অন্য পত্রিকা থেকে

প্রথম পাকিস্তানি নারী জেনিথ এরফানের বাইক ভ্রমণের ডায়েরি

মো. আবদুস সালিম: মোটরবাইকে ২০ বছর বয়সী পাকিস্তানি দিগি¦জয়ী নারী জেনিথ এরফান। চেহারায় পরিশ্রম বা ক্লান্তির ছাপ। অথচ মুখে হাসি। সাথে সেডেল ব্যাগ (ভ্রমণের বড় ব্যাগ)। এমন ছবি দেখলে যে কেউ নির্দ্বিধায় বলবেন, এটা কোনো দীর্ঘ যাত্রার ব্যাপক আয়োজন। হ্যাঁ, এটা জেনিথের মোটরবাইকে চড়ে বিশ্ব ভ্রমণের প্রস্তুতির এক বাস্তব চিত্র। প্রাথমিকভাবে তার স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি লাহোর থেকে কাশ্মির পর্যন্ত ছয় দিনের এক মোটরবাইক ভ্রমণ শেষ করেন। কাশ্মিরের উপত্যকার উঁচু-নিচু পথ পার হয়ে বাইক নিয়ে বহু পথ পাড়ি দেন তিনি।

সাধারণত পাকিস্তানের মতো একটি দেশে একজন নারীর একাকী এ ধরনের ভ্রমণের কথা ফলত শোনা যায় না। জেনিথ বলেন, ‘আমি আমার জান্নাতবাসী বাবার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছিলাম, যিনি বাইকে চড়ে বিশ্ব ভ্রমণ করার আশা পোষণ করতেন। আমি ১০ মাস বয়সে পিতাকে হারাই। অল্প বয়সে উপলব্ধি করতে পারি, মানুষের অনেক আশা বা প্রত্যাশা থেকে যায় অপূরণ।

তিনি পাকিস্তানের হিউম্যানস পত্রিকায় বলেছেন, ‘আমার মনে হয় এটা ছিল আগের কোনো রোলার কোস্টার, যা আমাকে বাইক ভ্রমণে প্রজ্বলিত করে।’ ১২ বছর বয়সেও তিনি বাইক চালান। বোঝা যায় এতে তিনি বেশ পারদর্শী। বয়সে বেশ ছোট ছিল বলে অনেকে তাকে বলত, তুমি এটা হাঁকাও কিভাবে? জেনিথ বলেন, ‘গিয়ার বদল করে ও বাম পাশের ক্লাচ চেপে আমি আমার পিতার উত্তরাধিকারকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতাম।’

জেনিথ লাহোর থেকে ১৪ জুন (২০১৫) ছয় দিনের সফরে বের হন। আর ২০ জুন (২০১৫) তা সমাপ্ত করেন। ফিরে এসে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অভিজ্ঞতা পোস্ট করেন। তিনি বলেন, এ ভ্রমণে আমি কোনো প্রতিকূলতার সম্মুখীন হইনি। আমার মা অনেক উদার মনের। ডেইলি পাকিস্তান পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মোটরসাইকেল চালানোর ব্যাপারে আমার মা আমাকে উৎসাহ, প্রেরণা দিয়েছিলেন।

জেনিথ মনে করেন, মোটরবাইক চালানো ও সামাজিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করা একই কথা। নারীদের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালানোর ব্যাপারে মানহানিকর ও লজ্জার আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। ডেইলি পাকিস্তানকে তিনি বলেন, কঠিন উঁচু-নিচু ভূমি ও পাথুরে পাহাড় ছাড়াও মানুষের কঠোর দৃষ্টি ছিল চ্যালেঞ্জের বিষয়। নারী হিসেবে এখানে কিছু সীমাবদ্ধতা আছে বৈকি। তবে আমি আমার কথা ও চলাফেরার ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। বলা যেতে পারে, তার দেশের নারীদের মধ্যে তিনি রীতিমতো এক অগ্রজ। জেনিথের ভ্রমণ ভবিষ্যতে পাকিস্তানের অন্যান্য নারী বাইকচালকের নিয়ন্ত্রক হতে পারে। যা হোক, অস্বীকার করা যাবে না যে, বিশ্বের মানচিত্রে উচ্চ স্থান খোদাই করার ব্যাপারে জেনিথ যথার্থই করেছেন।

সবচেয়ে বড় সন্তান হিসেবে জেনিথ তার পিতার চ্যালেঞ্জকে আমলে নিয়ে নারী বাইকচালক হিসেবে পাকিস্তানে ছাঁচেঢালা অপরিবর্তনীয় সমাজব্যবস্থাকে যেন নতুন করে গড়ে দিয়েছেন- এমন মন্তব্য করেছেন অনেকেই। তারা আরো বলেছেন, সঙ্গী ছাড়া পাকিস্তানি নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে যেখানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানে বাইক নিয়ে বের হওয়া তো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু এ রূপান্তর বা পরিবর্তন তার কাছে সহজে আসেনি বলা যায়।

২০১৩ সালে জেনিথের ছোট ভাই ৭০ সিসি ইঞ্জিনের একটি মোটরবাইক নিয়ে এলে তার মা বলেন, জেনিথকে এটি চালানো শিখাও। যাতে তার জান্নাতবাসী পিতার মনের আশা পূরণ হয়। জেনিথ বলেন, ‘প্রথম দিকে এটা ছিল এক কঠিন সংগ্রামের মতো। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম, কিভাবে বাইকের গিয়ার, ক্লাচ, ব্রেক ইত্যাদি নিযন্ত্রণ করব।’ তার একমাত্র ভয় ছিল ট্রাক ও দুর্গম বা কঠিন রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় দুর্ঘটনা নিয়ে। তবে দৃঢ়চিত্তের মনে সর্বদা বিরাজমান বিপদ বা সমস্যা তার গতি এতটুকুও রোধ করতে পারেনি। তিনি বলেন, মৃত্যু যদি আসেই তবে তা ঘরে বসে থাকলেও আসতে পারে। মৃত্যু, দুর্ঘটনা প্রকৃতির অজুহাতে আমি আমার বাবা-মার স্বপ্নকে পেছনে ঠেলে দিতে পারি না। তা ছাড়া আমি তাদের সাপোর্ট পেয়েছি। আমার দ্বারা যদি পাক সমাজে ভালো কিছু হয় বা আসে তবে খারাপ কিসের।

চীনের কাছাকাছি ছোট একটি গ্রাম মিসগার এক নারী জেনিথকে উদ্দেশ করে বলেছেন, তুমি যা করছ তা তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। অবশেষে ওই নারী জেনিথের দেখাও পান। তাতে খুব খুশি হন তিনি। অর্থাৎ সবার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জেনিথ ডিওসাল সমতল ভূমিতেও পৌঁছান, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ মালভূমি বা প্লাটু। তিনি বলেন, ‘আমি স্নো দেখিনি। কিন্তু বিচিত্র নানা স্থানে ঘোরার কারণে তা দেখার অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। আমার দ্বিতীয় কাক্সিক্ষত মুহূর্তটি ছিল খুনজেরার গিরিপথে পৌঁছা। সেখানেও আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে একাধিকবার।

তবে সেখানে বাইক চালানো প্রায় দুঃসাধ্য ছিল। আমার মোটরবাইকও সেই তুলনায় কম শক্তিশালী ছিল। কিন্তু তাতে চড়ে যখন সেখানে পৌঁছি তখন মনে হচ্ছিল, আমি বড় সফল হয়েছি।’ অর্থাৎ রক্ষণশীলতার কঠিন দেয়াল ভেঙে প্রথম সাহসী পাক নারী জেনিথ এরফান একাই বাইকে দিগি¦দিক ভ্রমণ করে ইতিহাসে স্থান করে নিতে সক্ষম হন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close