অন্য পত্রিকা থেকে

রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের দৃষ্টিতে মার্কিন নির্বাচন

বিভিন্ন কারণে আসন্ন মার্কিন নির্বাচন সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এই নির্বাচনে শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দল থেকে গুরুত্বপূর্ণ দু’জন প্রার্থী চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন। রিপাবলিকান পার্টি থেকে ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে হিলারি ক্লিনটন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো নারী প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ট্রাম্প এবং হিলারি- দুই প্রার্থীকেন্দ্রিক লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে কোনো নারী থাকার বিষয়টি এবারের নির্বাচনের বাড়তি বিশেষত্ব। সেখানে নতুনত্বও আছে। দ্বিতীয়ত: দুজন প্রার্থীর নির্বাচনী অঙ্গীকার বা কর্মসূচি। সেদিকে তাকালে আমরা ভিন্ন ধরনের চিত্র পাই। হিলারি তার দলের দুই টার্মের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার কথা বলছেন।

তিনি ওবামা প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে তার যে নীতি ছিল, কমিটমেন্ট ছিল- সর্বোপরি ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি ও কমিটমেন্ট তিনি অক্ষুণ্ন রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

অন্যদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প ওবামা প্রশাসনের নীতির পরিবর্তনই শুধু চাইছেন না, তিনি এমন নীতি প্রণয়নের কথা বলছেন যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্পের ওই পরিবর্তন ইতিবাচক না-ও হতে পারে! তৃতীয়ত: প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রক্রিয়া।

দুই প্রার্থী একে অন্যকে ঘায়েল করার জন্য যে প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিচ্ছেন, তাদের সেই আচরণ কখনই স্বাভাবিক মানদণ্ডের মধ্যে পড়ে না। ডনাল্ড ট্রাম্প যে ভাষায় হিলারি ক্লিনটনকে সম্মোধন করেন এটি অশালীনের পর্যায়ে পড়ে। তা মৌলিক শিষ্টাচারের বিরোধীও।

এছাড়া নারী সমাজ, মুসলিম ধর্মাবলম্বী এবং মেক্সিকানদের সম্পর্কে ডনাল্ড ট্রাম্পের যে ধারণা- তা নির্বাচনী প্রচারণায় তো নয়ই, নির্বাচন উত্তরকালেও অগ্রহণযোগ্য। সেই বিবেচনায় এবারের মার্কিন নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের মানের নিম্নমুখিতা লক্ষণীয়।

নির্বাচনের বড় দুই দলের প্রার্থীদ্বয় যেসব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন সেদিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। জনগণ অপছন্দ করতে পারেন এমন কিছু বিষয় দু’জনের মধ্যেই রয়েছে। বিশেষত: আস্থা এবং বিশ্বাসের ক্ষেত্রে।

নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে হিলারি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। দু’দিন আগে তিনি ফের ই-মেইল বিতর্কের মুখে পড়েছেন। ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার করে তিনি সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন মর্মে যে অভিযোগ ওঠেছে তা এফবিআই তদন্ত করছে।

শেষ সময়ে এসে এটি হিলারিকে যথেষ্ট বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। যদিও জনমত জরিপে হিলারি এখন পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানেই রয়েছেন। নির্বাচনের সপ্তাহখানেক বাকি। নতুন করে সামনে আসা ই-মেইল বিতর্ক চূড়ান্ত লড়াইয়ে হিলারি বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তা এখনই হয়তো স্পষ্ট করে বলা যাবে না।

তবে তার প্রতিপক্ষ ট্রাম্প জয়ী না হলে নির্বাচনের ফল মেনে না নেয়ার যে হুমকি দিয়েছেন তা যদি সত্যি হয়, সত্যিই তিনি যদি পরাজিত হন এবং ফল মেনে না নেন তাহলে এটি হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যে অভিনব এবং বিপজ্জনক ঘটনা! আমার বিবেচনায় মার্কিন নির্বাচন শুধুমাত্র প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়।

এর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, জনমত এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষার বিষয় জড়িত। নির্বাচনের ফল এবং ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্তের সঙ্গে দেশটির গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধ জড়িয়ে গেছে।

এ নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এতকাল ধরে যেভাবে চলে আসছে তা থাকবে, না ভেঙে পড়বে। প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী হবে না-কী দুর্বল হবে। দেশটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় থাকবে না-কি বিনষ্ট হবে। আন্তর্জাতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে সুনাম তা অক্ষুণ্ন থাকবে না কি প্রশ্নের মুখে পড়বে। ৮ই নভেম্বর সেই জবাব মিলবে। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত হয়তো উল্লিখিত প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাবে।

কারণ ওই নির্বাচনের সঙ্গে গভীরভাবে এসব প্রশ্ন জড়িয়ে গেছে। এ নির্বাচন মার্কিন ভোটারদের জন্যও চ্যালেঞ্জ। তবে আশার দিক হচ্ছে মার্কিন জনগণ চূড়ান্ত বিবেচনায় যুক্তির পক্ষেই থাকবেন বলে আশা রাখি। তারা সচেতনভাবেই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সমুন্নত রাখার পক্ষে তাদের মূল্যবান রায় দেবেন।

বিশ্ব দরবারে যুক্তরাষ্ট্রের যে সুনাম রয়েছে মার্কিন ভোটাররা তার প্রতি সুবিচার করবেন। জনরায়ের প্রতিফলন দেখতে আমাদের সেই ক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে।

অনুলিখন: মিজানুর রহমান

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close