স্বদেশ জুড়ে

দেশের গ্যাস ফুরিয়ে যাবার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভোলার শাহবাজপুরে, অগভীর সমুদ্রের ১১ নম্বর ব্লকে এবং গভীর সমুদ্রে ১২, ১৬ ও ২১ নম্বর ব্লকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও ২০২১ সালের পর থেকেই গ্যাস ফুরিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করেছেন তারা।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক ২৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করছে পেট্রোবাংলা। এর বীপরীতে চাহিদা রয়েছে দৈনিক ৩২৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক ঘাটতি থাকছে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। শংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই এ পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে চলছে পেট্রোবাংলা। কার্যত কোনো উন্নতি নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের অপচয় রোধ এবং একক নির্ভরতা না কমানোর কারণেই আজকে এ আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। একক নির্ভরতা ও সহজলভ্য ব্যবহারের কারণে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস অপচয় হচ্ছে। গাড়িতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে গ্যাস, বাড়ির গ্যাস লাইনে মিটার নেই, কতটা পুড়ছে তা জানার নয়। বর্ষায় গ্যাস জ্বালিয়ে কাপড় শুকোতে অসুবিধে কোথায়।

পেট্রল, ডিজেলের দরকার কী। গাড়ি চলছে গ্যাসে। ঢাকার সিএনজি অটোরিক্সার ভাড়া অনেক। একবার গাড়ি কিনলে নিশ্চিন্ত। ১০০ টাকার গ্যাসে দিনরাত শহর চক্কর। শিল্পায়নে গ্যাস দরকার সর্বাধিক। সেখানে টান পড়লে তখন কী হবে! যা আছে পনের বছরেই ফুরোতে পারে। গ্যাসের হাহাকার হলে অগ্রগতি থমকাবে, বিনিয়োগ কমবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাই এসব বিবেচনায় এনেই গ্যাসের সদ্যবহার করতে হবে। নতুবা নতুন গ্যাস আসলেও তা খুব একটা স্থায়ী হবে না।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে মোট ২৭.১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট মজুদের মধ্যে একাত্তর থেকে এ পর্যন্ত ২৬টি ক্ষেত্রের ২০টি থেকে গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ ১৩.৪৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে এখনও পাওয়া যেতে পারে ১৩.৬৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বছরে খরচ হচ্ছে ৮০ হাজার কোটি ঘনফুট। এখন শেষ হওয়ার সময় আসন্ন। এখন যে গ্যাস মজুদ আছে তাতে সব মিলিয়ে ১৫ বছরের বেশি যাওয়া সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম বলেন, গ্যাস সংকট সমাধানে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অবশ্যই আমাদের অপচয় রোধ করতে হবে। গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ চলছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে তেল, গ্যাস অনুসন্ধানে কাজে লাগানো হয়েছে।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্লকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে। তাছাড়া কুয়েত থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। আগামী পৌনে দুই বছরের মধ্যে ৫০০ ঘনফুট এলএনজি মহেশখালি থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত পাইপলাইনে যুক্ত হবে। তখন অনেকটায় গ্যাস সংকট কেটে যাবে। পাশাপাশি কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েও জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করা হবে বলে জানান তিনি।

যদিও পেট্রোবাংলার পরিচালক অপারেশন জামিল আহমেদ আলীম এ প্রসঙ্গে বলেন, গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে পেট্রোবাংলা বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়ে কাজ করে আসছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে রীগ বসিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে। গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাপেক্সও যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। এছাড়া এলএনজি আমদানির মাধ্যমে গ্যাস সংকটের সমাধান করা হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে গ্যাস সংযোগের জন্য শিল্প ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে প্রায় ১৫১১টি আবেদন জমা আছে। এরমধ্যে ৩৮৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠান, ১৩৫টি ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ জেনারেটর, ৯৭৩টি বাণিজ্যিক এবং ১৮টি সিএনজি স্টেশনের আবেদন জমা আছে। এছাড়া কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবেদনও জমা আছে। এগুলোতে এখনই সংযোগ দেওয়া হলে তাতে ২০২১ সালের মধ্যেই গ্যাস ফুরিয়ে যাবে।

আশার কথা একটাই, দুটো নতুন ফিল্ডে গ্যাসের সম্ভাবনা মিলেছে। একটি অগভীর সমুদ্রে ১১ নম্বর ব্লকে। অন্যটি ভোলার শাহবাজপুরে। গভীর সমুদ্রে ১২, ১৬, ২১ নম্বর ব্লকেও গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। তবে কোনখানে কতটা পাওয়া যাবে তার ঠিক নেই। উত্তোলন পর্ব শুরু হতেও সময় লাগবে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে বর্তমানকে বাদ দেওয়া যায় না। এখনকার পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়েই গ্যাস সমস্যার সমাধান চাই। দরকার বিকল্প ভাবনার। সেদিকেই চোখ রেখেছে সরকার। ইতোমধ্যেই ঘরে ঘরে আর গ্যাস লাইন দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চালু হবে কলকাতার মতই এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ। সিএনজিতে গাড়ি চালানো বন্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে।

তবে কাজটা সহজ নয়। পেট্রলের তুলনায় গ্যাস অনেক সস্তা। সরকার চাইছে, পেট্রলের দাম কমিয়ে সিএনজির মূল্যবৃদ্ধি। দু’য়ের দরের তফাৎ এতটাই, বাড়িয়ে কমিয়ে সামঞ্জস্য আনা কঠিন। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস নির্ভর। গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বজায় রাখা আর সম্ভব নয়। ভারতের রিলায়েন্স সংস্থা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহী। তারা কয়লা বা জলবিদ্যুতের ওপর জোর দিচ্ছে। তার ওপর ভিত্তি করেই সমীক্ষা শুরু হচ্ছে। তাতে খরচ বাড়লেও গ্যাস বাঁচাতে সেটা দরকার।

বাংলাদেশে সিএনজি চলছে, যাকে বলা হয় কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস। তার পরিবর্তে ভারতের মতো এলপিজি বা লিক্যুফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলা আর যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ খোঁজ চালাচ্ছে নতুন গ্যাস ভা-ারের। নরওয়ের সংস্থার সঙ্গেও পেট্রোবাংলার হাইড্রোকার্বন ইউনিট জরিপে ব্যস্ত। তারা কিছু পকেট গ্যাস পাওয়ার আশা করছে।

সমুদ্রে তেল, গ্যাস সন্ধানে মাঠে নেমেছে বাপেক্স। সেটা পেলে আঞ্চলিক কলকারখানাতে গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বরিশাল আর খুলনার দিকে। গ্যাসের অভাবে সেখানে কারখানাগুলো ধুঁকছে। তাই বিকল্প জ্বালানির খোঁজের সঙ্গে গ্যাসের সঞ্চয় বাড়ানো জরুরি। তাতে আচমকা সংকটে পড়ার শঙ্কা কেটে যাবে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close