ফিচার

কতটা ক্ষতি হলো হিলারির

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ বলে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার যে আশঙ্কার কথা বলা হয়ে থাকে, তা সাধারণত হয় একটি ঘটনা এবং তা ঘটে একজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে। অতীতে কোনো কোনো নির্বাচনে কোনো একজন প্রার্থীর বিষয়ে অক্টোবর মাসে এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে বললে সামান্যই বলা হয়।

বারের নির্বাচনে মনে হচ্ছে, অক্টোবর এক দীর্ঘ সময় এবং ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’কে বর্ণনা করতে হবে বহুবচনে।

মাসের গোড়াতেই রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারীদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যসংবলিত ২০০৫ সালের ভিডিও প্রকাশ এবং তারপর প্রায় ১০ জন নারী কর্তৃক ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উত্থাপনের সময় মনে হয়েছিল, এবারের ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ হচ্ছে সেটিই। এর প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় জনমত জরিপগুলোতে। ট্রাম্প ক্রমাগতভাবে জনসমর্থন হারাতে থাকেন।

কিন্তু তারপর ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ই-মেইল হ্যাক করে উইকিলিকস প্রকাশ করতে থাকে অসংখ্য ই-মেইল, যাতে হিলারি ক্লিনটন, ক্লিনটন ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু অজানা তথ্য প্রকাশিত হয়। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের সমর্থকেরা বলতে শুরু করেন, এই হচ্ছে ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’।

এগুলো হিলারি ক্লিনটনের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে না আনলেও, তাঁকে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়, সেটা অনস্বীকার্য। এসব ঘটনা সত্ত্বেও কোনো প্রার্থীই যে একেবারে ধরাশায়ী হয়ে পড়ছেন তা নয়; নির্বাচনী প্রচারাভিযান অব্যাহত থাকে।

শুক্রবার ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’-এর তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি ঘটনা। অকস্মাৎ এফবিআইয়ের প্রধান জেমস কমি কংগ্রেসের কাছে এক চিঠিতে জানান, এফবিআই অন্য একটি বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে হিলারি ক্লিনটনের কিছু ই-মেইল তারা আবিষ্কার করেছে, যা হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইলসংক্রান্ত জুলাই মাসে সমাপ্ত তদন্তের সঙ্গে ‘যুক্ত হতেও পারে’। এই সংবাদকেই এখন অনেকে তৃতীয় ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ বলে বর্ণনা করছেন। অবশ্যই এটা বিস্ময়কর।

কিন্তু সেই বিস্ময় এ কারণে নয় যে হিলারি ক্লিনটন বা তাঁর বহুল আলোচিত ই-মেইল বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমে শুরুতে এমনভাবে বলা হচ্ছিল, যেন এফবিআই হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বিষয়ে আবার তদন্ত শুরু করবে বলে জেমস কমি জানিয়েছেন।

কিন্তু এফবিআইয়ের প্রধানের চিঠিতে যা বলা হয়েছে তা ভালো করে পড়লেই বোঝা যায়, তিনি তা জানাননি। ফলে কোনো কোনো গণমাধ্যম তাদের শিরোনাম থেকে শুরু করে সংবাদের সুর বদলায় কিছুক্ষণ পরই।

কিন্তু তাতে অবশ্য বিস্ময়ের অবসান হয় না। কেননা, বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, এফবিআইয়ের প্রধান কেন নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে এমন এক চিঠি পাঠালেন, যা অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং যেখানে তিনি নিজেই বলেছেন, এসব ই-মেইল আদৌ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কি না, এফবিআই এখনো সেটা নির্ধারণ করতে পারেনি এবং সেটা মূল্যায়ন করতে কতটা সময় লাগবে, এফবিআই তা জানে না।

উল্লেখ করা দরকার যে এসব ই-মেইল হিলারি ক্লিনটনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়নি, তিনি আগে যেসব ই-মেইল সরবরাহ করেছিলেন, সে সময় এগুলো লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল, তা-ও নয় এবং এখনো কেউই জানেন না এসব ই-মেইলে কী আছে। এগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে সাবেক কংগ্রেস সদস্য এন্থনি উইনারের আচরণসংক্রান্ত তদন্তের সূত্রে এবং যেহেতু তাঁর স্ত্রী হুমা আবেদিন হিলারির সহকারী, সেহেতু সেখানে এসব ই-মেইল পাওয়া গেছে।

এ পটভূমিকায় গত শুক্রবার বিকেল থেকেই যে তিনটি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তা হলো, জেমস কমি কেন এই চিঠি লিখেছেন? তিনি আইন মন্ত্রণালয় ও এফবিআইয়ের দীর্ঘদিনের অনুসৃত ঐতিহ্য ভঙ্গ করেছেন কি না? এই চিঠি এবং একে কেন্দ্র করে যে বিরূপ সমালোচনা ও প্রচার হবে, তা হিলারির জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে? নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে এ ঘটনা ঘটার কারণে এবং হিলারি ক্লিনটনের ই-মেইল বিষয়ে আগের তদন্তের কারণে সবার কাছে তৃতীয় প্রশ্নটিই প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আগের দুই প্রশ্নের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।

জেমস কমি জুলাই মাসে হিলারির ই-মেইলবিষয়ক প্রাথমিক তদন্ত শেষে হিলারির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। কেননা, হিলারি কোনো আইন ভঙ্গ করেছেন বলে এফবিআই তাদের তদন্তে পায়নি। আইন মন্ত্রণালয় সেই সুপারিশ গ্রহণ করে।

কিন্তু রিপাবলিকান দলের নেতারা কমির এই অবস্থানে খুশি হননি বলে কংগ্রেস তাঁকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকে এবং সেখানে চার ঘণ্টা দীর্ঘ সাক্ষ্যের সময় তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে কিছু পান, তবে তা তিনি কংগ্রেসকে জানাবেন। তাই কমির জন্য একধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। ওই তদন্তের পর, বিশেষত তাঁর সুপারিশের জন্য কমি রক্ষণশীলদের ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন।

কিন্তু সেই সময় জেমস কমির আচরণ, বিশেষ করে সংবাদ সম্মেলন করে হিলারি ক্লিনটনের তীব্র সমালোচনা অনেক আইনজ্ঞের চোখেই অসমীচীন কাজ বলে বিবেচিত হয়েছিল। তার কারণ হচ্ছে, এফবিআই এ বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত শেষ করলেও এই ফাইল বন্ধ (ক্লোজ) করা হয়নি, অর্থাৎ কমি চলমান একটি তদন্তের বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, যা এফবিআই অতীতে করেনি এবং না করাই হচ্ছে প্রচলিত নিয়ম।

আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অনেক কর্মকর্তাই একে ‘অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু মনে হচ্ছে যে কমি রক্ষণশীলদের সমালোচনার কারণে একধরনের চাপ বোধ করেছেন যে এখন যদি এই ই-মেইলের বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, তবে তিনি শপথ নিয়ে কংগ্রেসকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, যা আইনের বরখেলাপ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এসব বাধ্যবাধকতার বিষয় বিবেচনায় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, যেহেতু তাঁর হাতে সুস্পষ্ট কোনো কিছুই নেই এবং যেহেতু তিনি চিঠিতেও বলেছেন যে তিনি গতকাল জেনেছেন এবং এসব ই-মেইলে গোপনীয় কিছু আছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য তদন্তকারী ব্যক্তিদের নিরীক্ষার লক্ষ্যে এফবিআইয়ের যথাযথ তদন্তের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তাতে এটা স্পষ্ট যে এ ই-মেইলগুলো আদৌ সংশ্লিষ্ট কি না, এমন প্রমাণও হাতে নেই।

এই অস্পষ্টতার কারণেই এখন প্রশ্ন উঠছে, কমির এই চিঠি রাজনৈতিক প্রভাবের চেষ্টা কি না। সিএনএনের আইনবিষয়ক বিশ্লেষক জেফরি টুবিন, যিনি একজন বিশিষ্ট সাংবিধানিক আইনবিষয়ক গবেষক বলেও পরিচিত, স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে এফবিআইয়ের একটি অলিখিত নীতি রয়েছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিনের ৬০ দিন আগে থেকে এমন কিছু না করা, যা নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। টুবিনের এই বক্তব্য ছাড়াও অনেকে একটি আইনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন তা হলো ১৯৩৯ সালে প্রণীত এবং ২০১২ সালে সংশোধিত ‘হ্যাচ অ্যাক্ট’।

এ আইনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী বিভাগের কেউ কোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক একটি সংগঠন শুক্রবারই আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এ অভিযোগ দাখিল করেছে।

যদিও যতক্ষণ পর্যন্ত এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না যে, জেমস কমির আচরণ রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত; ততক্ষণ পর্যন্ত এটি কেবল একটি অভিযোগ বলেই বিবেচিত হবে। কিন্তু এই অভিযোগ যে উঠেছে, সেটিও আলোচনায় আসবে এবং ই-মেইল বিতর্কের পাশাপাশি কমির ভূমিকাও বিতর্কের বাইরে থাকবে না।

কিন্তু এসবের পাশাপাশি যে বিষয়ে সবার চোখ থাকবে এবং যে আলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তা হলো, কমির এই চিঠি হিলারির জন্য কতটা ক্ষতি বয়ে আনবে।

ইতিমধ্যে হিলারি ক্লিনটন যেহেতু স্পষ্ট করেই দাবি করেছেন, এফবিআইয়ের কাছে যে তথ্য আছে, সব তথ্যই প্রকাশ করা হোক। সেহেতু তাঁর প্রতিপক্ষ এই অভিযোগ করতে পারবেন না যে তিনি কিছু লুকাতে চাইছেন।

তার অর্থ এই নয় যে তিনি সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত; অতীতে ই-মেইল বিষয়ে অস্বচ্ছতার কারণে হিলারি অবশ্যই প্রশ্নের মুখে থাকবেন।

কিন্তু কমির এই চিঠির উত্তরে হিলারি শিবির যদি এটা তুলে ধরতে পারে যে এখন পর্যন্ত আসলে কেউ কিছুই জানেন না এবং হিলারি চাইছেন সব প্রকাশ করা হোক, তবে তাঁর পক্ষে এর ক্ষতি অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।

লেখক: আলী রীয়াজ, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close