যুক্তরাজ্য জুড়ে

লন্ডন কি আলাদা নগর রাষ্ট্র হচ্ছে ব্রেক্সিটের পর

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: গত ২৩ জুন সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক নির্বাচনের মাধ্যমে ব্রিটিশ জনগণ যুগান্তকারী এ রায় দেয়।  ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) থাকা বা না-থাকা নিয়ে ব্রিটেনে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত ব্রেক্সিটের পক্ষে।

এতে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের মতো ব্রেক্সিটের বিপক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছিল অর্থাৎ যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল তাদের সবারই মন ভেঙে যায়। ভেঙে গিয়েছিল ক্যামরনের মন্ত্রিসভাও।

কিন্তু কে জানত এ ভাঙনের সুর বেজে উঠবে পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আদতে ব্যাপার এমনই। নির্বাচনের জাতিগত পরিসংখ্যান হিসাবে আনলে স্কটল্যান্ড এবং নর্দান আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত চূড়ান্ত ফলাফলে প্রতিফলিত হয়নি।

ফলে ব্রেক্সিট ভোটের পর থেকেই গুঞ্জন ওঠে এই দুই জাতি প্রয়োজনবোধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নাগ-পাশ ছিন্ন করবে, তবু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখবে।

আর কেউ কেউ তো বলছেন চারপাশে দেয়াল তুলে দিয়ে সিঙ্গাপুরের মতো আলাদা নগররাষ্ট্র হতে চাইছে লন্ডনও। এমন হলে লন্ডন আরো সমৃদ্ধ নগরীতে পরিণত হবে এবং একে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয় গড়ে উঠবে বলে মত দিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। ক্যামেরনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন একই দলের সিনিয়র রাজনীতিবিদ থেরেসা মে। তিনিও ছিলেন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে।

যদিও ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে আসার প্রক্রিয়াই সামলাতে হচ্ছে। থেরেসার মন্ত্রিসভা থেকে ঘোষণা এসেছে আগামী বছরের শুরুর দিকে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করবে, তা হতে পারে ফেব্রুয়ারি মাসেই।

২৩ জুনের ফলাফলের দিকে চোখ রাখলে দেখা যায়, সামগ্রিক হিসাবে ব্রেক্সিটের পক্ষে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার তাদের রায় দেন। বাকি ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার ছিলেন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে।

এ থেকেই বোঝা যায় নির্বাচনি লড়াইটা ছিল হাড্ডাহাড্ডি এবং ব্রেক্সিটের পক্ষে অবস্থান নিলে প্রায় অর্ধেক ব্রিটিশের মতামতই এতে প্রতিফলিত হবে না। আর জাতিগত হিসাবটা আরও চমকপ্রদ। কারণ, নর্দান আয়ারল্যান্ডের নির্বাচনি পরিসংখ্যানে দেখা যায় সেখানকার ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার ব্রেক্সিটের বিপক্ষ নিয়েছিল।

আর স্কটল্যান্ডের হিসাবটা আরও ভয়াবহ। স্কটিশ ভোটারদের প্রায় ৬২ শতাংশই ব্রেক্সিটের বিপক্ষে রায় দেয়। জাতিগত এ হিসাবটিই ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনে নতুন মেরুকরণ আনতে পারেÑ এমন কথা হচ্ছিল শুরু থেকেই। দিন যত যাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের পূর্বানুমান যেন তীরের কাছেই নোঙ্গর করছে।

সানডে এক্সপ্রেসের বরাতে জানা যায়, সম্প্রতি স্কটিশ প্রধানমন্ত্রী (ঋরৎংঃ গরহরংঃবৎ) নিকোলা স্টারগন ব্রিটেনের সঙ্গে একীভূত থাকা না-থাকা নিয়ে নতুন এক বিতর্ক শুরু করেছেন।

গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি ঘোষণা করেন, ‘স্বাধীনতার বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে ব্রেক্সিট।’ এর আগে ব্রেক্সিটের পরপরই তিনি বলেছিলেন, ‘স্কটিশদের এবার তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ইইউ থেকে টেনে বের করে আনা হবে।

’ সেসময়ই তিনি জানিয়েছিলেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকে সম্মান জানিয়ে স্কটল্যান্ড যেন ইইউয়ে থাকে এর জন্য তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘ভোটের মাধ্যমে এটা পরিষ্কার যে, স্কটিশরা ইউরোপীয় ইউনিয়নেরই অংশ হয়ে থাকতে চায়।’ তার এসব বক্তব্য আমলে নিলে তো এটাই স্পষ্ট হয় যে, প্রয়োজনে ব্রিটেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হলেও তারা ইইউর বড় ক্ষেত্রভূমিতে বিচরণ করতে চায়।

স্টারগনের সুরে সুর মিলিয়ে স্কটিশরা যেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয় বরং ব্রিটেন ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। স্কটল্যান্ডে নতুন করে আওয়াজ উঠছে আরেকটি নির্বাচন নিয়ে। এবারের নির্বাচনের বিষয়বস্তু মূলত ব্রিটিশদের সঙ্গে একীভূত থাকা বা না-থাকা নিয়ে। এর আগে ২০১৪ সালেও এ নিয়ে দেশটিতে একটি জনমত জরিপ হয়েছিল।

মিজ স্টারগন পুরনো পন্থাটাকে আবারও সামনে নিয়ে আসতে চাইছেন। স্কটল্যান্ডের মতো একই আওয়াজ উঠছে আয়ারল্যান্ডেও।

আইরিশ অর্থনীতির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের যে বিরাট যোগসূত্র ছিল ব্রেক্সিটের পর সে ব্যাপারটিই এবার মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি আইরিশ জনগণও জুনের নির্বাচনে সম্মিলিতভাবে ব্রেক্সিটের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল।

ব্রিটেন ছাড়লেই কেবল তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব। জানা যায়, ওয়েলসেও ব্রেক্সিটের বিপক্ষে অবস্থানকারীরা তলে তলে দল ভারী করছেন। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে যে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে এসে উঁকি মারছে তা হলÑ লন্ডনের স্বাধীনতা প্রসঙ্গ।

জানা গেছে, ছোট্ট এই শহরটিও ব্রিটেনের আয়ত্ত থেকে বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্র নগররাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। কেউ কেউ সিঙ্গাপুরের আদলে এটি সম্ভব বলে মনে করছে।

২০১৬ সালে নির্বাচিত লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও এ ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহ দেখিয়ে আসছেন। জেমস ও মালি নামে এক আইনজীবী সম্প্রতি সাদিক খানের কাছে একটি আবেদন জানিয়েছেন।

আবেদনের শুরুতেই তিনি বলেন, লন্ডন একটি আন্তর্জাতিক শহর এবং আমরা ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র হয়েই থাকতে চাই।

নতুন মেয়রকে তিনি এও বলেন, ‘আপনি কি মেয়র সাদিক খান থেকে প্রেসিডেন্ট সাদিক খান হতে পারবেন না?’ সবদিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ভাঙনের ঢেউ বেশ জোরালোভাবেই লেগেছে। এখন শুধু দেখার পালা এর জল কোথায় গড়ায়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close