যুক্তরাজ্য জুড়ে

মুসলিম মহিলাদের ইংরেজী শিখতে ফান্ডিংয়ের ঘোষণা দিল ব্রিটেন: না শিখলে ছাড়তে হবে স্বপ্নের দেশ

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: বিবাহ সূত্রে বা স্পাউস ভিসায় যুক্তরাজ্যে বসবাসকারীরা দেশটিতে গমনের আড়াই বছরের মধ্যে ইংরেজি ভাষা শিখতে না পারলে তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এজন্য ইউকের মুসলিম মহিলাদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড ফান্ডিংয়ের ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামরন।

বিবিসি রেডিও ফোর প্রোগ্রামে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা আছে, যেগুলো ইংরেজী ভাষায় দক্ষ হলে কাজে লাগিয়ে জীবনকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, মুসলিম কমিউনিটির অনেক পরিবারই পুরুষ শাসিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক মুসলিম মহিলাকে ইংরেজী ভাষা শিখার জন্য ঘর থেকে বের হতে দেয়া হয় না বলেও অভিযোগ আছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইংল্যান্ডে এ ধরনের ব্যবহার চলতে দেয়া যাবে না।

ইংরেজি ভাষা জ্ঞান বৃদ্ধির মাধ্যমে চরমপন্থা অবলম্বন থেকে তাদের বিরত রাখতে সহায়ক হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘরে স্ত্রী, কন্যা এবং বোন অর্থাৎ মুসলিম মহিলারা পুরুষ শাসিত ঘরে কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকেন এবং সে বিষয়ে শরিয়া কোর্টসহ বৃটেনের ধর্মীয় বা রিলিজিয়াস কাউন্সিলগুলোর ভুমিকা রিভিউর ঘোষণাও দেন তিনি।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, স্কুল-কলেজ বা আদালতের মতো যেসব জায়গায় নিয়ম রয়েছে সেখানে মুসলমান নারীদের তাদের মুখের পর্দা সরিয়ে কথা বলার নিয়মও চালু করা হতে পারে। আগামী অক্টোবর থেকে যারা যুক্তরাজ্যে বসবাসের জন্যে আসবেন তাদের জন্য এমন নিয়ম চালু করা হবে বলে বিবিসি রেডিও ফোর’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান ক্যামেরন।

সম্প্রতি ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে তা প্রতিরোধে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিভিন্ন জাতি ও ভাষাভাষীর বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীকে মূলধারায় নিয়ে আসতে এক কৌশলের অংশ হিসেবে ইংরেজি শেখানোর এই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। ক্যামেরনের ভাষ্য, যুক্তরাজ্যের কোনো কমিউনিটিতে বিভাজন দেখতে চান না তিনি। অভিবাসীরা যাতে মূলধারার সঙ্গে মিশে যেতে পারে এমনটি দেখতে চান তিনি।

ইংরেজি বলার দক্ষতা ও উগ্রবাদের মধ্যে কোনো স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে এমনটা জোর দিয়ে বলছেন না দাবি করে ক্যামেরন বলেন, কিন্তু আপনি যদি ইংরেজি বলতে না পারেন, তাহলে আমাদের দেশের মূলধারায় মিশতে অসুবিধায় পড়বেন। এতে হঠাৎ করে আপনি নিজের কাছে নিজের পরিচয় সংকটে পড়তে পারেন। তারপর দায়েশ (আইএস) কোনো উগ্র বার্তায় আপনি সহজেই প্রভাবিত হতে পারেন। ইংরেজি শেখানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী ২ কোটি পাউন্ডের একটি তহবিলও ঘোষণা করেছেন।

বৃটিশ সরকার মনে করে, ইউকেতে বসবাসরত প্রায় ২২ শতাংশ মুসলিম মহিলা ইংরেজী ভাষায় কথা বলতে পারেন না অথবা কেউ কেউ খুব অল্প কথা বলতে পারেন। ইংরেজি ভাষা দক্ষতার মাধ্যমে সেগ্রিগেশন, জোরপূর্বক বিয়ে এবং ইসলামিক স্টেইটের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কবল থেকে বৃটিশ মুসলিম মহিলাদের রক্ষা করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ইংরেজী ভাষায় দক্ষতার মাধ্যমে স্পাউস ভিসায় ইউকেতে আসা মহিলাদের সহায়ক হবে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য আগামী অক্টোবর থেকে, স্পাউস ভিসায় ইউকেতে আসার ৫ বছরের মধ্যে অন্তত আড়াই বছরের ভেতরে ইংলিশ ভাষার উপর টেস্ট নেয়া হবে।

এ প্রক্রিয়ায় নতুন ইংরেজি টেস্ট প্রবর্তন করা হবে। ভাষা শেখায় কোনো অগ্রগতি না হলে বিবাহ সূত্র বা স্পাউস ভিসায় দেশটিতে কারও থাকার নিশ্চয়তা নেই; এমন কি তাদের ছেলেমেয়ে থাকলেও। মূলত দেশটিতে বসবাসরত মুসলমান জনগোষ্ঠীর নারীরা জীবনযাপনে বৈষম্যের স্বীকার হয় এবং ভাষা শেখায় পিছিয়ে থাকে বলে টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে দাবি করেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির লেকচারার এবং মুসলিম ইন বৃটেইনের গবেষক ডক্টর সুন্দাস আলী মনে করেন, ইউকেতে কিছু মুসলিম মহিলার ইংরেজী ভাষায় স্বল্প দক্ষতা থাকতেই পারে। কিন্তু এখানে আরো বড় সমস্যা রয়ে গেছে। মুসলিম কমিউনিটিতে কালচারাল প্রবলেম বিশাল বলে মনে করেন তিনি। নন মুসলিম মহিলাদের মতোই অন্যান্য ক্ষেত্রেও মুসলিম মহিলাদের সমান সুযোগ এবং উৎসাহ প্রদান করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের এক লাখ ৯০ হাজার মুসলিম নারী ইংরেজি ভাষা জানেন না, যার মধ্যে ৪০ হাজার ইংরেজি একদমই বলতে পারেন না। এটা বিস্ময়ের কিছু নয় যে, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীদের ৬০ শতাংশ অর্থনৈতিকভাবে ইন্যাক্টিভ বা অচল, বলেন ক্যামেরন। রেডিও সাক্ষাৎকারে ক্যামেরন বলেন, স্কুল-আদালত ইত্যাদি যেখানে নিয়ম রয়েছে সেখানে মুসলিম নারীদের তাদের মুখের পর্দা সরিয়ে কথা বলতে হবে।

স্পাউস ভিসায় বসবাসরত মুসলিম নারীদের ইংরেজি বলতে না পারার কারণ হিসেবে তাদের ঘরে বন্দি করে বিচ্ছিন্ন রাখা হয় বলে পরিবারগুলোর পুরুষদের দায়ী করেন যুক্তরাজ্যের রক্ষণশীল দলের এই নেতা। ওইসব মুসলিম পুরুষদের উদ্দেশে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের পুরুষ ছাড়া ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। এমন ঘটনা আমাদের দেশে ঘটছে; মূল্যবোধ উদারতা এবং সহনশীলতার জন্য গর্বিত আমাদের দেশে এমনটা ঘটছে।

বিশ্বের বহুজাতিক, বহু ধর্মের সফল গণতন্ত্রের মধ্যে আমরা অন্যতম; তবে এখানে বিচ্ছিন্নতা মানুষকে এগোতে দিচ্ছে না। এটি ব্রিটিশ মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এটি শেষ হতেহবে। জনগণের পোশাক পরিচ্ছদসহ ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্ব রয়েছে বললেও শুধু ধর্মীয় কারণে স্কুল-কলেজের পোশাক সম্পর্কিত নীতি লঙ্ঘনেরবিরোধীপ্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন।

আমাদের দেশে মানুষ কী পরতে চায়, কীভাবে বাস করতে চায়, এই স্বাধীনতা তাদের থাকতে হবে। তবে স্কুল কলেজের পোশাক সম্পর্কিত নীতি শুধু ধর্মীয় কারণে লঙ্ঘন নয়। এ বিষয়ে স্কুলের নীতির প্রতি নমনীয়তা দেখাতে হবে। অতীতে স্কুলে মুসলিম মেয়েদের হিজাব ও জিলবাব পরা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে এবং অনেক ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসও হিজাব বিতর্ক থেকে দূরে থাকেনি।

লেবার দলীয় সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র তার স্থানীয় সার্জারিতে আসা মুসলিম নারীদের সঙ্গে নেকাব (মুখের পর্দা) পরা অবস্থায় কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন বলায় তোপের মুখে পড়েছিলেন। এই প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নারীদের মুখের পর্দা সরানো সম্পর্কিত ধর্মীয় নাজুক বিষয় নিয়ে কথা বললেন। ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে মুখ ঢাকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এ ধরনের বক্তব্যে মাধ্যমে ডেভিড ক্যামেরন মুসলিম কমিউনিটিকে অন্যায়ভাবে কলঙ্কিত করছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা এন্ডি বার্নহাম। বার্নহাম বলেন, এতে সমস্যাকে আরও জটিল করছেন তিনি।

এদিকে মুসলিম মহিলাদের ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ফান্ডিংয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মুসলিম কাউন্সিল অব বৃটেইন। তবে ইউকেতে মুসলিম কমিউনিটির মতো অন্যান্য কমিউনিটিতেও মহিলারাও ইংরেজী ভাষা সমস্যায় ভুগছেন বলে মনে করে এমসিবি।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close