ফিচার

এই বিচার কি জাতির দৈন্যতা গুছাবে?

সব কিছু ছাপিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় কার্যকরের বিষয়টিই এখন আলোচনায়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও ছড়িয়েছে। শনিবার রাতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অবশ্য এর আগেও একই অপরাধের বিচারে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা এবং নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যেই ফাঁসি কার্যকর হলো। ফলে এ নিয়ে চলছে পক্ষ-বিপক্ষে নানা বিতর্ক। এরপরও দেশের প্রচলিত আইনে বিচার শেষে রায় কার্যকর হয়েছে। আমি আইনের ছাত্র কিংবা শিক্ষক নই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সরকার ও রাজনীতি নিয়ে, উচ্চতর গবেষণা করেছি শিক্ষা নিয়ে ফলে আইনের জ্ঞানে আমার নেই বললেই চলে। এছাড়াও বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবতাবিরোধী বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই বলেই তা এখানে আর অবতারণা করতে চাইনা।

গত রাতে দুই নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হয়ে গেলেও এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থামেনি। বিবিসি, সিএনএন ও আল জারিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। এছাড়াও সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক মহল থেকেও নানা বক্তব্য রাখছে। দণ্ডপ্রাপ্ত পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকেও নানা অভিযোগ করা হচ্ছে। তাই আজ এ বিষয়ে আলোচনা বেশ প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করছি।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে যাই দাবি করা হোক না কেন, বিচারপ্রক্রিয়া ও রায় কার্যকর নিয়ে যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমরাও এই বিচারের পক্ষে নই। আমরাও চাই যে কোনো অপরাধীর বিচার হোক, তবে সেটা অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ায় হতে হবে।

এক. রায় কার্যকর করার উদ্যোগের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে এই মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার জন্য আহবান জানায়। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিবৃতি দেয়। এর আগেও কাদের মোল্লাহ আর কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আহবান করা হয়েছিল।তবে আন্তর্জাতিক মহলের আহবান সরকার তোয়াক্কা করেনি বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। সঙ্গতকারণেই আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক।

দুই . অনেকের মতে রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের তাড়াহুড়ায় এ্টাকে অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেননা, একইদিনে মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্তদের প্রাণভিক্ষার আবেদন, তা কারাগার কর্তৃপক্ষ থেকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়, আইনমন্ত্রনালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে রাষ্ট্রপতি বরাবর উপস্থাপন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাতে রাষ্ট্রপতির নাকজ করে স্বাক্ষর প্রদান ইত্যাদি প্রক্রিয়াগুলো যেন যেকোনো ডিজিটাল মেশিনকেও হার মানিয়েছে। বিশ্বে আর কোনো বিচারের ক্ষেত্রে এমনটি করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

এছাড়া মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারকে যতটা তড়িত উদ্যোগী লক্ষ্য করা গেছে অন্য ক্ষেত্রে এমনটি দেখা যায়নি। যতদূর জানা যায়, বাংলাদেশের কারাগারে বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে৷ অনেক অপরাধীর বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেও রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্যাগের অভাবে নানা কারণে আটকে আছে। সঙ্গত কারণেই জনমনে প্রশ্ন জাগতে পারে ক্ষমতাসীনরা তড়িঘড়ি করে এই রায় কার্যকর করেছে। এতে রাজনৈতিক ইন্টারেস্ট থাকতে পারে বলেও অভিযোগ উঠেছে বিরোধীদের পক্ষ থেকে।

তিন. দুই পরিবারের সদস্যরাই দাবি করেছেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি। অন্যদিকে সরকারপক্ষ দাবি করেছে তারা প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন এবং তা নাকচ হয়েছে। ফলে বিষয়টি জনগণের কাছে রহস্যাবৃতই থেকে গেল। ফলে এটা ভবিষ্যতেও নানা বিতর্কের জন্ম দিবে।

চার. সাধারণত, যে কোনো দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে সেই জাতির বিভক্তি ও নানা বিতর্কের অবসান হয়। এক্ষেত্রে দেশ স্বাধীনের ৪০ বছর পর দেশবাসী আশা করেছিল একটা সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ায় এবার হয়তো আমাদের বিভক্তি ও রাজনৈতিক বিতর্ক গুছাবে। সত্যিই কি জাতির সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে, না জাতির বিভক্তি-হানাহানি আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে? গেল কয়েকদিনে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য থেকে তা সহজেই অনুমেয়।

প্রসঙ্গত, উল্লেখ করা যেতে পারে- এই এই ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্যে ক্ষমতাসীনদের চোখে-মুখে এক ধরনের উৎসাহবোধ লক্ষ্য করা যাচ্ছ। তাদের বক্তব্য বিবৃতি থেকে ও সেটা প্রতীয়মান। অন্যদিকে বিএনপি সুষ্পষ্টভাবে বলেছে তাদের নেতা নিজকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাননি, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার। এছাড়াও সম্প্রতি এক অনুষ্ঠান দণ্ডপ্রাপ্ত সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যদি ৪০ বছর তাঁর বাবার হত্যার বিচার করতে পারেন, তবে আমরাও পারবো।’

রোববার সকালে ছেলে হুম্মাম কাদের বলেন,  অবৈধ রায়ে বাবাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। সরকার তাকে ভয় পেত। এ হত্যার বিচার একদিন না একদিন হবে।’ (দৈনিক কালেরকণ্ঠ, অনলাইন সংস্করণ, ২২ নভেম্বর, ২০১৫)। এ থেকেই বুঝা যাচ্ছে, আমাদের জাতির বিভক্তিটা সামনের দিনে কতটা প্রকট হতে পারে।

পাঁচ. মানব সভ্যতা অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ইতিহাসের সেই আইয়্যামে জাহেলিয়াত ও মধ্যযুগের বর্বর মানবাধিকার লঙঘনের ঘটনা এখনো আমাদের পীড়া দেয়। সেই বর্বর চরিত্র পরিহার করে মানুষ এখন এমন এক যুগে অবস্থান করছে যেটাকে মানবসভ্যতার উচ্চশির তথা সিভিল সোসাইটি বলা হয়। যে যুগে সভ্য-শিক্ষিত মানুষেরা সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে আর মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না বলেই ধরা হয়। আন্তর্জাতিক সনদেও সেটা বলা হয়েছে। তাই অপরাধী যত বড় অপরাধই করুক না কেন তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ডকে অনুমোদন দেয় না। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রায় বিলোপ হবার পথে।

তাইতো ২০১৪ সালে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৭৩টি সদস্য রাষ্ট্র মৃত্যুদন্ডমুক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৪০টি দেশে মৃত্যুদণ্ড এখন হয় আইনত নিষিদ্ধ হোক, প্রথাগত হোক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় না। কেননা, আন্তর্জাতিক সনদ অনুসারে যেখানে সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় সেটা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সিভিল সোসাইটি হতে পারে না। ফলে একবিংশ শতাব্দীর এই গ্লোবাল বিলেজে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে আমাদের অবস্থান মূলত: আমাদের জাতিকে প্রশ্নের মুখেই ঠেলে দিয়েছে।

সবশেষে বলবো, মানবাধিকার সমুন্নত রাখাই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ফলে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করতে গিয়ে যাতে আরেকটি মানবাধিকার লঙ্গনের ঘটনা না ঘটে সেদিকেও রাষ্ট্র ও সরকারকে খেয়াল করতে হবে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ নিশ্চয়ই জাতির জন্য একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। ফলে আমরাও চাই, যথাযথ আইনে সব ৭১ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত সব মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার হোক, জাতি কলঙ্কমুক্ত হোক।

অবশ্যই সেটা হতে হবে সব ধরনের প্রতিহিংসার উর্ধ্বে থেকে আইনের শাসনের ভিত্তিতে।অন্যথা এই বিচার ভবিষ্যতে খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। এই বিচার জাতির কলঙ্ক মোচন না করে বরং জাতির মধ্যে বিভক্তি ও বিতর্ক আরো বেশি প্রকট করবে। আশা করি রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা এ বিষয়ে মনোযোগী হবেন।

কেননা, সূর্যোদয়, মধ্যাহ্ন ও সূর্যাস্ত সর্বত্র স্থির থাকে না। ঢাকায় যখন দিনের ঠিক দুপুর আমেরিকায় তখন গভীর রাত্রি। আল্লাহর কী লীলাখেলা তা বুঝা দায়।তেমনি মানবজীবনেও কখন কী ঘটবে তা বলা মুশকিল।রাজনীতির মাঠের লীলাখেলার ক্ষেত্রেও তাই।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক।ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close