অন্য পত্রিকা থেকে

বড় বাজেট বড় ঘাটতি, বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় বিশেষজ্ঞদের

নিউজ ডেস্ক: টানা অষ্টমবারের মতো এবারো জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করলেন সিলেটের কৃতী সন্তান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকাল তিনি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের প্রস্তাব পেশ করেছেন। দশম জাতীয় সংসদের একাদশ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারের বাজেট এ যাবতকালের সর্ববৃহত বাজেট।

এদিকে এবারের বাজেটের আকার বড় হওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে বাস্তবতার সঙ্গে মিল না থাকায় এ বাজেট বাস্তবায়নে চাপের মুখে পড়বে সরকার। এছাড়া অর্থনীতি গবেষক বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও এ বাজেটকে বাস্তবতা বর্জিত বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) জাতীয় বাজেটে উপস্থাপিত বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। গত বারের চেয়ে এবার বাজেটের আকার বাড়ছে ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ বা ৪৫ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর আগে জাতীয় সংসদের মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাজেট প্রস্তাব পাস করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। ঘাটতি ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে দুই লাখ ১৫ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা।

বাজেট প্রস্তাবনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, গত জানুয়ারি মাসে আমি ৮৩ বছরে পদার্পণ করেছি। আজকের প্রস্তাবিত বাজেটটিসহ আমি এ দেশের মোট ১০টি বাজেট উপস্থাপন করছি। এর মধ্যে আটটিই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারের সময়ে। এ ছাড়া ৩৪ বছর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আমাকে দুটি বাজেট উপস্থাপনের সুযোগ দিয়েছিলেন।

এটি ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য অত্যন্ত খুশি ও গৌরবের বিষয়। বাজেট বক্তব্যের শেষে অর্থমন্ত্রী একে জনকল্যান এবং উন্নয়নমূখী আখ্যা দিয়ে আগামী ২০২১ সাল নাগাদ সরকারের যে উন্নয়ন এজেন্ডা রয়েছে তার সঙ্গে এ বাজেটের যোগসূত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

এ দিকে বাজেট নিয়ে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদরা একে বিশাল ঘাটতি বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. মির্জা এবি আজিজুল ইসলাম বলেন, অতীতের মতোই এ বাজেট অনেকটা কল্পনাপ্রসূত। তাই এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।

আর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডিও তাৎক্ষনিকভাবে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় এ বাজেটের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।

গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীতে সিপিডির পক্ষে সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেট প্রসঙ্গে বলেন, বাজেটের দুই শতাংশ বাড়তি আয় ও বাড়তি ব্যয় কোথায় হবে তা স্পষ্ট নয়।

তিনি আরো বলেনর, যে কৌশলে এটি বাস্তবায়িত হবে এবং সেই কৌশলকে কার্যকর করার জন্য, দক্ষতার সাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দরকার পড়ে, সেগুলির ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর চিন্তাভাবনার যেটুকু দরকার সেখানে আমরা সংশয় প্রকাশ করছি। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে যে দুরাবস্থা চলছে, যারা টাকা নিয়ে আমাদের টাকা শোধ দিল না তাদের সেই লাভের টাকা পূরণ করার জন্য এখন ট্যাক্সের টাকা লোকসানে যেতে হবে।

এবং তারপর আমাকে বলা হচ্ছে আরো ট্যা দেওয়ার জন্য। আমরা কেন সেই ট্যাক্স দেব? যারা টাকা দেওয়া হয়েছে এবং টাকা ফেরত দিল না ব্যাংকের। তার টাকা পূরণ করার জন্য কেন আমরা বাড়তি ট্যাক্স দেব? এটাতেই কিন্তু সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টার ন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবিও এ বাজেটকে দুর্নীতি প্রশ্রয়দানকারী বাজেট হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

নতুন বাজেটে দাম বাড়ছে, কমছে যে সব পণ্যের

২০১৬-১৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিযন্ত্রণমূলক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাড়ানোর প্রস্তাবে মোবাইল ব্যবহারে, হাতে তৈরি বিড়ি, সিগারেট, তামাকজাত পণ্য, ওয়াশিং মেশিন, এসি, মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকের আমদানি করা বই, হোটেল নির্মাণ যন্ত্রাংশ, আমদানি করা চাল, মশা মারার ব্যাটসহ কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে।

আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও মূসক কমানোর প্রস্তাবে দেশি মোটরসাইকেল তৈরির যন্ত্রাংশ, এলপিজি সিলিন্ডার, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল, ভিডিও কনফারেন্স ডিভাইস, সাইবার সিকিউরিটির যন্ত্রাংশ, কফি মেট, পেট্রোলিয়াম জেলি, এলইডি ল্যাম্পের যন্ত্রাংশসহ কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে।

দাম বাড়তে পারে: রুটি ও বিস্কুট: ১০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের পাউরুটি, বানরুটি, হাতে তৈরি কেক, বিস্কুটের ওপর মূসক অব্যাহতি সুবিধা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে এসব কেনার খরচ বাড়বে।

পাদুকা: ১২০ টাকা মূল্য পর্যন্ত প্লাস্টিক ও রাবারের তৈরি হাওয়াই চপ্পল এবং প¬াস্টিকের পাদুকার ওপর থেকে মূসক অব্যাহতি সুবিধা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাই বাড়ছে এসবের দাম থাকছে বাড়তির তালিকায়।

বিদেশি বই: শিশুদের ছবির বই, ড্রয়িং বই আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক আমদানিতে অর্থমন্ত্রী শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন। এতে বিদেশি বই আমদানির খরচ বেড়ে বাজারে দাম বাড়বে।

সিগারেট ও বিড়ি: বাজেটে সিগারেট ও বিড়ির ওপর আরোপিত কর হারে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে সিগারেট ও বিড়ির দাম বাড়বে। যদিও ইতিমধ্যেই বাজারে পণ্য দুটির দাম বেড়েছে।

রড: রড তৈরির কাঁচামাল বিলেট আমদানিতে কর ভার বাড়ানো হয়েছে। তবে বিলেট তৈরির কাঁচামাল ফেরো অ্যালয় আমদানিতে কিছুটা কমানো হয়েছে। তৈরি রড ও ইস্পাতপণ্য আমদানিতেও কর ভার বাড়ানো হয়েছে। এতে সার্বিকভাবে রডের দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

জর্দা ও গুল: জর্দা ও গুলের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করা হয়েছে।

ওয়াশিং মেশিন: গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য ১২ কেজির কম ক্ষমতার ওয়াশিং মেশিন আমদানিতে শুল্কহার ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এটির দাম বাড়তে পারে।

অন্যান্য পণ্য: বাজেটে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাড়ানোর প্রস্তাবে আরও কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এগুলো হলো ইউপিএস ও আইপিএস, ট্রাভেল এজেন্সি ও মেডিটেশন সেবা, বায়োমেট্রিক স্ক্যানার, মোটরগাড়ি মেরামত, স্থান ও স্থাপনা ভাড়া, বিদেশি চাল, কর্নফ্লাওয়ার, দেশি মোটরসাইকেল, বিদেশি ট্যালকম পাউডার, সাগু, সয়্যা কেক ও সরিষার খৈল, ল্যাম্পহোল্ডার ও কানেকটর, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম রেকর্ডিং পেপার, টিউব ও পাইপ, পরিশোধিত কপারওয়্যার ও কপার কয়েল, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, বিদেশি অপটিক্যাল ফাইবার কেবল, হাসপাতালে ব্যবহৃত কয়েকটি যন্ত্র ইত্যাদি।

দাম কমতে পারেঃ বিদেশি মোটরসাইকেল: দেশে সংযোজনের জন্য আমদানি করা সিকেডি মোটরসাইকেলের সম্পূরক শুল্ক ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে আমদানি করা মোটরসাইকেলের দাম কমতে পারে।

এলপি গ্যাস সিলিন্ডার: ৫ হাজার লিটারের কম ধারণক্ষমতার এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে দাম কমতে পারে পণ্যটির।

এলইডি বাতি: মূসক নিবন্ধিত কোম্পানির ক্ষেত্রে এলইডি বাতির যন্ত্রাংশ আমদানিতে আরোপিত ২৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক তুলে নেওয়ার ফলে পণ্যটির উৎপাদন খরচ কমবে। এতে বাজারে দাম কমতে পারে।

পোল্ট্রিও গবাদিপশুর খাবার: পোল্ট্রি ও গবাদিপশুর খাবার তৈরির কয়েকটি কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৫-১০ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে। এতে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খাবার তৈরির খরচ কমে দামও কমতে পারে।

নতুন হাইব্রিড গাড়ি: হাইব্রিড গাড়ি আমদানির সম্পূরক শুল্ক হার ৪৫ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এ ধরনের গাড়ির দাম কমতে পারে।

শিল্পের অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র: অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি ও প্রি- ফেব্রিকেটেড ভবন নির্মাণের উপকরণ আমদানিতে পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানি খাতকেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে এ ধরনের পণ্যের দাম কমবে।

রাবার: রাবারের উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ও রাবারের তৈরি রিবড স্মোকড শিটের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ মূসক তুলে নেওয়ায় দেশি রাবার কিনতেও খরচ কমবে।

অন্যান্য পণ্য: আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কমানোর ফলে আরও কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে। এগুলো হলো হিউম্যান হলার, এলপিজি রোড ট্যাংকার, গ্রিজ, মূসক নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের কফি মেট, পেট্রোলিয়াম জেলি, বৈদ্যুতিক শিল্পের কাঁচামাল ফাইবার গ্লাস, টেপ ও ইউরিয় কেরসিন, স্টোভ, প্লাাস্টিক ও গ্লাস ফাইবারের এলপিজি সিলিন্ডার, কয়লা, গাম, দেশি পাথর, কৃষি যন্ত্রাংশ, সিমেন্টের কাঁচামাল ফ্লাই অ্যাশ, বায়োগ্যাস ডাইজেস্টার, বাতাস প্রতিরোধী স্টোরেজ ব্যাগ, সৌরবিদ্যুতের অ্যালুমিনিয়ামের কাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন উপকরণ, মূসক নিবন্ধিত এলপিজি প্ল্যান্টের উপকরণ, পোশাক শিল্পের কাটিং টেবিল ইত্যাদি।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close