অন্য পত্রিকা থেকে

ব্রিটেন কি তারেককে ফেরত পাঠাবে

মিজানুর রহমান খান: বাংলাদেশ হাইকোর্টে প্রথমবারের মতো দণ্ডিত হলেন তারেক রহমান। এখন কি তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা আগের চেয়ে বাড়ল?

মানি লন্ডারিং মামলায় লন্ডনে স্বেচ্ছা-নির্বাসিত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাত বছরের কারাদণ্ডের পরে আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘এত দিন কোনো সাজা না থাকায় তারেক রহমানকে ব্রিটেন থেকে ফিরিয়ে আনতে সেভাবে চেষ্ট করা হয়নি। এখন করা হবে।’ এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ ব্রিটেনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে করা হলে তা তারা কোন আইনে কীভাবে বিবেচনা করতে পারে।

০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি তারেক রহমানের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স একটি নোট প্রকাশ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, এখন পর্যন্ত তাঁকে ফিরিয়ে দিতে কোনো অনুরোধ বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে পাওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টম্বের থেকে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন মামলায় জামিন লাভের পরে তিনি দেশত্যাগ করেন।

এরপর পলাতক থাকা পর্যন্ত তারেক রহমানের কোনো বক্তব্য মিডিয়ায় প্রকাশ না করতে হাইকোর্ট বাধানিষেধ আরোপ করেন। হাউস অব কমন্সের ওই নোটে বলা হয়েছিল, ২০০৩ সালের এক্সট্রাডিশন আইনের অধীনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ভাগের অন্তর্ভুক্ত দেশের তালিকায় রয়েছে। আর সেটা কমনওয়েলথের ভেতরে প্রত্যর্পণের যে লন্ডন স্কিম রয়েছে, তার এখতিয়ারভুক্ত।

নোটে অবশ্য এ কথাও উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশ তারেক রহমানের প্রত্যর্পণ চেয়ে ব্রিটিশ কতৃর্পক্ষের (দ্য সিরিয়াস অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম এজেন্সি, সোকা) কাছে অনুরোধ জানাতে পারবে। কিন্তু এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে ব্রিটেন তাঁকে প্রকৃতপক্ষে প্রত্যর্পণ করবে।’

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১৩০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুটি মামলায়ও তারেক রহমান আসামি। এই দুটি ও রাষ্ট্রদ্রোহের দুটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বর্তমানে জারি রয়েছে। বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে গ্রেনেড হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে।

আর হাউস অব কমন্সের ওই নোটে বলা হয়েছে, ব্রিটেন সেসব ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করে না যাঁরা মৃত্যুদণ্ডের দণ্ড পেতে পারেন, ভবিষ্যতে পাবেন কিংবা ইতিমধ্যে পেয়েছেন। প্রত্যর্পণ শুধু তখনই সম্ভব, যখন এই নিশ্চয়তা দেওয়া হবে যে, এই দণ্ড কার্যকর করা হবে না।

হাউস অব কমন্সের এই অবস্থানের সরল ব্যাখ্যা করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে একটা আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হতে পারে। সেটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তখন সেটা কোনো এক ব্যক্তির বিষয় বলে গণ্য হবে না। সার্বিকভাবে মৃত্যুদণ্ড নিরোধক বড় ধরনের নীতিগত রাজনৈতিক সিদ্বান্তের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এক দশক আগেও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এর পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দেওয়ার প্রবণতা ছিল। অনেক আগেই তা রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ কোনো একটি মরাটরিয়াম বা বিরতিকালে পৌঁছবে কি পৌঁছবে না, সেই প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবশ্য কিছু প্রয়াস চালিয়ে আসছে।

এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল লন্ডনপ্রবাসী চৌধুরী মঈন উদ্দিনকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে ব্রিটেনের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছিল বলে জানা যায় না।

২০১৪ সালের ২ এপ্রিল ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ব্রিটেন থেকে তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যকার প্রত্যর্পণ চুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও তিনি এটা উল্লেখ করেন, ব্রিটিশ সরকারের এটাই দীর্ঘকালীন নীতি যে ব্রিটেনের কোনো বাসিন্দার বর্তমান অবস্থান ও মর্যাদা সম্পর্কে আমরা কোনো মন্তব্য করি না বা করব না।

ওই দিন ঢাকা সফররত ব্রিটেনের তৎকালীন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী এলান ডানকান (বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী) বলেছিলেন, ‘ব্রিটেনে কোনো বন্দী প্রত্যর্পণের বিষয়টি একান্তভাবে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে রাজনীতিবিদদের কিছুই করার নেই। এ বিষয়ে আমার বা কোনো মন্ত্রীর পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।’

বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের রায়ের পরে আইন ও বিচারমন্ত্রী তাঁর দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘(তারেক রহমানকে) যদি চুক্তি করেও আনতে হয়, তাহলে আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি করার চেষ্টাও করব।’

এটা লক্ষণীয়, ব্রিটিশ সংসদের ওই নোটে কেবল আদালতের ভূমিকা যেভাবে এলান ডানকান বলেছেন, তা সেভাবে সমর্থিত হয়নি। তাদের আইন পর্যালোচনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার একেবারে জড়িত নেই, তেমন দাবি যথাযথ নয়। ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যর্পণবিষয়ক ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি হালনাগাদ করা গাইডলাইনই বলেছে, এই প্রক্রিয়ায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা রয়েছে।

২০০৩ সালের এক্সট্রাডিশন অ্যাক্টের আওতায় প্রথম ক্যাটাগরিভুক্ত হলো ইউরোপীয় দেশগুলো। বাংলাদেশ দ্বিতীয় ক্যাটাগরির টাইপ-বি ভুক্ত। এই গাইডলাইনে স্পষ্ট বলা আছে, টাইপ-বি ভুক্ত দেশগুলো থেকে আসা যেকোনো প্রত্যর্পণ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগে আদালতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি অনুরোধকারী দেশের পক্ষে সনদ না দিলে আদালত কাজ শুরু করতে পারবেন না।

প্রথমিকভাবে সাতটি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। প্রত্যর্পণের জন্য পররাষ্টমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি সনদ দেবেন কি দেবেন না। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করবেন কি না। চতুর্থ ধাপে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং তাঁকে আদালতে হাজির করা। পঞ্চম ধাপে রয়েছে প্রাথমিক শুনানি। ষষ্ঠ ধাপে প্রত্যর্পণ শুনানি, সপ্তম ধাপে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করবেন কি করবেন না।

গাইডলাইনে বলা আছে, আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার আগে এই মর্মে সন্তুষ্ট হবেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তি ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ করেছেন কি করেননি’ এবং প্রত্যর্পণ করা হলে অভিযুক্তের মানবাধিকার খর্ব হবে কি হবে না।

বিচারককে আরও সন্তুষ্ট হতে হবে যে প্রত্যর্পণের অনুরোধ-সংবলিত যে আবেদন করা হয়েছে, সেখানে কোনো সংবিধিবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগযোগ্য নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি দেখতে পান যে বন্দী ফেরত দেওয়ার যে অনুরোধ বিবেচনার জন্য তাঁর সামনে পেশ করা হয়েছে, তা ২০০৩ সালের আইনের কোনো বিধান দ্বারা নির্দিষ্টভাবে বারিত, তাহলে তিনি বন্দীকে ফেরত দেবেন না।

আমাদের আইন ও বিচারমন্ত্রী চুক্তি থাকতেও নতুন ‘চুক্তি’ করার যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তার কার্যকারিতা বিদ্যমান নিয়মরীতির আলোকেই যাচাইযোগ্য।

২০০৩ সালের ব্রিটিশ আইন এই বিধান করেছে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড লাভের কোনো ঝুঁকি থাকলে তাকে হস্তান্তর করা যাবে না। তবে যদি এ রকম সম্ভাবনা থাকেও, তাহলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কিছুটা হলেও ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার সুযোগ আইন দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে সে জন্য দুটি শর্ত রয়েছে। প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধকারী দেশকে ‘পর্যাপ্ত লিখিত নিশ্চয়তা’ দিতে হবে যে অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না। দ্বিতীয়ত, যদি আদালত এ রকম ঘোষণা দেন, তাহলে তা বাস্তবায়ন করা হবে না।

‘তারেক রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না’—বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এ রকম লিখিত নিশ্চয়তা দেওয়া কি সম্ভব? এটা কি বাস্তবসম্মত? অবশ্য আইন ও বিচারমন্ত্রী এই শর্ত এড়াতেই নতুন কোনো চুক্তির জটিল প্রস্তাব দেবেন কি না, সেটা দেখার বিষয়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close