অন্য পত্রিকা থেকে

মহাকাশ যখন নারীর হাতের মুঠোয়

মুশফিকুল হক মুকিত: মহাশূন্যের প্রত্যেক ধাপে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। পৃথিবীর বাইরে থেকে পৃথিবীকে দেখতে একটা শুভ্র অন্ধকারময় নীল বলয়ের মতো মনে হয়েছিল। মহাশূন্যে যখন ক্যাপ্সুলটা খুলে যায় সেই দৃশ্যেটা ছিল অবাক করার মতো বিস্ময়। হঠাৎ দমকা বাতাসের মাঝে অদ্ভুত গন্ধে মাথায় এসে ঝাঁকি খায়। পৃথিবী সত্যি অসাধারণ। কারণ, এক পরিবেশ অন্য পরিবেশের বিপরীত। এভাবেই ইতালির সামান্থা ক্রিস্তোফোর্ত্তি টুইটারে তার অনুভূতি প্রকাশ করেন।

মহাশূন্যে নারীদের বিচরণ পুরনো নয়। তবে সহজও নয় ওই গন্তব্যে পৌঁছানো। এ যাবৎকালের পুরনো সব ইতিহাস ভেঙে ইতালির সামান্থা ক্রিস্তোফোর্তি গড়ে তোলেন নতুন রেকর্ড। মহাশূন্যে ২০০ দিন অতিবাহিত করেন তিনি। তিনি ৫৯তম নারী হিসেবে মহাশূন্যে অবস্থান করেন। তিনি রাশিয়ার সুয়েজ নভোযানে চড়ে মহাকাশে পৌঁছান ২০১৪ সালের নভেম্বরে। পৃথিবীতে ফিরে আসেন ২০১৫ সালের ৬ জুন, আলো ঝলমলে বেলা ১১টা ৪ মিনিটে।

সামান্থা ইতালির পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর মালে, ট্রেনটিনো শহরে ১৯৭৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে আমেরিকান এক্সচেইঞ্জ প্রোগ্রামের সুযোগ পান। আমেরিকান স্পেইস ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকেই তার স্বপ্ন দেখা শুরু। পড়াশোনা করেন ইতালির বোলজানো, ট্রেনটিনোতে। জার্মানির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর গ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টার্স করেন। ফ্রান্স এবং রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। মহাকাশ বিজ্ঞানের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নেন।

তিনি ইতালির প্রথম নারী লেফটেন্যান্ট। যুদ্ধবৈমানিক হিসেবে তিনি ইতালির এয়ারফোর্সে যোগ দেন। এর তিন বছর পর, ২০০৯ সালে ৭ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে ইউরোপিয়ান স্পেইস এজেন্সি থেকে নভোচারী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

কাজাকিস্তানের বাইকোনুর ডকোড্রাম থেকে সুয়েজ টিএমএ-১৫এম করে সামান্থা আরও দু’জন সহকর্মী নভোচারীকে নিয়ে ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর মহাকাশেযানে সফলভাবে উড়ে যান মহাশূন্যে। যান্ত্রিক ত্র“টির জন্য এক মাস মহাশূন্যে অপেক্ষা করে ১১ জুন ২০১৫তে ফিরে আসেন। ইতালি সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা অর্ডার অফ মেরিট অফ দ্য ইতালিয়ান রিপাবলিক লাভ করেন। সামান্থা ইতালিয়ান, ইংলিশ, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, রাশিয়ান বহু ভাষায় কথা বলতে পারদর্শী।

তিনজন নভোচারী কাজাকিস্তান সুয়েজ নভোযান ক্যাপসুলে কাজাকিস্তানে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক দল তাদের কাছে পৌঁছে যান। দীর্ঘদিন মহাশূন্যে থাকার কারণে শরীরের মাংস পেশিতে টান, স্বাভাবিক চলাচল, দেহের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক হতে সময় নেয় তার। পূণর্বাসন কেন্দ্রে নিবিড় পরিচর্যার মধ্যে রয়েছেন তিনি। সামান্থার চলাফেরা স্বাভাবিক হলেই তিনি জনসমক্ষে আসতে পারবেন।

মহাকাশচারী হওয়ার গল্প বলতে গিয়ে সামান্থা বলেছেন, ‘শৈশবে চাইতাম মহাশূন্যে ভ্রমণ করতে। আমার অভিভাবক আর বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে মহাশূন্য সম্পর্কে জানতে চাইতাম। আমি কি হতে চাইতাম তা আমার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এমন না যে, মহাশূন্য আমার পছন্দের স্থান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের এক ধাপে যখন সিদ্ধান্ত নিলাম।

তখন তাদের বলি আমি মহাশূন্যে যাব। সময়ের সঙ্গে ক্যারিয়ারটা সেভাবেই তৈরি হয়ে গেল।’ মহাশূন্যে যাওয়ার আগে ও পরে সামান্থা এখনও তেমন কোনো অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের সরাসরি মুখোমুখি হননি। অনেকটাই সামাজিক যোগাযোগ বিমুখ সামান্থা। তবে, মহাকাশে থাকাকালীন মহাশূন্যে, নভোমণ্ডলের বেশকিছু ছবি প্রকাশ করেন তার ব্যক্তিগত টুইটার অ্যাকাউন্টে। ৩

৮ বছর বয়স্ক সামান্থা অবিবাহিত। মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এখনও গণমাধ্যমে তেমনভাবে প্রকাশ না করলেও কিছু কিছু অনুভূতি শেয়ার করেছেন। সামান্থার সঙ্গে থাকা দু’জন ক্রুমেট যখন মহাশূন্যে হাঁটতে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেন। সামান্থাকে অনুরোধ করেন নভোযানকে তার নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার। সামান্থার কারিগরি জ্ঞান আগে থেকেই রপ্ত ছিল।

তাই একটু ভয় পেলেও দমে যাননি। পরে নিজ সাহসিকতার পরিচয়ে নভোযানের কার্যক্রম নিজেই চালিয়ে নেন। সামান্থা যদি নভোযানে সামান্যতম ভুল করতেন হয়ত তার দু’জন সহচরী মহাশূন্যে চিরতরে হারিয়ে যেতেন। এমনি সূক্ষ্ম দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সামান্থা।

মেয়েদের মহাশূন্য বিচরণে আগ্রহী করার জন্য সামান্থা বলেন, মেয়েদের অনেক মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা এসটিইএম (বিজ্ঞান, টেকনোলজি, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি বিষয় এড়িয়ে যায়। যা সত্যি হতাশাজনক।

ইউরোপিয়ান স্পেইস সায়েন্সকে দেয়া এক তথ্যে সামান্থা জানান, মহাশূন্যে গিয়েও তাকে অফিসের মতো ঠিক সকাল সাড়ে ৭টায় রিপোর্ট করতে হতো ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রোল সেন্টার রাশিয়া, ইউরোপ, ইউএস, জাপানকে। এ সম্পর্কে সামান্থা জানান, সকালে ঠিক সাড়ে ৭টায় ১ মিনিটের মধ্যেই এসে রিপোর্ট করতেন কন্ট্রোল ইউনিটে। ইচ্ছে করলেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা যাওয়া যেত না।

এর কিছু কৌশল রয়েছে। কোথায় চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কিভাবে চাপ প্রয়োগ করে স্থান ত্যাগ করতে হবে তা জানতে হবে। কৌশল প্রয়োগে ব্যর্থ হলে নিজের জায়গায় ঘূর্ণনরত থাকতে হবে। মহাশূন্যে ভাসাটা এক অনবদ্য স্বাধীনতা, স্পর্শকাতর অনুভূতি। সেই আড়মোড়া স্বাধীনতাকে জাগিয়ে সবকিছু জয় করে নিয়েছেন তিনি।

মহাশূন্যে অবস্থানকালে খাওয়া-দাওয়া সম্পর্কে তিনি জানান, মহাশূন্যে কুয়েনা সালাদ, ম্যাক্রেল সেই সঙ্গে টমেটোকে অলিভ ওয়েল দিয়ে মাখিয়ে খেতে পছন্দ করতেন। এটি ছিল তার পছন্দের খাবার। সামাজিক যোগাযোগ বিমুখ সামান্থা বলেন, মহাশূন্যে এত ব্যস্ত থাকতে হতো যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বসার সময় থাকত না।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close