ইউরোপ জুড়ে

বাংলাদেশে ডাচ সহায়তা বৃদ্ধিতে প্রয়োজন ঢাকার সক্রিয়তা

মাঈনুল ইসলাম নাসিম: গত নভেম্বরে নেদারল্যান্ডসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারী সফরের সরাসরি সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। কৃষি ও স্বাস্থ্যখাত সহ চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা উন্নয়নে কয়েক মিলিয়ন ইউরো ডাচ তহবিল নিশ্চিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সফরের ‘ডিরেক্ট আউটকাম’ হিসেবে।

তবে ‘ল্যান্ড রেকলামেশন’ সহ উপকূলীয় অঞ্চল ও নদী মোহনা ব্যবস্থাপনায় ডাচ প্রযুক্তিগত সহায়তা কাজে লাগাবার পাশাপাশি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০) বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হতে ঢাকার আরো সক্রিয়তার ওপর জোর দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ সিটিতে দায়িত্বরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল।

নেদারল্যান্ডস-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সর্বশেষ আপডেট নিয়ে ২ মে সোমবার এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলছিলেন রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল। তিনি জানান, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলোআপ হিসেবে চলতি মাসেই ঢাকায় প্রথম বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বিপাক্ষিক ‘ফরেইন অফিস কনসালটেশন’ এফওসি বৈঠক। ডাচ পররাষ্ট্র সচিব যাচ্ছেন ঢাকায়। ছয় মাস আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেদারল্যান্ডস সফরের সময় দুই দেশ যেসব সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিল, তার অগ্রগতির বিষয়টি ফোকাস হবে ৩১ মে অনুষ্ঠিতব্য এফওসি-তে”।

রাষ্ট্রদূত বলেন, “পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা প্রতিরোধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গৃহীত ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০) বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে নেদারল্যান্ডস সরকার গত ডিসেম্বরে ২ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সেক্টরে ৫ বছর মেয়াদী প্রজেক্টে উক্ত অর্থ ব্যয় করা হবে ভোকেশনাল শিক্ষা ও প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ খাতে এবং এই প্রজেক্টের কাজকর্ম শুরু হবে চলতি বছরই আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ”।

পৃথিবী জুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলে ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে এমন দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ফোরাম ‘ডেল্টা কোয়ালিশন’-এ বাংলাদেশ যোগ দিচ্ছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল। জোটের শরীক অন্য দেশগুলো হচ্ছে কলম্বিয়া, মিশর, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, মোজাম্বিক, মিয়ানমার, নেদারল্যান্ডস, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেদারল্যান্ডস সফরের সময় বাংলাদেশকে ডেল্টা কোয়ালিশনে যোগ দেয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। আসছে সপ্তাহে ৯-১০ মে রটারডামে ‘সাসটেইনেবল আর্বান ডেল্টাজ’ শীর্ষক মন্ত্রী পর্যায়ের কনফারেন্সে যোগ দিচ্ছেন বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

প্রসঙ্গত, ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’-এর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো হচ্ছে বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পানি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা ও পানির পর্যাপ্ততা বৃদ্ধি করা, সমন্বিত ও টেকসই নদী ও নদী মোহনা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং তাদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা, অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় পানিসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও ন্যায়সঙ্গত সুশাসন গড়ে তোলা এবং ভূমি ও পানিসম্পদের সর্বোত্তম সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।

প্রাসঙ্গিক ইস্যুতে রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল জানান, “সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পানি সারিয়ে কিভাবে জায়গা উদ্ধার করা যায় এবং এই ল্যান্ড রেকলামেশনের মাধ্যমে যেভাবে রটারডামে পোর্ট বানিয়েছে ডাচরা, তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে দেখে গিয়েছেন এখানে এসে”।

রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, “ল্যান্ড রেকলামেশন তথা পানি থেকে জমি উদ্ধারের ডাচ প্রযুক্তিকে বিশেষ প্রায়োরিটি দিয়েছিলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এখন আমাদের যেটা করতে হবে তা হচ্ছে ঢাকা থেকে এখানকার সরকারকে জানানো কী ধরণের সহযোগিতা এদের কাছ থেকে আমরা চাই। এরা দিতে প্রস্তুত, চাইতে তো হবে আমাদেরকেই।

বিষয়টির সাথে যেহেতু আমাদের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার রয়েছে তাই আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব উদ্যোগী হতে হবে বাংলাদেশের স্বার্থেই। ১২ টি প্রভিন্স নিয়ে ছোট দেশ নেদারল্যান্ডস। প্রভিন্স ছিল ১১টি, সর্বশেষ প্রভিন্সটি ল্যান্ড রেকলামেশনের মাধ্যমে পানি থেকে গড়ে তুলেছে ডাচরা”।

শুধু ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের নিমিত্তেই নয়, বাংলাদেশের কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতেও ডাচ সহায়তা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল। নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক ‘ইপি নুফিক’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে দেড় মিলিয়ন ইউরো দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের পর। চট্টগ্রাম বন্দরের ‘ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট’ অর্থাৎ সক্ষমতা বৃদ্ধিকল্পেও আরো ১ মিলিয়ন ইউরো দিচ্ছে ‘ইপি নুফিক’।

অন্যদিকে ডাচ এনজিও ‘মেরি স্টোপস বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন প্রজেক্টে যাচ্ছে আরো ১ মিলিয়ন ইউরো। ডাচ ‘গ্রীন হাউজ’ প্রযুক্তি বাংলাদেশে নিয়ে যেতেও জোরেশোরে কাজ করছে দ্য হেগ সিটিতে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানো বাংলাদেশ দূতাবাস।

বাংলাদেশের তৈরী পোষাকশিল্পের উন্নয়নেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে নেদারল্যান্ডস সরকার। রাষ্ট্রদূত জানান, ডাচ সরকারের উদ্যোগে এবং আমাদের বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আসছে সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ কনফারেন্স, যাতে যোগ দেবেন নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বানিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা বিষয়ক মন্ত্রী। বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি, হিমায়িত মাছ, আইসিটি এবং হোম ডেকোরেশন সামগ্রী আমদানীর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে এ বছরই মার্চে একটি ডাচ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে।

অন্যদিকে আগামী সেপ্টেম্বরে আমস্টার্ডামে ‘সিঙ্গেল কান্ট্রি ট্রেড ফেয়ার’ করতে যাচ্ছে ডাচ-বাংলা চেম্বার। চলতি মাসেই ‘নেদারল্যান্ডস এন্টারপ্রাইজ এজেন্সি’-কে সাথে নিয়ে দ্য হেগে বিজনেস সেমিনার আয়োজন করছে বাংলাদেশ দূতাবাস, জানালেন রাষ্ট্রদূত।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close