ফিচার

বাংলাদেশের গর্ব সিলেটের কীর্তিমান পুরুষ রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান

“এমন জীবন তুমি করিবে গঠন; মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন”…রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান (এম এ খান ) এমনই এক কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব। এম এ খান (নভেম্বর ৩, ১৯৩৪ – আগস্ট ৬, ১৯৮৪) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান যিনি একজন দক্ষ রাজনীতিবিদের ভূমিকাও পালন করেছেন।

তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সততা ও দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন। যোগাযোগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে সিলেট বিভাগে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য মরহুম মাহবুব আলী খানের রয়েছে আলাদা ইমেজ।

দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা, সমুদ্রে জেগে ওঠা দ্বীপের দখল রক্ষা, দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ বাংলাদেশের দখলে রাখা, সমুদ্র এলাকায় জলদস্যু দমন এবং সুন্দরবন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নৌবাহিনীকে সচেষ্ট রাখতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

পারিবারিক পরিচয়:

বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী সাবেক নৌবাহিনী প্রধান, যোগাযোগ উপদেষ্টা ও কৃষিমন্ত্রী সিলেটের কৃতি সন্তান রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান এর আজ ৩২তম শাহাদাতবার্ষিকী। সততা ছিল যার একমাত্র মটো। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘সততা ছাড়া দেশপ্রেম মূল্যহীন। সততা নিয়ে দেশের জন্য সর্বদা কাজ করে যেতে হবে।’ কর্মবীর এ সৎ ও মহান দেশপ্রেমিক ১৯৩৪ সালের ৩ নভেম্বর পূণ্যভূমি সিলেট জেলার বিরাহীমপুরের এক সম্ভ্রান্ত ও বিখ্যাত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতা আহমেদ আলী খান প্রথম মুসলিম হিসেবে তৎকালীন ভারতে ১৯০১ সালে ব্যারিস্টার হন। তিনি নিখিল ভারত আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ও আসাম কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি তিনটি বিষয়ে এমএ ডিগ্রিও নেন। হায়দ্রাবাদ নিজামের প্রধান আইন উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

এম এ খানের মাতা ছিলেন জুবাইদা খাতুন। অবিভক্ত বিহার, আসাম ও উড়িষ্যার জমিদার পরিবার খানবাহাদুর ওয়াসিউদ্দিন আহমেদের কন্যা। মরহুমা জুবাইদা খাতুনের দাদা ছিলেন ব্রিটিশদের থেকে ‘অর্ডার অব এমপায়ার’ (Officer of the Most Excellent Order of the British Empire — OBE) খেতাবপ্রাপ্ত ।

এম এ খানের দাদা ছিলেন তৎকালীন ভারতের বিশিষ্ট চিকিৎসক খানবাহাদুর আজদার আলী খান। তিনি বিহার ও আসামের দারভাঙ্গা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ও পাটনা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপনা করতেন।

তিনি ছিলেন স্যার সৈয়দ আমীর আলীর জামাতা। স্যার সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন ইংল্যান্ডের রয়্যাল প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য এবং ইন্ডিয়ান ভাইসরয়েজ এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য। তিনি ১৯২৪ সালে সিলেটে নাফিজাবানু চ্যারিটেবল হাসপাতাল ও ১৯৩০ সালে ম্যাটারনিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। স্যার সৈয়দ আমীর আলীর বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ হলো ‘হিস্ট্রি অব সারাসেন’ ও ‘স্পিরিট অব ইসলাম’।

এম এ খানের দাদা খানবাহাদুর আজদার আলী খানের অপর ভাই খানবাহাদুর গজনফর আলী খান ১৮৯৭ সালে বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যার প্রথম এবং সর্ব ভারতে চতুর্থ মুসলিম হিসেবে আইসিএস লাভ করেন। গজনফর আলী খান ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ রাণী থেকে অর্ডার অব এমপায়ার খেতাব পান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী ছিলেন এম এ খানের চাচাতো ভাই। শের-এ সিলেট ও অবিভক্ত পাকিস্তানের মন্ত্রী মরহুম আজমল আলী চৌধুরীও তার চাচাতো ভাই।

দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে এম এ খান ছোট। সবার বড় বোন সাজেদা বেগম। মেজভাই বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. সেকেন্দার আলী খান। মরহুম ডা. সেকেন্দার আলী খানের মেয়ে আইরিন খান, যিনি মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল। এম এ খানের ফুফু মিস জিল খান ছিলেন তৎকালীন সময়ের অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েট।

সিলেটের বিরাহীমপুর, কলকাতা ও পুরান ঢাকার ৬৭ পুরানা পল্টন লাইনের বাড়িতে এম এ খানের শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। তিনি কলকাতা ও ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন কৃতী ছাত্র। তার কলেজ জীবনের শিক্ষা ঢাকা কলেজে।

ছোটবেলা থেকেই এম এ খান ছিলেন শান্ত, ধীর ও চিন্তাশীল। সুদর্শন শারীরিক গঠন ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভিব্যক্তির কারণে পরিবারের সবার প্রিয় ছিলেন তিনি। তিনি ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা করতেন। ব্যাডমিন্টন খেলায় ছিলেন পারদর্শী । খেলা নিয়ে ভাইদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদও হতো। পুরানা পল্টন লাইনের বাড়িতে সামনের খালি জায়গায় ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট কেটে ভাই-বোনরা দিন-রাত খেলতেন। শোনা যায়, তিনি বেশ খাদ্যরসিকও ছিলেন। গলদা চিংড়ি, ইলিশ মাছ খুব পছন্দ করতেন। ধর্মের প্রতি ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। প্রতিদিন সকালে নামাজ আদায় করে পবিত্র কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করতেন। যে কোনো কাজে বের হওয়ার আগে তিনি আল্লাহকে স্মরণ করতেন।

১৯৫৫ সালে সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা শাহিনা খান জামান (বিন্দু) এবং ডা. জুবাইদা রহমান (ঝুনু)। শাহিনা খান জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা করেন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর সৈয়দ শফিউজ্জামান এম এ খানের জ্যেষ্ঠ জামাতা। তিনি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন।

ছোটকন্যা ডা. জুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রিলাভ করেন। আর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় পুত্র বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর কনিষ্ঠ জামাতা। তাঁদের কন্যা লন্ডনে বিশ্ববিদ্ধালয়ে অধ্যায়নরত জায়মা রহমান এম এ খানের নাতনি।

এম এ খানের ছোটকন্যা ডা. জুবাইদা রহমান যুক্তরাজ্যেও চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেছেন। লন্ডনের স্বনামধন্য লন্ডন ইমপেরিয়াল কলেজের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিনের চার বছরের মাস্টার্স অব কার্ডিওলজিতে (এমএসসি ইন কার্ডিওলজি) ডিস্টিংশনসহ শতকরা ৮৩ ভাগ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। মোট চার বছরের এই কোর্সে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউই), কমনওয়েলথভুক্ত দেশ, নাইজেরিয়া ও চীনসহ মোট ৫৫টি দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ডা. জুবাইদা রহমান সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছেন। জানা গেছে, এমএসসি কার্ডিওলজিতে ডা. জুবাইদা রহমানই বাংলাদেশি চিকিৎসক হিসেবে প্রথম হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন।

ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারের ওয়াকফ স্টেটের মোতওয়াল্লী হিসেবে বর্তমানে দ্বায়িত্ব পালন করছেন মরহুম এম এ খানের চাচাতো ভাই শের আলী খান।

পাকিস্তানে নৌবাহিনীর জীবন:

মাহবুব আলী খান উচ্চতর শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ডার্টমাউথে রয়্যাল নেভাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন। ১৯৫২ সালে মাহবুব আলী খান ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান নৌবাহিনীর নির্বাহী শাখায় যোগ দেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় সম্মিলিত বাহিনী স্কুল থেকে তিনি সম্মিলিত ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ডার্টমাউথে রয়্যাল নেভাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর রণতরী ট্রায়ামপতে ১৯৫৪ সালে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। গ্র্যাজুয়েশন লাভের পর মাহবুব আলী খান ১৯৫৫ সালে, সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দু’কন্যা হয় – শাহিনা খান (বিন্দু) এবং জুবাইদা খান (বিনু)। ১৯৫৬ সালের ১ মে স্থায়ী কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে কৃতী অফিসার হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক পুরস্কৃত হন। তিনি ১৯৬০ সালে পি. এন. এস (পাকিস্তানী নেভাল শীপ্) তুগ্রিলের গানারি অফিসার ছিলেন এবং ১৯৬৪ সালে পি. এন. এস টিপু সুলতানের টর্পেডো ও এন্টি সাবমেরিন অফিসার ছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে জয়েন্ট চিফস সেক্রেটারিয়েট স্টাফ অফিসার (ট্রেনিং এবং মিলিটারি এসিস্ট্যান্স) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৭০ সালে পি. এন. এস হিমালয়ে টর্পেডো ও এন্টি সাবমেরিন স্কুলের অফিসার ইনচার্জ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে সিওয়ার্ড ডিফেন্স অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময় (১৯৭১):

স্বাধীনতা যুদ্ধের আগেই তিনি পাকিস্তানে চাকরিরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ এম এ খান পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকার বাঙালিদের আর বিশ্বাস না করলে এবং এম এ খানের বাংলাদেশের প্রতি অনুভূতি টের পেলে পরিবারসহ তাঁকে গৃহবন্দি করে।

দীর্ঘ তিন বছরকাল বন্দিজীবন অতিবাহিত করার পর ১৯৭৩ সালে স্ত্রী ও দুই কন্যা বিন্দু ও ঝুনুসহ আফগানিস্তান এবং ভারত হয়ে বাংলাদেশে কৌশলে আসতে সক্ষম হন।

বাংলাদেশে নৌবাহিনী জীবন:

বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে মাহবুব আলী খান চট্টগ্রামে মার্কেন্টাইল একাডেমির প্রথম বাঙালি কমান্ড্যাট নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে নৌ-সদর দফতরে পার্সোনাল বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি নৌবাহিনীর সহকারী স্টাফ প্রধান (অপারেশন ও পারসোনাল) নিযুক্ত হন। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভি কর্তৃক হস্তান্তরিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম রণতরী বি. এন. এস (বাংলাদেশী নেভাল শীপ্) ওমর ফারুকের (প্রাক্তন এইচ. এম. এস ন্যাভডকে) অধিনায়ক হন মাহবুব আলী খান। এ রণতরী গ্রহণের পর তিনি তা নিয়ে আলজেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, মিসর, সৌদি আরব এবং শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোয় শুভেচ্ছা সফরের পর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের নৌবাহিনী স্টাফ প্রধান নিযুক্ত হন এবং ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি বিয়ার অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত হন। এম এ খান সবসময়ই জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন। নৌবাহিনীতে যোগদানে তাঁর দেশপ্রেম স্পষ্ট ছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে বিশ্বমানের আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে মাহবুব আলী খান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আইন তৈরি করেছেন।১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমায় দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ জেগে ওঠে। তারপর থেকেই বাংলাদেশ এবং ভারত, উভয় দেশের সরকারই দ্বীপটিকে তাদের মালিকানা বলে দাবি করে থাকে। রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের নেতৃত্বে এই দ্বীপটি নৌবাহিনী বাংলাদেশের দখলে রাখতে সক্ষম হয়।[ এছাড়া বঙ্গোপসাগরে অনেক জলদস্যুর পতন এনেছেন মাহবুব আলী খান। মাহবুব আলী খান এছাড়া সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও পেনশন কমিটির চেয়ারম্যান, দেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের জাতীয় বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশে উপজেলা পদ্ধতির প্রবক্তা ছিলেন।

রাজনীতিতে অংশগ্রহণ:

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বড় ভাই রেজাউর রহমান নৌবাহিনীতে এম এ খানের সহকর্মী ছিলেন। তাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে এম এ খানের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথেও মরহুম এম এ খানের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ১৯৭৫ সালে দেশে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের পরে জিয়াউর রহমান সরকারের সময় নৌবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি তত্কালীন সরকারের যোগাযোগ উপদেষ্টা ছিলেন।

১৯৮২ সালে দেশে সামরিক আইন জারিকালে এডমিরাল এম এ খান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। এ সময় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা করা হয় তাকে। এবং ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৯৮৪ সালের ১ জুন পর্যন্ত তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়ার সবুজ ও কৃষি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে কাজ করেন।

যোগাযোগমন্ত্রী থাকায় তিনি দেশের রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেন। এ সময় সিলেটের শাহজালাল সেতু, বিশ্বনাথের লামাকাজী সেতু ও বিয়ানীবাজারের শেওলা সেতুসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও বড় বড় কাজের সূচনা করেন। রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল না। লক্ষ্য ছিল স্বল্পকালীন মেয়াদে স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কিছু কাজ সম্পাদন। তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। তিনি শুধু সিলেটের নয়, সারাদেশের জন্যই ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত।

মাহবুব আলী খান গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি বিপ্লব, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করতে পছন্দ করতেন।

শাহাদাত:

১৯৮৪ সালের ৬ আগস্ট সকালে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান ভূপাতিত হলে মাহবুব আলী খান সেই স্থান পরিদর্শনে যান। সে সময় কর্তব্য পালনরত অবস্থায় তাঁর হৃদযন্ত্রের ব্যাথা অনুভুত হলে তাঁকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষণজন্মা এ মহান দেশপ্রেমিক । মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এ মহান নায়কের জীবনাবসান হয়। তাঁকে ঢাকার বনানীতে দাফন করা হয়। রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান সমাজসেবা এবং দেশপ্রেমে ছিলেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু প্রতিষ্ঠিত সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান সুরভির জন্য ছিল তার পূর্ণ সহযোগিতা।

সুরভির হাজার হাজার শিশুর মাঝে আজও তাকে দেখতে পান দেশবাসী। সুরভির কার্যক্রমে ও তৃণমূলের পথকলি শিশুদের উন্নয়নে এম এ খানের স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুকে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকার সমাজসেবায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজ হাতে এ পদক তুলে দেন।

এছাড়া নারীর স্বাস্থ্যসেবা আরো বাড়াতে সিলেটের নাফিজাবানু চ্যারিটেবল হাসপাতাল ও ম্যাটারনিটি হাসপাতাল উন্নয়নে এম এ খান বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঢাকা, চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, মংলা ও খুলনার বিভিন্ন নৌঘাটিতে মরহুম এম এ খানের শাহাদাত বার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়ে থাকে। এছাড়া মরহুমের গ্রামের বাড়ি সিলেট জেলার বিরাহীমপুরে এবং ঢাকায় মিলাদ ও সিরনি বিতরণ করা হয় । প্রতিবারের ন্যায় এবারো বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো যুক্তরাজ্যেও মাহবুব আলী খান স্মৃতি সংসদ ইউকে কর্তৃক মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।

মরহুমের শাহাদাৎ বার্ষিকীতে আমাদের প্রার্থনা, মহান আল্লাহ যেন এ কর্মবীর দেশ প্রেমিককে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে মহিমান্বিত করেন -আমীন।

লেখক: ডক্টর এম মুজিবুর রহমান, সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট ।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close