দুনিয়া জুড়ে

বাংলাদেশ বিষয়ক শুনানি: গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ইইউ পার্লামেন্টে

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানবাধিকার পরিস্থিতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যম স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে। কট্টরপন্থীদের দাবি করা সাম্প্রতিক হামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচারের আওতায় আনার কথাও বলেন তারা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নয়নের তাগিদ দেন। ইইউ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ বিষয়ক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গতকাল রাতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি শীর্ষক এক অধিবেশনে বক্তারা বলেন, এসব ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেয়ার আহ্বান জানান পার্লামেন্টের প্রতি। এছাড়া, শুনানিতে উঠে আসে রানা প্লাজা ট্রাজেডি এবং তৈরি পোশাক খাতে প্রয়োজনীয় উন্নয়নের বিষয়গুলো।

বাংলাদেশ সময় গত রাত ১২টা ৩ মিনিটে শুরু হয় শুনানি। প্রথমে বক্তব্য রাখেন নেদারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সাব কমিটির ভাইস চেয়ারমেন বার্ট কোয়েন্ডার্স। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভালো সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন নিয়ে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ইইউ সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। এ সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে।

তবে দেশটির উদ্বেগজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নের অন্তরায়। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া ও দারিদ্র্য দূরীকরণের উচ্চাবিলাশী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐক্যমত্য দরকার। সময় এসেছে বাছবিচারহীনভাবে গ্রেপ্তার বন্ধ, বাকস্বাধীনতা ও সব নাগরিকের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার।

দেশটিতে চলতে থাকা নৃশংস হত্যাকান্ডের তদন্ত হতে হবে। দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরায় সংলাপে বসার। আমরা দেশটির পরিস্থিতি অব্যাহতভাবে নিবিড় পর্যবেক্ষন করে যাবো।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন এতে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য হিল্ডে ভটম্যানস, পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য মার্ক দেমেসমেকার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক কমিটির সদস্য মারিয়া অ্যারেনা, পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য বাস বেল্ডার, পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য এদুয়ার্দ কুকান, পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি ও মানবাধিকার বিষয়ক সাবকমিটির সদস্য পিয়ের অ্যান্টোনিও পাঞ্জেরি, এম্প্লয়মেন্ট ও সোশাল অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক কমিটির সদস্য অ্যাগনেস ইয়োঙ্গেরিয়াস।

পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক সাব কমিটির ভাইস চেয়ারমেন ক্রিশ্চিয়ান ড্যান প্রেদা বলেন, আমি গত কয়েক সপ্তাহের সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এসবে আক্রান্ত হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও মত প্রকাশের পক্ষের লোকেরা। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের এসব ঘটনার তদন্ত করার আহ্বান জানাতে তিনি পার্লামেন্টকে বলেন।

তিনি আরও বলেন, বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর, বাংলাদেশের অনেক আর্থসামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। সেখানে আমরা নির্বাচনী প্রতিনিধিদল পাঠাই। নির্বাচন বয়কটের ফলে বড় ধরণের রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, আমরা স্বীকার করি যে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক আংশীদার। এটা আমরা ভুলতে পারি না। আমাদের ঢাকার আংশীদারদের সঙ্গে কথা বলা উচিৎ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে তাদেরকে আহ্বান জানানো উচিৎ।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ক প্রতিনিধিদলের ভাইস চেয়ার নিলা গিল বলেন, অন্তত ১০ জন সেকুলার অ্যাক্টিভিস্টকে হত্যা করা হয়েছে ঠান্ডা মাথায়। এসব হামলার দায় আল কায়দা ও আইসিস স্বীকার করলেও, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এসব গোষ্ঠীর অবস্থান অস্বীকার করে যাচ্ছে। ঝুঁকির মুখে থাকা মানুষদের সুরক্ষা দেয়ার পরিবর্তে, সরকার এসব নৃশংস হত্যাকান্ডকে নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে সহিংসতায় নিমজ্জিত হতে দিতে পারি না। তিনি সুপারিশ করেন, সহিংসতা ও উগ্রপন্থা প্রতিরোধে ভারতকে সেতুবন্ধন হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের প্রকল্প হাতে নেয়া প্রয়োজন। এর ফলে দেশটিকে উগ্রপন্থার আঞ্চলিক শক্তঘাটিতে পরিণত হওয়া ঠেকানো প্রতিহত করা যাবে। দ্বিতীয়ত, চলমান ও একাত্তরের অপরাধের জন্য সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষকে প্রকৃত জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ও বাছবিচারহীন হত্যাকা- বন্ধ করতে হবে।

পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য চার্লস ট্যানক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সরকার নয়, দায়ী কট্টরপন্থীরা। ইউরোপিয়ান ইউনয়নের উচিৎ সমালোচনা কম করে, সহযোগিতা বেশি করা।

ম্যারিয়েট শাকে বলেন, জনগণকে রক্ষার জন্য সরকারের সাধ্যমত সবকিছু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্লামেন্টকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইস্যুতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতৃত্ব যথেষ্ঠ বলিষ্ঠ ছিল না। ইইউ এ নিয়ে যথেষ্ট বক্তব্য রাখেনি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, কেন আমরা বাংলাদেশ ইস্যুতে পর্যাপ্ত বিবৃতি দেখিনি?

কট্টরপন্থীদের হাতে সাম্প্রতিক হত্যাকান্ড ও পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে হত্যার কথা উল্লেখ করে দক্ষিন এশিয়া দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ম বিষয়ক প্রতিনিধিদলের চেয়ার জ্যঁ ল্যাম্বার্ট বলেন শক্তিশালী সুশীল সমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার সুরক্ষাকারী সংগঠনগুলোর ওপর নিপীড়নের কথা বলতে গিয়ে তিনি অধিকার-এর প্রসঙ্গ টানেন। গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, অনেক বেশি সাংবাদিককে কারাগারে যেতে দেখছি আমরা।

বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, আমাদেরকে যেমন বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করে যেতে হবে, তেমনি এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের পদক্ষেপ যেন জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থে নেয়া হয়।

উন্নয়ন বিষয়ক কমিটির সদস্য লোলা সানচেজ ক্যালডেন্টি ও এসিপি ইউ জয়েন্ট পার্লামেন্টারি অ্যাসেমব্লি ডেলিগেশনের ভাইস চেয়ার ফার্নান্দো রুয়াসের বক্তব্যে রানা প্লাজা ট্রাজেডির কথা উঠে আসে। সাস্টেইনবিলিটি ক¤প্যাক্টের অধীনে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু অগ্রগতি করলেও, এখনও অনেক কিছু করা বাকি বলে রুয়াস মন্তব্য করেন। লোলা সানচেজ বলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার উন্নয়নে আমাদের অনেক কিছু করার আছে।

পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সদস্য ফ্যাবিও ম্যাসিমো ক্যাস্টাল্ডো বলেন, আমরা সহিংসতা বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করছি, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানবাধিকার বিষয়ক সাব কমিটির সদস্য জোসেফ ওয়াইডেনহোলজার বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিপজ্জনক গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনাও নাকচ করে দেয়া যায় না। রাজনৈতিক দুই শিবির একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছে।

এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পঙ্গু হয়ে পড়েছে। সহিংসতা বাড়ছে। অন্যরা আছে যারা এ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে সচেষ্ট। মানবাধিকার রক্ষকদের প্রতি আচরণ খারাপ হচ্ছে। তাদেরকে ভয় দেখানো হচ্ছে, হুমকি দেয়া হচ্ছে। এখনও এসব বন্ধ করা সম্ভব। ইউরোপ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখতে পারে।

পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটি ও মানবাধিকার বিষয়ক সাবকমিটির সদস্য আমজাদ বশির বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতা বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা অবশ্যই একটি স্বার্বভৌম দেশের নিজস্ব ব্যাপারে নাক গলাতে পারি না। কিন্তু সহিংসতাকে নিন্দা জানানো ও রাজনৈতিক সংলাপের জন্য উৎসাহিত করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফেরার বাস্তবসম্মত উপায় হলো, দেশটির নেতৃত্বস্থানীয় দলগুলোকে সত্যিকারের নেতৃত্ব দেখাতে হবে যাতে করে দেশটিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা যায়।

তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের উত্তরনের একমাত্র উপায়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close