অন্য পত্রিকা থেকে

কিডনি বেঁচে গ্রামীণ ব্যাংকের দায় শোধ

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ঋণের বিপ্লব বহু মানুষকে স্বনির্ভর করেছে বলে দাবি করা হয়। আর এই ক্ষুদ্র ঋণের জনক দাবি করেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এজন্য তিনি নোবেলও পেয়েছেন। কিন্তু নিভৃত গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল ভিন্ন কথা। গ্রামের মানুষ এখন ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন।

অনেকে বলছেন ঋণের কিস্তি শোধ করতে করতে তাদের জীবন অতিষ্ঠ। এই ঋণ না নেয়াই ভাল বলছেন কেউ কেউ। আবার কিছু এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ক্ষুদ্র ঋণের দায় মেটাতে নিজের কিডনি বিক্রির মত চরম পথও বেছে নিয়েছেন অনেকে।

জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলা। গ্রামের বুক চিরে চলে গেছে ধূলি ধুসর এক রাস্তা। দুপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত। বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি ঘরবাড়ির বাইরে খেলছে নগ্নদেহ শিশুরা।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের আরো লাখ লাখ মানুষের মতো এই শিশুরাও এক কঠিন জীবনের মুখোমুখি। দারিদ্রের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এখানে অনেক মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু এই ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই আরো কঠিন সমস্যায় পড়ে। ক্ষুদ্র ঋণ পরিশোধ করার জন্য অনেকে এমনকি তাদের শরীরের অঙ্গ পর্যন্ত বিক্রি করছেন।

শরীরের অঙ্গ বিক্রির ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র মানুষেরা অনেকদিন ধরেই এই কাজ করছেন। কিন্তু যেটা অজানা, তা হলো ক্ষুদ্র ঋণের দায় শোধ করার জন্যও অনেকে শরীরের অঙ্গ বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন।

কিডনি বিক্রয়

মোহাম্মদ আখতার আলমের বয়স ৩৩। তার পেটে ১৫ ইঞ্চি দীর্ঘ একটি কাটা দাগ। তার একটি কিডনি অপসারণ করা হয়েছিল, সেই দাগ রয়ে গেছে শরীরে। বাংলাদেশে কেবলমাত্র নিজের পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কারো জন্য অঙ্গ দান করা বেআইনি।

কিডনি অপসারণের অস্ত্রোপচারের পর যে পরিচর্যার দরকার ছিল, তা ঠিকমত পাননি মোহাম্মদ আখতার। ফলে তার শরীরের অর্ধেক এখন অবশ হয়ে গেছে। তিনি এখন কেবল এক চোখে দেখতে পান। ভারী কোনো কাজ-কর্ম করতে পারেন না।

ক্ষুদ্র ঋণ শোধে কিডনি বিক্রি করেছেন মোহাম্মদ আখতার আলম। সংসার চালাতে মোহাম্মদ আখতার এখন একটি ছোট্ট দোকান দিয়েছেন। সেখানে তিনি বিক্রি করেন চাল, ময়দা থেকে শুরু করে বাচ্চাদের জন্য নানা মিষ্টি খাবার।

বছর কয়েক আগে পর্যন্ত মোহাম্মদ আখতার আলম ছিলেন ভ্যান চালক। মোট আটটি প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। এসব ঋণের যে কিস্তি আসতো, ভ্যান চালিয়ে তা পরিশোধ করতে পারতেন না। এরকম সময়ে একদিন শরীরের অঙ্গ বিক্রির প্রস্তাব এলো তার কাছে। আমার ভ্যানগাড়িতে চড়ে লোকটি যাচ্ছিল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো কেন আমি এই কাজ করি।

আমি তাকে বললাম আমি খুবই গরীব এবং সাত-আটটা এনজিও থেকে আমি ঋণ নিয়েছি। তখন আমার ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ টাকার মতো। এনজিওগুলোকে টাকা শোধ দিতে পারছি না। টাকা শোধ করার জন্য আমি বাড়ির ফার্ণিচার, রান্নার হাঁড়ি-কুড়ি পর্যন্ত বিক্রির চেষ্টা করেছি। এনজিওগুলোর কাছ থেকে যে টাকা ধার নিয়েছিলাম, সেই টাকা শোধ দিতে না পেরেই আমি কিডনি বিক্রি করি। মোহাম্মদ আখতার আলম এক ঋণের চক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন। সেটা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্য এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তা শোধ করার চেষ্টা করেন।

সেদিনের ভ্যানগাড়ির সেই যাত্রী ছিলেন মানুষের অঙ্গ কেনা-বেচার দালাল। লোকটি তাকে চার লাখ টাকায় একটি কিডনি বিক্রি করতে রাজী করিয়ে ফেললো।

এর ১৭ দিন পর মোহাম্মদ আখতার আলম ঢাকার এক বেসরকারি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেন। তার শারীরিক অবস্থা খুবই সংকটজনক। কিডনি বিক্রি করে যে টাকা পাওয়ার আশা তিনি করেছিলেন, পেয়েছেন তার কয়েকভাগের একভাগ।

এনজিওগুলোর কাছ থেকে যে টাকা ধার নিয়েছিলাম, সেই টাকা শোধ দিতে না পেরেই আমি কিডনি বিক্রি করি। আমরা গরীব, অসহায় মানুষ। সেজন্যেই এটা করেছিলাম। এখন আফসোস করি, কেন করলাম!

কালাই গ্রামেরই আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ মোকাররম হোসেন। ক্ষুদ্র ঋণের চক্করে পড়ে তিনিও কিডনি বিক্রি করেছেন। এনজিওর টাকা শোধ করতে আমি কিডনি বিক্রি করি। মোকাররম হোসেনের কিডনি অপসারণ করা হয় ভারতে। ডাক্তার তাকে জানিয়েছিল এতে কোনো ঝুঁকি নেই। কিন্তু এখন তিনি কোনো ভারী কাজ করতে পারেন না।

ক্ষুদ্র ঋণকে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষের ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়। জামানত ছাড়া ঋণ নিয়ে গরীব মানুষ যাতে আয়বৃদ্ধি মূলক কাজ-কর্মে লিপ্ত হতে পারে, সেটাই ক্ষুদ্র ঋণের মূল লক্ষ্য। কিন্তু এই ঋণ মানুষ কিভাবে শোধ করছে, সেদিকে খুব কমই নজর দেয়া হয়েছে। অনেক মানুষ একাধিক ঋণ নেয়ার পর আবার নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন কীনা—সেটা জানার কোনো উপায় ক্ষুদ্র ঋণপ্রদানকারি সংস্থাগুলোর নেই। এর ফলে অনেক মানুষ একটা ঋণ শোধ করতে আরেক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে এক চক্রে আটকে পড়েন। এর পরিণামে তাদের কিডনি বিক্রির মতো চরম সিদ্ধান্তও নিতে হয়।

বাংলাদেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেচা-কেনার ব্যবসা নিয়ে গত ১২ বছর ধরে গবেষণা করছেন মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্বের অধ্যাপক মনির মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, অনেক মানুষ সংকটে পড়ার পর মনে করে তাদের সামনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।

এনজিওদের কাছ থেকে যারা ঋণ নিয়েছে, তাদের অনেকের ধার-দেনাই কিন্তু সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। যেহেতু তারা আর ঋণ শোধ করতে পারছে না, তখন তারা মনে করছে একটা পথই খোলা আছে। তা হলে শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দেয়া।

অধ্যাপক মনিরুজ্জামান তার গবেষণার কাজে মোট ৩৩ জন মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যারা তাদের কিডনি বিক্রি করেছেন। এদের অনেকে তাকে জানিয়েছেন, ঋণ শোধ করতে না পেরেই এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

তিনি অভিযোগ করেন গ্রামীণ ব্যাংক বা ব্রাকের মতো এনজিওর কর্মকর্তারা ঋণ শোধের তাগিদ দেয়ার জন্য ঋণগ্রহীতার বাড়িতে গিয়ে বসে থাকেন। তাদের নানাভাবে হয়রানি করেন, ভয়-ভীতি দেখান। এমনকি পুলিশের কাছে অভিযোগ করবেন বলে হুমকি দেন। যেহেতু তারা আর ঋণ শোধ করতে পারছে না, তখন তারা মনে করছে একটা পথই খোলা আছে। তা হলে শরীরের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দেয়া।

মনিরুজজামান বলেন, একজন আমাকে জানিয়েছিলেন, ঋণ শোধ করতে না পেরে তিনি এক বছরের জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, যাতে তাকে এনজিও কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হতে না হয়। এনজিওগুলো ঋণ আদায়ের জন্য যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল, তা লোকটি আর সইতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত সে তার একটি কিডনি বিক্রি করে দেয়।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় বলা হচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধ কাঠামো এবং গ্রামের মানুষের আয়-উপার্জনের অনিশ্চয়তা—এই দুয়ে মিলে সমস্যা অনেক জটিল হয়ে পড়েছে।

জাপানের একটি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকনমিক্সের এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, ঋণ শোধের জন্য অনেকে তাদের সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে। অনেকে চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে, যাতে কিস্তি শোধে ব্যর্থতার দায়ে তারা ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ঋণ পাওয়ার অধিকার না হারায়।

মাইক্রো ক্রেডিট সামিট ক্যাম্পেইনের হিসেব হচ্ছে, ১৯৯০ সাল হতে ২০০৮ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে দারিদ্রের চক্র থেকে মুক্ত করেছে ক্ষুদ্র ঋণ।

কিন্তু বাংলাদেশে যেখানে মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে অবৈধ লেন-দেন বাড়ছে, সেখানে ভালো জীবনের আশায় মিথ্যে প্রলোভনের ফাঁদে পড়বেন আরো অনেক গরীব মানুষ।

জয়পুরহাটের কালাই গ্রাম থেকে অল্প দূরে আরেকটি গ্রাম মোলামগারি। এই গ্রামের মোহাম্মদ মেহেদি হাসান তার লিভার বিক্রি করতে রাজী হওয়ার আগে পর্যন্ত জানতে না আসলে কিডনি কি?

মেহেদি হাসানকে বলা হয়েছিল লিভার অংশবিশেষ অপসারণের জন্য তাকে সাত লাখ টাকা দেয়া হবে। তার এই মহৎ কাজের কল্যাণে সিঙ্গাপুরের এক মানুষের জীবন বাঁচবে।

ঢাকার এক বেসরকারি হাসপাতালে মেহেদি হাসানের লিভার অংশবিশেষ অপসারণ করা হয়। তিনি জানেন না আসলে ঠিক কতটুকু। সিঙ্গাপুরের যে মানুষের দেহে মেহেদি হাসানের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়, সেই মানুষটি বাঁচে নি। আর ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আসার দুদিন পর এই খবর পান মেহেদি হাসান।

‘আমি ভেবেছিলাম, লিভার কেটে নেয়ার পরও আমার কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু মাঝে মধ্যে আমার বুকে বেদনা হয়। আমাকে দিনে ৫০ থেকে ৬০ বার প্রস্রাব করতে হয়। লিভার দান করে মেহেদি হাসান পেয়েছিলেন দেড় লাথ টাকা। কিন্তু তারপরও ঋণ শোধের জন্য তাকে বিক্রি করতে হয়েছে নিজের পৈতৃক বাড়ি।

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close