স্বদেশ জুড়ে

ইউপি নির্বাচনে সারাদেশে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, গোলাগুলিতে শিশুসহ নিহত ৪, কেন্দ্রে ভোট বর্জন

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: সারাদেশে দ্বিতীয় দফায় ৬৩৯ ভোটগ্রহণ চলছে। এবারই প্রথম প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যালট ছিনতাই, জোট করে কেন্দ্র দখল ও কারচুপির অভিযোগে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা ভোট বর্জন করছেন।

নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে চট্টগ্রামের তিন উপজেলার ৩০ ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ চলছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় ভোট শুরু হয়েছে। বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। ভোটের আগে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোটারদের মধ্যেও রয়েছে নানা শঙ্কা।

শোর, জামালপুর এবং কেরানীগঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালে সংঘর্ষ ও গুলিতে শিশুসহ চার জন নিহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যশোর সদরের চাঁচড়া ইউনিয়নের চাঁচড়া বাজার এলাকার দারোগার মোড় ভাতুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে গোলাপ হোসেন (৭০) নামে এক বৃদ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।

নিহত গোলাপ ভোটকেন্দ্রের বাইরে মুড়ি বিক্রি করছিলেন। তার বিস্তারিত পরিচয় জানাতে পারেনি পুলিশ। তবে তিনি শহরতলীর খোলাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা বলে অনেকে দাবি করেছেন।

কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার বারাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেন্দ্র দখল ও এজেন্টদের মারধরের অভিযোগে বিএনপির প্রার্থী মো. মোস্তফা কামাল ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় ভোট শুরুর কিছুক্ষণ পর ৯টা ৪০ মিনিটে নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে এ ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন মোস্তফা কামাল।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সকাল থেকে সরকার দলীয় প্রার্থী সেলিম আহাম্মদের নেতাকর্মীরা সকল কেন্দ্র থেকে আমার এজেন্টদের মারপিট করে কেন্দ্র দখলে নিয়েছে। ফলে আমার নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে নির্বাচন ভয়কটের ঘোষণা দিচ্ছি।

এদিকে সকাল ৯টার দিকে একই ইউনিয়নের চনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রতনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সরকার দলীয় প্রার্থী সেলিম আহাম্মদ ও বিএনপি প্রার্থী মো. মোস্তফা কামালের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া কটটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কর্মী বাবুল মিয়া ও আনোয়ার হোসেন আহত হন। তাদের স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

নোয়াখালী: জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী ইউনিয়নের বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল মতিন তোতা ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার পৌনে ৯টার দিকে ৪নং চরলেংতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ওই প্রার্থীর স্ত্রীর ব্যালট ছিনতাই করা নৌকায় সিল দেয়ার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করে এ ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

ঝিনাইদহ: জেলার মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ভোট কারচুপির অভিযোগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। সকাল সোয়া ১০টা দিকে তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে এ ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

জামালপুর : জেলার কুলকুচা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করেছেন।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চাঁদপুরের তরপুরচণ্ডী ইউনিয়নের দুপ্রার্থী নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। এরা হচ্ছেন স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মুজিব কাজী ও ইসলামী আন্দোলনের চেয়ারম্যান প্রার্থী মারূফ। এছাড়াও চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর ইউনিয়নের ইসলামী আন্দোলনের জামিল আহমেদ।

সীতাকুণ্ড উপজেলার তিন ইউনিয়নে কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ এনে বিএনপির প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেছেন। তারা হলেন- কুমিরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. হেলাল উদ্দিন, বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের আবুল কালাম আজাদ ও সোনাইছড়ি ইউনিয়নের নুরুদ্দিন মো.জাহাঙ্গীর চৌধুরী।

এছাড়া সন্দ্বীপ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাউরিয়া ইউনিয়ন, রহমতপুর ইউনিয়ন, মুছাপুর ও মগধারা ইউনিয়নে সরকার দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একাধিক কেন্দ্র দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, জেলার মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ উপজেলার ৩০ ইউনিয়নে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৮৭ জন ভোটারাধিকার প্রয়োগ করবেন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭৯ হাজার ৭৩৯ ও মহিলা ভোটার ২ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৮ জন।

মিরসরাই উপজেলায় ৯ ইউনিয়নে ভোটার রয়েছেন এক লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৭৬ হাজার ৪৭৪ ও মহিলা ভোটার ৭৫ হাজার ২৬৪ জন। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৮১টি ভোটকেন্দ্র। ভোটকক্ষ রয়েছে ৩৭১টি। অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র ৪ ও অস্থায়ী ভোটকক্ষ ৮৯টি। সীতাকুণ্ড- উপজেলার ৯ ইউনিয়নে ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৬ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩১ হাজার ৯২৩ ও মহিলা ভোটার এক লাখ ১৫ হাজার ৬৬৩ জন।

ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৮৮টি। ভোটকক্ষ রয়েছে ৫০৭টি। অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র ২০টি ও অস্থায়ী ভোটকক্ষ ৮৪টি। সন্দ্বীপ উপজেলায় ১২ ইউনিয়নে ভোটার রয়েছেন সন্দ্বীপের মোট ভোটার ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯০৬ জন। পুরুষ ভোটার ৭০ হাজার ৯৮২ ও মহিলার ভোটার ৭৩ হাজার ৯২৪ জন। ভোটকেন্দ্র ১২২টি ও ভোটকক্ষ ৬১২টি। অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র ৪ ও অস্থায়ী ভোটকক্ষ ২৪টি। মোট ভোটকেন্দ্র ১৪৯০টি। অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র ২৮টি ও অস্থায়ী ভোটকক্ষ ১৯৭টি।

আওয়ামীলীগ বিএনপির বাইরে জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট এবং ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোট ৫জন প্রার্থী ৩টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতায় আছেন।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসার খোরশেদ আলম জানান, চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় মোট ৫১ জন সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ৩০টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৮৩ জন, সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য (মহিলা) পদে ২০৮ জন ও সাধারণ সদস্য পদে ৭৯৪ জনসহ সর্বমোট ১০৩৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আজ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও সন্দ্বীপ উপজেলায় ৩০টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গতকাল থেকেই পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও র্যাবের সমন্বয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। প্রতি উপজেলায় ৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট কাজ করছে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) কাজী আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘ঝুঁকি বিবেচনায় স্বাভাবিকের চাইতে বেশি আইশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ভোট গ্রহণে নিরাপত্তা বিধানের জন্য প্রতি ভোটকেন্দ্র পুলিশ ও আনসার বাহিনীর ১৫-১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন আছে। এছাড়াও বিজিবি, র্যাব ও মোবাইল টিম স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে আছে।

যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইলিয়াস আলী জানান, চাঁচড়ার ভোটকেন্দ্রের বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে বোমাবাজি ও গোলাগুলি হয়। এসময় ভোটকেন্দ্রের বাইরে মুড়ি বিক্রি করা গোলাপের কপালে একটি গুলি লাগলে তিনি মারা যান। তাকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জ জেলার হযরতপুর ইউনিয়নের দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে মহিদুল ইসলাম সুমন (১০) নামে এক শিশু এবং রনি (২০) নামে এক তরুণ নিহত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকালে ওই কেন্দ্রে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। শিশু সুমন ওই গোলাগুলির মাঝখানে পড়ে গেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এসময় সুমনের বাবা ও মা তাদের স্ব স্ব বুথে ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রনিকে গুরুতর অবস্থায় দুপুরে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করালে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া আজ সকালে জামালপুর জেলার শ্যামপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয় জানা যায়নি।

সারাদেশে মোট ৪৭টি উপজেলায় দ্বিতীয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এ নির্বাচন উপলক্ষে বেশ কয়েকটি এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল, ভোট বর্জনসহ নানা সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close