের কোনো দায়িত্ব বা সংবেদনশীলতা কিংবা নৈতিকতাবোধের কোন ধারনা ছিল কিনা।এ কেমন সাংবাদিকতা!’

এখানেই শেষ নয়, পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে সোজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাবার জানাজায় অংশ নিতে ছুটে যায় রিদাদ।এ সময় উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে রিদাদ বলে, ‘সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। যেন আমার বাবা জান্নাতবাসী হন।’

জানাযা শেষ হবার পরপরই সেখানে রিদাদকে ঘিরে ধরেন টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিকরা। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয় ‘তুমি কি পরীক্ষা দিয়েছো, পরীক্ষা কেমন হয়েছে?, ইত্যাদি।সাংবাদিকদের এমন আচরণে বিরক্ত হয়ে পাশে দাঁড়ানো তাঁর দাদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কাশেম ফজলুল হক সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন শিশুটিকে কষ্ট না দিতে।তাঁর এ কথাটিও রেকর্ড করেন সাংবাদিকরা। এরপরও তারা এ থেকে বিরত থাকেনি।

রিদাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহতম দিন এটি।দীপনকে হারিয়ে যখন গোটা পরিবার শোকে স্তব্ধ, ঠিক এ পরিস্থিতিতে বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়া, পরে জানাযায় অংশগ্রহণ কতটা কঠিন সেটা রিদাদ ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।কিন্তু রিয়াদের এই শোককে আরো বেশি কঠিন করা হয়েছে তার সামনে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন ধরে।এ কেমন সাংবাদিকতা!রাজনীতিবিদদের মতই কি সাংবাদিকরাও তাদের দায়িত্ববোধ হারাচ্ছেন?

শুধু যে এক্ষেত্রেই এ ঘটনা ঘটেছে এমনটি নয়।এর আগেও আমরা দেখেছি, নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হওয়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুণির ছোট শিশু মেঘের মুখের সামনেও মাইক্রোফোন-ক্যামেরা, দেখেছি গভীর কুপে পড়া শিশু জিহাদের বাবা মার সাক্ষাৎকার নিতে সাংবাদিকদের হুড়োহুড়ি, দেখেছি শিশু রাজনের শোকার্ত বাবা-মার সাক্ষাৎকার নিতে সাংবাদিকদের দীর্ঘ লাইন।এছাড়াও যে কোনো ঘটনা ঘটলিই ছুটে যান সাংবাদিকরা, শোকার্ত মানুষের সামনে ক্যামেরা সেট ও মাইক্রোফোন ধরে তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চান।সেগুলো আবার গুরুত্ব সহকারে প্রচারও করা হয় টেলিভিশন চ্যানেল গুলোতে।

তাই আজ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, এ কেমন সাংবাদিকতা!সাংবাদিকতা পেশায় কি কোনো দায়িত্ব বা সংবেদনশীলতা কিংবা নৈতিকতাবোধের বিষয় নেই। আমার হয় বিভিন্ন মিডিয়ায় কর্মরত সিনিয়রদের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, ব্লগার, গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল- sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close