অন্য পত্রিকা থেকে

আমি মরলে আমার ছবি প্রথম পাতায় দিও

নবাব উদ্দিন: চিরতরে দূরে চলে গেলো আমার প্রিয় বন্ধু, কমিউনিটির চেনা মুখ কয়সর আহমদ। গত ২৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিকাল ৮টা দিকে পূর্ব লন্ডনের রয়েল লন্ডন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে কয়সর। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। মনে পড়ছে মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো। তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এরপরও আরো কয়েকবার তাঁর সাথে দেখা হয়।

স্বাস্থ্যবান, প্রাণচঞ্চল, হাসিখুশি মানুষটি মরণব্যাধির মুখে দাঁড়িয়ে কেমন যেনো ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিলো। চেহারার সেই জৌলুস আর নেই, স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে পুরোপুরি, তবে মনে হচ্ছিল, তখনও মনোবল হারায়নি সে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও স্বভাবসুলভ রসিকতা সঙ্গি ছিলো তার। কথা বলছিলো হেসে হেসে। কিন্তু তার সেই হাসির ভেতরে কোথায় জানি একটা অব্যক্ত কান্নাও লুকিয়ে ছিলো। তাকে দেখতে আমার সঙ্গে গেছেন সাপ্তাহিক জনমত এর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ নাহাস পাশা ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর আমিরুল চৌধুরী।

আমরা তিনজনই জানি, কয়সরের হাতে আর বেশি সময় নেই। মৃত্যু তাকে ডাক দিয়েছে। একজন মৃত্যু পথযাত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে আসলে খুব একটা স্বাভাবিক থাকা যায় না, যে চলে যাবে তার দিকে আর সহজভাবে তাকানো যায় না। আমি অস্বস্তি নিয়ে কয়সরকে দেখি। কী দারুণ শক্ত মানুষ ছিলো সে, কাজেকর্মে প্রচন্ড পরিশ্রমী হওয়ায় তাকে অনেকেই টাইগার বলে ডাকতেন। আমি আর সে এক স্কুলে, এক ক্লাসে পড়েছি, এক সাথে কেটেছে আমাদের দূরন্ত শৈশব। সহপাঠীর মধ্যে সবাই বন্ধু হয় না, কেউ কেউ শুধুমাত্র ক্লাসমেট থেকে যায়, কেউ কেউ চিরকালের জন্য বন্ধু বনে যায়। কয়সর আমার বন্ধু হয়েছিলো সেই ছেলেবেলাতেই।

মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সেই বন্ধুত্বকে দারুণ মর্যাদা দিয়েছে কয়সর। মনে পড়ে না, কখনো আমাদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য ঘটেছিলো কী-না, যদি ঘটে থাকে তাহলে বোধহয় সেটি মিটমাট করেছে কয়সর নিজেই। কারণ কারো সঙ্গের ঝগড়াকে সে কোনোদিন স্থায়ী করেনি। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে রেখেছিলো সব সময়। আর এ কারণে কয়সর শুধু আমার একজন বন্ধু হয়ে থাকেনি, দুঃসময়ের সাথী হয়ে চিরকাল সঙ্গ দিয়েছে।

সেদিন যখন তাকে দেখতে রয়েল লন্ডন হাসপাতালে গিয়েছিলাম, তখন অনেক কথার ফাঁকে কয়সর বলেছিলো, বন্ধু যদি মরে যাই, তাহলে আমার ছবিটা জনমত-এর প্রথম পাতায় বড় করে ছাপিও।

প্রিয় বন্ধু কয়সর, তোমার ছবি আজ প্রথম পাতাতেই ছাপা হচ্ছে। বুক ভরা কষ্ট নিয়ে তোমাকে বিদায় বলছি বন্ধু। বিদায় জানাবার এই কষ্ট কঠিন সময়ে মনে পড়ছে অনেক কিছুই, মনে পড়ছে আমাদের প্রিয় স্কুল বেলার কথা। মৌলভীবাজার সরকারি স্কুলে আমাদের সেই দিনগুলো কী চমৎকার ছিলো। আমরা একসাথে হেসেছি, এক সাথে চলেছি, এক সাথে স্বপ্ন রচনা করেছি। মনে পড়ছে, ১৯৭৬ সালের প্রথম দিকে লন্ডন পাড়ি জমায় কয়সর। এখানে আসার পর পূর্ব লন্ডনেই তার বসবাস। স্থানীয় স্কুলে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে ব্রিক লেনের তাজ স্টোরে কাজের ভূবন। বাঙালির প্রাচীনতম এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে কয়সর সবার কাছে আলাদা পরিচিতি পায়।

ব্রিক লেনের প্রিয় এক মুখে পরিণত হয় সে। একসময় তাজ স্টোর পরিচালনার দায়িত্বও গ্রহণ করে কয়সর। মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালের দিকে কয়সর এবং আরো কয়েক জন সাথে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলা টাউন ক্যাশ এন্ড কারি। তার সাথে ছিলেন রফিক হায়দার।

জীবনের একটা বড় সময় ব্রিক লেনেই কাটিয়েছে কয়সর। এই এলাকার প্রতিটি অলিগলির সাথে ছিলো তার আত্মার সম্পর্ক। এখানকার কারো বিপদে-আপদে-দুঃসময়ে কয়সর বাড়িয়েছে ভরসার বিশ্বস্ত হাত। কয়সর যে পূর্ব লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটির কত প্রিয়জন ছিলো সেটির প্রমাণ পেয়েছি গত ২৭ নভেম্ব্র শুক্রবার বাদ জুমায় তার নামাজে জানাজায়। কত মানুষ এসেছিলো তাকে শেষ বিদায় জানাতে, সবার চেহারায় ছিলো বিষাদের ছাপ। সবাই তাকে একবাক্যে ভালো মানুষ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তখন আমার মনে হয়েছে, মৃত্যুর সময়ে এই বিপুল মানুষের স্বাক্ষী এটি পরকালে তার পাথেয় হবে। জানাজা শেষে তাকে হেনল্টের গার্ডেন অব পিসে দাফন করা হয়। দোয়া করি, মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, আল্লাহ তাকে মায়া করুন এবং শান্তিতে রাখুন। দোয়া করি মহান আল্লাহ পাক যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের অধিবাসী করেন।

মৃত্যুর আগে আলাপকালে আমার কাছে তার দুইটি ইচ্ছার কথা বলেছিলো কয়সর। তার একটি ছিলো ওমরাহ পালন এবং অন্যটি ছিলো দেশে গিয়ে অসহায় দরিদ্র মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ। মহান আল্লাহ তার প্রথম ইচ্ছাটি কবুল করেছিলেন। অসুস্থতা নিয়েও মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে ওমরাহ পালন করার সৌভাগ্য হয় তার। দ্বিতীয় ইচ্ছাটি পূরণ হয়নি কয়সরের। শেষবারের মতো দেশে যাওয়া হয়নি তার।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close