ইউরোপ জুড়ে

সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত প্যারিস: জরুরি অবস্থা জারি করেছে ফ্রান্স (ভিডিও)

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় এই সন্ত্রাসী হামলার পর পুরো ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সীমান্ত। হামলাকারী পাঁচজনকে নিরস্ত্র করা হয়েছে বলে প্যারিসের পাবলিক প্রসিকিউটর ফ্রাঁসিস মলিনস জানালেও তারা জীবিত, না মৃত, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

হামলার পর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন নগরীটিতে সব বাসিন্দাদের যার যার ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। শহরে দেড় হাজার সৈন্য নামানো হয়েছে, বাতিল হয়েছে পুলিশের ছুটি, হাসপাতালগুলোতে কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন কাজে রাখা হয়েছে। হামলার দায়িত্ব কেউ স্বীকার না করলেও মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসকেই সন্দেহ করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করে ওঁলাদ বলেছেন, আমরা জানি, কারা এই সন্ত্রাসী।

দেশের এই পরিস্থিতিতে জি টোয়েন্টি সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ। হামলার নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন দেশ ফ্রান্সের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এই হামলার নিন্দা জানিয়ে হোতাদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফ্রান্সের পাশে থাকার কথা বলেছে নেটো।

মেট্রো রেলের পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে দূরপাল্লার রেল ও বিমান চলাচল স্বাভাবিক থাকছে। প্যারিসজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার পর ফরাসি জনগণের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্বনেতারা।

রয়টার্স জানিয়েছে, কয়েকটি স্থানে হামলা হয়। এর মধ্যে প্যারিস সিটি হলে একটি কনসার্টে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ৮৭ জন। আরও চারটি স্থানে বোমা ও গুলিতে মারা যান আরও ৪০ জনের মতো।

কনসার্টে গুলিবর্ষণের কাছাকাছি সময় স্টেডিয়াম স্তাদে দে ফ্রান্সের বাইরে বোমাহামলা হয়। ওই সময় স্টেডিয়ামে জার্মানি ও ফ্রান্সের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ চলছিল, খেলা দেখতে গিয়েছিলেন খোদ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ও জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই সময়ই প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে একটি রেস্তোরাঁ ও বারের সামনে গুলিবর্ষণ হয়, তাতে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে রয়টার্স। আরও কয়েকটি স্থানে গুলিবর্ষণের খবর এলেও তার বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

[youtube id=”QLELS8MnnVQ” width=”600″ height=”350″]

প্যারিসের পাবলিক প্রসিকিউটর মলিনসকে উদ্ধৃত সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ১২৮ বলে জানিয়েছে রয়টার্স, গুরুতর আহতের সংখ্যা ৯৯। তবে বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে অধিকাংশ গণমাধ্যম বলেছে, অন্তত ১৪০ জন নিহত হয়েছেন। বলা হচ্ছে, ২০০৪ সালে মাদ্রিদে ট্রেনে বোমা হামলার পর ইউরোপে এটাই সন্ত্রাসী হামলার সবচেয়ে বড় ঘটনা। প্যারিসে বিদ্রুপ ম্যাগাজিন শার্লি এবদুতে হামলা চালিয়ে ২০ জনকে হত্যার দশ মাসের মাথায় আবারও হামলার ঘটনা ঘটল।

শহরের মাঝামাঝি বাটাক্লঁ কনসার্ট হলে মার্কিন ব্যান্ড দল ইগলস অব ডেথ মেটালের কনসার্ট দেখতে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। এরই মধ্যে অন্তত তিন হামলাকারী হলে ঢুকে কালাশনিকভের মতো দেখতে রাইফেল নিয়ে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে বলে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান।

[youtube id=”HiFyViAaUL0” width=”600″ height=”350″]

ইউরোপ ওয়ান রেডিওর সাংবাদিক জুলিয়ঁ পিয়ার্সকে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা অন্ধের মতো গুলি চালাচ্ছিল। যে যেদিকে পারে দৌড়ে বাঁচার চেষ্টা করছিল। আমি বহু মানুষকে গুলি খেয়ে পড়ে যেতে দেখেছি। জুলিয়ঁ পিয়ার্স বলেন, হামলাকারীরা সবাই ছিল বয়সে তরুণ। কারো মুখে মুখোশ ছিল না। অন্তত তিনবার তারা রাইফেলের ম্যাগাজিন বদলেছে। তারা পরিষ্কার জানত- তারা কী করছে।

কনসার্ট হলের বাইরে থাকা এক যুবক রয়টার্সকে বলেন, বন্দুকধারী তিন তরুণ ছিল কালো পোশাকধারী। তাদের হাতে ছিল মেশিনগান। এই ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞের পর হামলাকারীরা সেখানে শতাধিক মানুষকে জিম্মি করে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে জিম্মি সঙ্কটের রক্তাক্ত অবসান ঘটায়। ওই অভিযানে অন্তত তিন হামলাকারী নিহত হয় বলে বিবিসির খবর।

এই কনসার্ট হলের কয়েকশ মিটারের মধ্যে বিদ্রুপ সাময়িকী শার্লি এবদুর কার্যালয়। ১০ মাস আগে সেখানে বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়ে ২০ জনকে হত্যা করেছিল। স্টেডিয়ামের বাইরে ম্যাকডোনাল্ডেসর দোকানের সামনে দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। সেখানে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

সেখানে তিনজন নিহত হয়েছে বলে বিবিসি জানিয়েছে। নিহতরা আত্মঘাতী বোমাহামলাকারী বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাইরে বোমা হামলার পর খেলা চালিয়ে গেলেও স্টেডিয়ামের ভেতরে আতঙ্ককর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওই সময় গ্যালারিতে ওলাঁদের সঙ্গে বসে খেলা দেখছিলেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্যাঙ্ক ভালটার। বিস্ফোরণের পরপরই পুলিশের হেলিকপ্টারকে স্টেডিয়ামের উপর চক্কর দিতে দেখা যায়। প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ দ্রুত চলে যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, সেখানে বসে সব পরিস্থিতি দেখে জরুরি অবস্থার ঘোষণা দেন তিনি।

[youtube id=”Y2wmiLhfrrM” width=”600″ height=”350″]

প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে শ্যারোনে একটি এশীয় রেস্তোরাঁর সামনে আধা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে একজন বন্দুকধারী এলোপাতাড়ি গুলি চালায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে। রেস্তোরাঁর বাইরের অংশে তখন অনেকেই ডিনার খেতে বসেছিলেন। আকস্মিক এই হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

হামলার পক্ষে টুইটারে আইএসের প্রশস্তি দেখা গেলেও দায়িত্ব স্বীকারের কোনো বার্তা তাৎক্ষণিকভাবে আসেনি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক এই জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছ থেকে। হামলার সময় সিটি হলের কনসার্টে থাকা একজন রয়টার্সকে বলেছেন, বন্দুকধারীরা ‘ইসলামী স্লোগান’ দিচ্ছিল এবং সিরিয়ায় অভিযানে ফ্রাঁন্সের ভূমিকার প্রতিবাদ জানাচ্ছিল।

ফ্রান্সকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত আছে জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক বিবৃতিতে বলেছেন, নিরপরাধ বেসামরিক জনগণকে সন্ত্রস্ত করার আরেকটি ভয়ঙ্কর চেষ্টা আমরা দেখলাম। প্যারিসে হামলার এই ভয়াবহতায় ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এক টুইটে বলেছেন, আমরা ফ্রান্সের মানুষের পাশে আছি। তাদের সাহায্যে যতটা সম্ভব, আমরা তা করব।

জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেল বলেছেন, প্যারিসের যে খবর আর ছবি তিনি পেয়েছেন. তাতে তিনি বিস্মিত, হতবাক। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্রান্সে এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ এই ঘটনাকে বর্ণনা করেছেন নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে। রাতেই মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক করে তিনি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা দেন।

হামলাকারীদের কাউকে দয়া দেখানো হবে না জানিয়ে ওলাঁদ বলেন, আবারও আমাদের ওপর ভয়াবহ হামলা হল… আমরা জানি, এরা কোথা থেকে এসেছে; আমরা জানি, কারা এই অপরাধী, আমরা জানি, কারা এই সন্ত্রাসী। তারা আমাদের ভয় দেখাতে চায়.. কিন্তু আমরা সেই জাতি, যারা নিজেদের রক্ষা করতে জানে; যারা জানে, কীভাবে নিজেদেরে শক্তি কাজে লাগাতে হয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আবারও আমাদের জয় হবে।

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close