অন্য পত্রিকা থেকে

ব্যাংকে ঠকার ৪ হাজার অভিযোগ

শেখ আবদুল্লাহ: ময়নূল ইসলাম খসরু কিছুকাল যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে ২০০৯ সালে দেশে আসেন নিজে কিছু করবেন ভেবে। ফেরার পর সিলেট অপুলেন্স লিমিটেড নামে একটি হোটেল ও রিসোর্ট করার উদ্যোগ নেন। নিজের অর্থে পুরোটা হচ্ছিল না বলে ব্যাংকের দ্বারস্ত হয়েছিলেন ময়নূল। বেসরকারি একটি ব্যাংকের সিলেট শাখায় ৭ কোটি টাকার ঋণের আবেদন করেন।

ময়নূল জানান, ব্যাংক তার প্রকল্প দেখে প্রাথমিকভাবে আড়াই কোটি টাকা দেয়। আর বাকি টাকা পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের কাজ চলার সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। আমি ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর আরও সাড়ে ৪ কোটি টাকা পাওয়ার জন্য ব্যাংকে আবেদন করি। ব্যাংক ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা মঞ্জুর করে আমার হিসাবে ট্রান্সফার করে।

কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে ব্যাংক হিসেবে কোনো অর্থ নেই দেখে থ বনে যান এই উদ্যোক্তা। তিনি দেখেন, যেদিন তার হিসাবে টাকা স্থানান্তর হয়েছে, সেদিনই চারটি চেকে ৩ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ময়নূল বলেন, ওই ব্যাংকের ম্যানেজার আমার জমা দেওয়া চেকের (ঋণের জামানত হিসেবে যে চেক জমা দিতে হয়) মাধ্যমে এই টাকা তুলে নিয়ে আমাকে ঋণ খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে।

এরপর আমার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে যে কাজটি করতে চেয়েছিলাম তা আর এগোয়নি। ব্যাংকের পেছনে ছুটে কোনো লাভ না দেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রে অভিযোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১৫ মাস ধরে তদন্ত করে আমাকে সেই টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতদিন প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখায় আমার আগের নেওয়া ঋণ এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। আমি এখন সর্বশান্ত। সিলেটের ওই ব্যাংকে গিয়ে প্রতারিত হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন মিশে যাওয়ার এই কাহিনী বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৪-১৫ প্রকাশ অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন ময়নূল।

এই বর্ণনা শুনে অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ইষ্টার্ণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ওই ব্যাংক কর্মকর্তার অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ এটি ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি গভর্নর আতিউর রহমানও এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক যাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় সেজন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।

খসরুর মতো রাজধানীর শ্যামলীর মাহবুব আর রহমান, মনজুর আহমেদ চৌধুরীও অনুষ্ঠানে ব্যাংক কর্তৃক প্রতারিত হওয়ার বিরূপ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাদের মতো অভিযোগ সিআইপিসির কাছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসেছে ৩৯৩০টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে, অভিযোগের সংখ্যা ২৫৬টি। সংখ্যা বিচারে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড। এই ব্যাংকটির বিরুদ্ধে ১৭৫টি অভিযোগ এসেছে।

এরপরই রয়েছে রূপালী, অগ্রণী, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক। গত অর্থবছরে যত অভিযোগ এসেছে, তার সবগুলোরই সমাধান করা সম্ভব হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন।

তিনি বলেন, আগের তুলনায় অভিযোগ কমেছে, নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০০ ভাগ অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪২৯৬টি অভিযোগ করেছিলেন গ্রাহকরা। এর মধ্যে ২৯৪১টি বা ৬৮ দশমিক ৪৬ ভাগ নিষ্পত্তি হয়েছিল।

এরপরের বছর অভিযোগ ছিল ৪৪৭৬টি। এর মধ্যে ৪২৯১টি নিষ্পত্তি হয়েছিল, যা মোট অভিযোগের ৯৫ দশমিক ৮৭ ভাগ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করেন সাধারণ ব্যাংকিং বিষয়ে। এরপরই থাকে বিভিন্ন কার্ড সংক্রান্ত অভিযোগ, মোবাইল ব্যাংকিং বিষয়ক অভিযোগ, রেমিটেন্স আর ট্রেড বিল সংক্রান্ত অভিযোগ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেশি অভিযোগ এসেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের কাছ থেকে। এখাত থেকে এসেছে মোট অভিযোগের ৫৫ দশমিক ৯৮ ভাগ। এরপরই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের অভিযোগ। এ খাতের ব্যাংকের গ্রাহকরা ২৮ দশমিক ১৩ ভাগ অভিযোগ করেছেন। অভিযোগকারীদের ৫ দশমিক ৮৬ ভাগ বিদেশি ব্যাংকের গ্রাহক।

অনুষ্ঠানে আতিউর রহমান বলেন, জীবনের মান ও বৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসছে। ফলে গ্রাহকদের চাহিদাও বাড়ছে। সেই ধরনের সেবা দিতে হচ্ছে ব্যাংকগুলো। হয়ত কোনো কোনো কর্মকর্তা এই নতুন বিষয়টি আয়ত্ত করতে পারছেন না, তার দায়িত্ব ব্যাংকগুলোকে বিশেষ করে প্রধান নির্বাহীদের নিতে হবে। গভর্নর প্রতি তিন মাস পরপর এমডিদের গ্রাহক সমাবেশ করার পরামর্শ দেন।

আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয় অনুষ্ঠানে। ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, গ্রাহক সেবার মান এখন ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং এ যুক্ত করা হয়েছে। এজন্য গ্রাহক সেবার মান দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংক অন সাইড ইনসপেকশন করবে।ওই ইনস্পেকশন রিপোর্টের ভিত্তিতে ক্যামেলস রেটিং করা হবে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close