অন্য পত্রিকা থেকে

তদন্তের বাইরে এক বিভাগ ও দুই অফিস

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় করা তদন্ত কমিটির তদন্ত কার্যক্রমের আওতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটির কার্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ ও দুটি অফিসের নাম নেই। ব্যাংকের লেনদেন সম্পন্ন করতে হলে দুটি বিভাগ ও তিনটি অফিসের কাজ রয়েছে। ফ্রন্ট ও মিডল অফিস নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (এফআরটিএমডি)।

আর ব্যাক অফিস নিয়ন্ত্রণ করে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্ট। ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির কার্যসূচিতে এফআরটিএমডির নাম নেই। এতে কমিটি কি স্বাধীনভাবে কাজ করছেন নাকি প্রভাবিত হচ্ছেন তা নিয়ে চলছে গুঞ্জন, উঠেছে প্রশ্ন। একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির কার্যতালিকায় এফআরটিএমডির নাম রাখা হয়নি। এখন পর্যন্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্ট, আইটি অপারেশন ও সিস্টেম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির প্রধান কাজ হচ্ছে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছেন কি না তা খতিয়ে দেখা। কিন্তু কর্মতালিকায় এফআরটিএমডির নাম না থাকায় সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এতে অনেক কিছু আড়াল করা হতে পারে। একজন কর্মকর্তা বলেন, এফআরটিএমডির দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক কাজী ছাইদুর রহমানকে এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তার বিভাগকেও কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, পুরো রিজার্ভের দায়িত্বভার ছাইদুর রহমানের। তিনি প্রতিদিন কী পরিমাণ রিজার্ভ আছে তা গভর্নরকে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানাতেন। চুরির ঘটনায় রিজার্ভ ৮০০ কোটি টাকা কমে গেলে তা তিনি সঙ্গে সঙ্গে গভর্নরকে জানিয়েছেন কি না- এসব বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়ার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা।

অপর এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত একপেশে হতে পারে। কিছু দুর্বল প্রকৃতির কর্মকর্তাকে সামনে আনা হতে পারে। এতে বেঁচে যাবে মূল হোতারা। এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হতে পারে। এদিকে গণমাধ্যমকেও এড়িয়ে যাচ্ছেন কমিটি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কয়েকদিন গণমাধ্যম প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যদিও বর্তমানে তা শর্তসাপেক্ষে শিথিল করা হয়েছে।

প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিলিং (যে কক্ষ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করা হয়) রুম থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন করা হয়। আর এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্টের অধীনে পরিচালিত হয়। ডিলিং রুমে এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে তিনটি বিভাগ কাজ করে। এর মধ্যে ফ্রন্ট অফিস বার্তা তৈরি করে, মিডল অফিস বার্তাটি পাঠায় এবং ব্যাক অফিস বার্তার আলোকে লেনদেন ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা তদারকি করে। ফ্রন্ট ও মিডল অফিসের তিন কর্মকর্তা জড়িত থাকেন লেনদেনের বার্তা পাঠাতে।

যে কোনো লেনদেনের আদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায় থেকে অনুমোদিত হলে ডিলিং রুমের একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে একটি বার্তা তৈরি করেন। আরেকজন কর্মকর্তা ওই বার্তাটি ঠিকমতো হয়েছে কি না তা যাচাই করেন। অন্য এক কর্মকর্তা বার্তাটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে পাঠান। এসব লেনদেন ঠিকমতো হচ্ছে কি না এবং লেনদেনের পর অ্যাকাউন্টে কী পরিমাণ অর্থ থাকলো সেগুলো তদারকি করে ব্যাক অফিস। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের অধীনে।

সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুমে সুইফটের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালন ব্যবস্থায় কাজ করেন কয়েকজন কর্মকর্তা। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে সিস্টেমে ঢুকতে আলাদা ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব বার্তা পাঠায় সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন বা সুইফটের মাধ্যমে। এ পদ্ধতিতে ঢুকতেও রয়েছে আলাদা পাসওয়ার্ড ও ইউজার নেম।

এছাড়া এটিএম কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের মতো এখানেও একটি কার্ড রয়েছে। নিয়মানুযায়ী এ সিস্টেমে ঢুকে লেনদেন করেই বের হতে হবে। এখানে যে বার্তাগুলো পাঠানো হয় সেগুলো অতিগোপনে স্থানান্তরিত হয়। প্রতিটি বার্তা সুইফটের মাধ্যমে যাওয়ার সময় এগুলো এনক্রিপ্ট বা সাংকেতিক আকারে যায়। মাঝপথে এগুলো হ্যাক করে ওই ভাষা উদ্ধার করা অসম্ভব।

ফলে লেনদেনও সম্ভব নয়। এ ছাড়া বার্তাগুলো যাওয়ার সময় পরিবর্তন হতে থাকে। মাঝপথে কেউ হ্যাক করলেও যেখানে পাঠানো হচ্ছে সেখানে ইউজার নেম পরিবর্তন হয়ে যাবে। ফলে সিস্টেম কাজ করবে না, কিন্তু এ ক্ষেত্রে এসব কিছুই হয়নি। যথানিয়মে বার্তা গেছে এবং লেনদেন হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় এত নিরাপত্তা ভেদ করে কেউ সিস্টেমে ঢুকলেও নিয়মানুযায়ী বার্তা পাঠানো হয়। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে বার্তাটি গেছে তাতে একজন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।

সাধারণত কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠায় না। তারা সব সময় প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের বার্তা পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিলিং রুমে ওই সময় কেউ না থাকায় ওই বার্তা চেক করে লেনদেন আটকানো যায়নি। ৭ই ফেব্রুয়ারি তারা ঘটনাটি জেনে পরবর্তী লেনদেনগুলো আটকে দেয়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close