অন্য পত্রিকা থেকে

ইস্যু মাটিচাপা দিতে নতুন ইস্যু

আবদুর রশিদ: সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তারের পর থেকে অনেকটাই মাটিচাপা পড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড, বাঁশখালীর হতাহতের ঘটনাসহ বিভিন্ন ইস্যু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক আর টেলিভিশনের টক শো এখন শফিক রেহমান ইস্যুতে সরগরম। বিশ্লেষকেরা বলছেন, একটি ইস্যু মাটিচাপা দিতে অনেক সময়ই আরেকটি ইস্যু সামনে নিয়ে আসা হয়।

জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মিজানুর রহমান শেলি প্রথম আলোকে বলেন, দুইভাবে ইস্যু চাপা পড়ে। এক, কাকতালীয়ভাবে, অন্যটি রাজনৈতিক। অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলগুলো তাদের বুদ্ধি এবং চতুরতা দিয়ে ইস্যু সৃষ্টি করে। এতে অন্য ইস্যুগুলো চাপা পড়ে যায়। এটা কখনো সরকারি দলও করতে পারে, আবার বিরোধী দলও করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে একটি ইস্যু মাটিচাপা দিতে আরেকটি ইস্যু তৈরি করা হয়। আর বাংলাদেশে এটা হয় সবচেয়ে বেশি।

বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার যখনই কোনো ঘটনা ঘটিয়ে বিপদে পড়ে, তখনই আরেকটি বিষয় তারা জনগণের সামনে আনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ডাকাতি ও তনু হত্যা নিয়ে সারা দেশের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যখন সোচ্চার, তখন দৃষ্টি ভিন্ন খাতে ফেরাতে শফিক রেহমানের ঘটনা সরকার সামনে এনেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন শফিক রেহমানের গ্রেপ্তারের বিষয়টিকে কোনো ইস্যু মানতে রাজি নন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শফিক রেহমানের মতো একজন ষড়যন্ত্রকারীর পক্ষ নিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক কূটচাল করছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যাচেষ্টা ষড়যন্ত্র মামলায় ১৬ এপ্রিল শনিবার সকালে শফিক রেহমানকে তাঁর ইস্কাটনের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপরই ফেসবুকে বিএনপি ও তাদের সমর্থকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এ ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, সাংবাদিক শফিক রেহমানের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শফিক রেহমানের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আমি একমত নই। ভিন্নমতের হলেই তাকে দমন করার যে নোংরা রাজনৈতিক অপকৌশল, এর একটা অবসান চাই। ইমরানের এমন স্ট্যাটাসের পর ইমরানকে ‘সুবিধাবাদী ও মিথ্যাবাদী’ বলে মন্তব্য করে তাঁকে সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন সজীব ওয়াজেদ জয়। এরপরই ফেসবুকে শফিক রেহমান ইস্যুতে জয়-ইমরানের বাদানুবাদ নিয়ে শুরু ‘স্ট্যাটাস’-যুদ্ধ।

গত চার দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ফেসবুকে এই ‘স্ট্যাটাস-যুদ্ধ’ ছড়িয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতা বনাম ইমরান অনুসারীদের মধ্যে।

কৃষিবিদ দেবু ভট্টাচার্য তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘…সজীব ওয়াজেদ জয় স্ট্যাটাস দেওয়ার পরেও যখন আপনার নাম ইমরানের বন্ধু তালিকায় পাওয়া যায়, তখন আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি—আপনি কোনো দিন আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন না, বর্তমানেও না। আপনি একজন দুধের মাছি, সুবিধাবাদী।’ মো. শাহেদ আলী নামে একজন তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সত্য বলা পাপ এই দেশে। আর বিচার চাওয়া মানে নিজেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া। উদাহরণ ইমরান এইচ সরকার।’

শুধু ফেসবুক নয়, শফিক রেহমানের গ্রেপ্তার নিয়ে কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। কয়েক দিন আগেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো কর্মসূচিতে গেলে তাঁকে তনু হত্যা, রিজার্ভ চুরির বিষয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দিতে হতো। কিন্তু এখন তিনি শফিক রেহমান গ্রেপ্তারের ইস্যুতে সরব। শুধু তিনি নন, শফিক রেহমান ইস্যুতে কথা বলেছেন সরকারের অন্য মন্ত্রীরাও।

আজ বুধবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সাংবাদিক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে সাংবাদিক হিসেবে অভিযোগ আনা হয়নি, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া গেছে এবং গতকাল তাঁর বাসায় তিনি নিজেই যেসব প্রমাণ তুলে দিয়েছেন, তাতে এ নিয়ে কারও সন্দেহের অবকাশ থাকার কথা নয়। আমার মনে হয়, এখন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বুঝতে পারবে, তার যে অভিযোগ ছিল, তা তথ্যভিত্তিক ছিল না।’

দু-এক দিন আগেও তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশের কোথাও না কোথাও বিক্ষোভ-মিছিল, সমাবেশ কিংবা মানববন্ধনের খবর আসত। কিন্তু তনু হত্যার এক মাস পার হতে না হতেই এ আন্দোলন যেন কিছুটা ফিকে হতে বসেছে। তবে তনু হত্যার বিচারের দাবিতে ২৫ এপ্রিল সোমবার সারা দেশে আধা বেলা হরতাল পালন করবে প্রগতিশীল ছাত্র জোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্রঐক্য। এই জোট দুটির সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনমনে এখন নানা সংকট। মানুষ এখন নানা সামাজিক অনিরাপত্তার মুখোমুখি। সরকার এসব ইস্যুতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে না। তবে আমরা জনগণের ইস্যুগুলো সামনে নিয়ে আসব, হারিয়ে যেতে দেব না।’

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close