অন্য পত্রিকা থেকে

বিমান বন্দরে হয়রানি বন্ধের দাবী প্রবাসীদের

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানকে যতটা ক্রমশ শক্তিশালী করে চলেছে, মূলত তার সম পর্যায়ে আর কোনো কিছুই হতে পারেনা।

অথচ সেই চরম দুর্ভাগা প্রবাসীরা দেশে ফেরত আসাকালীন সময় প্রতিনিয়ত বিমানবন্দরে কর্মরত কতিপয় কর্মকর্তাদের অসদাচরণ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে নানান হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যাত্রীদের দুঃখ, দুর্দশার কথা বিবেচনায় এনে অনুসন্ধান করা হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। উল্লেখ্য, দেশে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে ৩টি। এগুলো হচ্ছে-

১। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর,ঢাকা।

২। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর,চট্টগ্রাম।

৩। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর,সিলেট।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিরামহীন দুর্নীতির সীমাহীন রেকর্ড সৃষ্টির নজির কোনো কালেই ভালো ছিলো না,যেমন ছিলো অতীত তেমনই বর্তমান অবস্থা। যদিও কখনো কখনো দুর্নীতি অতি মাত্রায় বেড়ে গেলে সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তারা উপরের নির্দেশে তাৎক্ষণিক ভাবে দুর্নীতি দমনে সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন, তবে শুধুমাত্র তখনই বিমান বন্দর কর্মকর্তারা সচেষ্ট ভূমিকা রাখছেন বৈ-কিছু নয়;কিন্তু পরক্ষণেই আবার দুর্নীতিতে সেই লাগামছাড়া অবস্থা অব্যাহত আর যাত্রীদের চরম হয়রানি বেড়ে যায় সীমাহীনভাবে।

সাম্প্রতিক কালে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে বিমান বন্দরটিতে দুর্নীতি,চোরাচালান,যাত্রী হয়রানির মতো ইত্যাদি ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে চলেছে। বিদেশ প্রত্যাগত বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এবং মালয়েশিয়া প্রত্যাগত শ্রমিকদের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বিভিন্নভাবে হয়রানি করে থাকে।

সাধারণত প্রবাসী শ্রমিকদের কাস্টমস পণ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকে না। আগত যাত্রীদের ব্যাগেজ তল্লাশির নামে কম্প্যুটারের এলসিডি মনিটর, টেপ রেকর্ডার, স্বর্ণ, প্রসাধনী, নানা ‘House Hold’ সামগ্রীর কাস্টমস দিতে হবে বলে আটকে রেখে নগদ নারায়ণের ভিত্তিতে ছেড়ে দেয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানের এয়ার-ফ্রেইটের কাস্টমস আদায়ের জন্য বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত কাস্টমস অধিদফতরের ঘুষ-বাণিজ্য চলছে প্রকাশ্যে। বিমান অবতরনের পর প্রথমেই যাত্রীদের শরণাপন্ন হতে হয় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের। আগমনী বা এরাইভেল ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করা থাকলে,সেটি জমা দিয়ে,পাসপোর্টে সীল নিয়ে সেখান থেকে বিদায় নেয়ার আগেই মেজাজ তিক্ত হয়ে ওঠে। অধিকাংশ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার অবান্তর ও বিব্রতকর প্রশ্নে বিরক্ত না হয়ে উপায় থাকে না। সহযোগিতার জায়গায় যাত্রীদের হতে হয় বিড়ম্বনার শিকার।

এর পরের ধাপটি হচ্ছে, ব্যাগেজ সংগ্রহ। ব্যাগেজ বহনের জন্য যে ট্রলি গুলো রয়েছে সেগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো ও জনবলের অভাবে বিদেশ থেকে আসা বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের যাত্রীদের এ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ব্যাগেজ পেতে বিড়াম্বনা আগের তুলানায় এখন আরো বেড়েছে। ঢাকায় আসা যাত্রীদের ব্যাগেজ ডেলিভারির জন্য বিমানবন্দরে ৮টি কনভেয়ার বেল্ট রয়েছে। ব্যাগেজ পাওয়ার জন্য যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা।

দেখা যায়, উড়োজাহাজ থেকে কন্টেইনার কিংবা ট্রলিতে করে ব্যাগেজ এনে কনভেয়ার বেল্টে দেয়ার জন্য ডেলিভারি পয়েন্টে ব্যগ গুলোকে ছুড়ে দেয়া হয়। এতে ব্যগের ভেতরের জিনিস নষ্ট হয়। ভেঙ্গেও যায়। কোন ব্যাগে ভংগুর কিছু থাকলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ বুকিং এর সময় এটিতে লাল রং এর ফ্রাজেল ষ্টিকার (fragile sticker) মেরে দেয়। যাতে ঐ ব্যাগটির প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া হয়।

পৃথিবীর অন্য দেশের বিমান বন্দরে এই ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশ এর পরিপন্থি। ব্যাগ ছুড়ে দেয়ার কাজ গুলো যারা করেন তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মচারি। সিন্ডকেট বদ্ধ। ব্যাগের কোন জিনিসের ক্ষতি এমন কী ব্যাগের বাহ্যিক কোন ক্ষতি হলেও সেটার ক্ষতিপূরণ দিতে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ বাধ্য। কিন্তু হয়রানি’র আতংকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাত্রীরা কোন ক্লেইম করেন না। নীরবে মেনে নেন নিদারুণ এই কষ্ট।

ব্যাগ হারানো গেলেও ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। যেই যাত্রী যে এয়ারলাইন্সে ট্রাভেল করেন, হারানো জিনিস ক্লেইম এর ক্ষেত্রে তাকে ঐ কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তবে হারানো ব্যাগ ফেরত পাওয়ার নজির খুব কম। দিনের পর দিন ঘুরেও হারানো ব্যাগের হদিস পাওয়া যায় না।

উল্লেখ্য, উড়োজাহাজের ব্যাগেজ কম্পার্টমেন্ট থেকে যাত্রীদের মালামাল টার্মিনাল ভবনের ডেলিভারি পয়েন্টে আনার জন্য যে ট্রাক্টর ব্যবহার করা হয় সেগুলোর অর্ধেকেই দীর্ঘদিন যাবৎ অচল। এসব মেরামত বাবদ বিমানকে প্রতিবছর বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

এর পরের ধাপটি হচ্ছে সবচেয়ে অপ্রীতিকর এবং ভয়াবহ। ব্যাগ পেয়ে সম্মুখিন হতে হয় কাষ্টমস কর্মকর্তাদের। শিকারী যেমন শিকারের দেখা পেলে উদ্বেলিত হয়ে উঠে,তেমনটি প্রবাসী যাত্রী দেখলেই এসব কর্মকর্তার লোলুভ চোখ জ্বল জ্বল করতে থাকে। তল্লাশির নামে চলে রীতিমতো স্বেচ্ছাচারিতা। লাগেজ খুলে মালামাল তছনছ করা হয়। সেখান থেকে নিজেদের পছন্দ সই জিনিস রেখে দিতে এতোটুকু দ্বিধা করেন না।

এছাড়া বিভিন্ন জিনিসের জন্য ট্র্যাক্স দিতে হবে বলে ভয়-ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করেন। অথচ ভ্রমনের সময় প্লেনের প্রতিটি যাত্রীকে কোন কোন জিনিসের ট্র্যাক্স দিতে হবে এবং কতো টাকা দিতে হবে সেমর্মে একটি তালিকা দেয়ার রীতি রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন কিছু অসাধু কাষ্টমস কর্মকর্তা’রা।

বিমান বন্দরে এইসব দুর্নীতি,চোরাচালান,চাঁদাবাজি এবং অহেতুক হয়রানি’র কথা স্বীকার করেছেন খোঁদ স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, আগামীতে যেসব শ্রমিক বিদেশ থেকে আসবে তাদের যাতে বিমান বন্দরে কোনো রকম হয়রানি না করা হয় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষকে।

১৮ ডিসেম্বর (শুক্রবার) আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন,দেশে ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের সামাজিক ও আর্থিকভাবে সংশ্লিষ্ট করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার।

এদিকে, কুয়েত থেকে দেশে প্রিয় স্বজনদের কাছে মালামাল পাঠাতে গিয়ে চরম হয়রানি ও নাজেহালের শিকার হচ্ছেন প্রবাসীরা। এ নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভের। আইনের দোহাই দিয়ে পদে পদে প্রবাসীদের হয়রানি করায় ফুঁসে উঠছে ভূক্তভোগীরা। আর এসব কারণে এখানে বন্ধের উপক্রম হয়েছে প্রবাসীদের সেবায় নিয়োজিত বেশ কিছু কার্গো প্রতিষ্ঠান।

অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা বিমান বন্দরে উৎকোচ দাবি,না পেয়ে মাত্রাতিরিক্ত হয়রানি ও জরিমানাও করছে প্রবাসীদের। দূতাবাস, মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ধর্ণা দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না প্রবাসীরা। বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে অনেক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী হয়রানি বন্ধ ও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করার দাবিতে জালালাবাদ প্রবাসী কল্যাণ পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি নগরীর কোর্ট পয়েন্টে মানববন্ধন কর্মসূচী পালিত হয়। সভায় বক্তারা বিমান বন্দরে যাত্রী হয়রানি বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং প্রবাসী যাত্রীদের হরয়ানি বন্ধের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।

অপরদিকে, ১৬ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত চট্রগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অদ্যাবধি নেই কোন আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা। অধিকাংশ স্ক্যানিং মেশিন বিকল,কাস্টম স্ক্যানিং মেশিনটি নষ্ট,নেই কোন তথ্যকেন্দ্র।

অথচ, চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল ও চট্টগ্রামের বাণিজ্য ও পর্যটনের সম্ভাবনার কারণে ২০০০ সালে জাপান সরকারের দেয়া ৬০০ কোটি টাকা ঋণে নতুন স্থানে নির্মিত হয় এই নতুন বিমান বন্দর। শুরুতে বেশকিছু এয়ারলাইন্স সাড়াও দিয়েছিল। এখন হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি বিমান কোম্পানি তাদের সার্ভিস কোন প্রকারে চালু রেখেছে।

তাও এগুলো টিকে আছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী যাত্রীদের কারণে। বিমানবন্দরে একটিমাত্র রানওয়ে থাকায় একটি বিমান ল্যান্ড না করা পর্যন্ত অন্যটি আকাশে উড়তে থাকে। প্রবাসী যাত্রীদের অভিযোগ ফ্লাইট বাতিল হলে সময়মতো তথ্য পাওয়া যায় না,আবার তথ্য পেতে হয়রানির শিকার হতে হয়।’

একটি দেশের সৌন্দর্য্যের অংশ বিশেষ বিমান বন্দর। বিদেশ থেকে কেউ আমাদের দেশে এসে প্রথমেই যে জিনিসটি দেখে সেটি হচ্ছে বিমান বন্দর। সেখানের কর্মকর্তা-কর্মচারি’র ব্যবহার। বিদ্যমান অবস্থা দেখে তারা আমাদের দেশ সম্পর্কে কী ধারণা পাচ্ছেন? অপরদিকে,প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করেন। দেশে ফেরেন বেশ কয়েক বছর পর। তাদের সাথে এমন বিমাতাসুলভ আচরণ কেন?

তাদের রক্ত জল করা অর্থে বাড়ে দেশের রেমিটেন্স। হয় দেশের উন্নয়ন। সেক্ষেত্রে বিমান বন্দরে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা কী খুব কঠিন? প্রবাসীরা ভিআইপি সুবিধা চায় না। শুধু অহেতুক হয়রানি থেকে বিরত থাকতে চায়। সরকার কি তাদের এই ক্ষুদ্র চাওয়াটি পূরণ করতে পারে না?

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close