জাতীয়

বিশ্বের ৩২টি দেশে জমি কিনছে বাংলাদেশ

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: উন্নত দেশগুলো দেশের বাইরে তাদের দূতাবাস তৈরি করে নিজেদের কেনা জমিতে। এবার বাংলাদেশও চাইছে বিশ্বের যেখানে যেখানে নিজেদের দূতাবাস রয়েছে সেগুলো গড়ে তোলা হবে নিজেদের কেনা জমিতে।

এ জন্য অন্তত ৩২টি দেশে জমি কেনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। টার্গেট-২০২৪ সালে বিদেশে বাংলাদেশ মিশন হবে নিজের কেনা জমিতে। সম্প্রতি ওইসব জমি কেনার প্রস্তাব সংবলিত একটি সারসংক্ষেপ অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সারসংক্ষেপে বলা হয়, পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত, কার্যকর ও বেগবান পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা এবং বহির্বিশ্বে কূটনৈতিক উপস্থিতি ও তৎপরতা অধিকতর স্থায়ী ও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বর্তমান সরকার এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো নিজস্ব ভবনে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি বৃহৎ প্রকল্প প্রণয়নের নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী চলতি বছরের জুলাইয়ে এ সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলে তিনি এ ব্যাপারে অগ্রসর হতে বলেন।

জমি কিনতে যেহেতু বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন, সেজন্য এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ওই সারসংক্ষেপসহ ৩২টি দেশে দূতাবাসের তালিকা পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পররাষ্ট্রের প্রস্তাবটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। বেশকিছু দেশে দূতাবাসের জন্য জমি কেনা হয়েছে। একাধিক দেশে জমি কেনার প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। যেসব দেশে নেই সেখানে কী ধরনের জমি কেনা হবে, কোনো প্রস্তাব রয়েছে কি-না সেই বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা দরকার বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে বিশ্বের ৫৫টি দেশে বাংলাদেশের ৭২টি মিশন রয়েছে। যার মধ্যে ৫৪টি দূতাবাস, দুটি স্থায়ী মিশন, আটটি কনস্যুলেট জেনারেল, তিনটি ডেপুটি হাইকমিশন, দুটি সহকারী হাইকমিশন, একটি কনস্যুলেট এবং একটি ভিসা অফিস। এর মধ্যে মাত্র ১০টি দূতাবাসের জন্য নিজস্ব জমি রয়েছে। তবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসের বেশিরভাগই চলছে ভাড়া বাড়িতে।

এ কারণে নানা ধরনের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। আর্থিক টানাপড়েনসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় ভাবমূর্তি সংকটে। পরিস্থিতি উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যায়ক্রমে সব দূতাবাস নিজস্ব জমিতে স্থায়ী ভবনে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৩২টি দেশের গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসগুলো স্থায়ী ভবনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, দূতাবাসগুলোর কূটনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তিনটি পর্যায়ে (১ম পর্যায় ২০১৬-২০১৮, দ্বিতীয় পর্যায় ২০১৯-২০২১ এবং তৃতীয় পর্যায় ২০২২-২০২৪) নিজস্ব জমিতে দূতাবাস স্থাপনের জন্য একটি অগ্রাধিকার তালিকা পাঠিয়েছে।

ওই তালিকা অনুযায়ী, যে দেশগুলোতে দূতাবাস কিনতে এরইমধ্যে জমি কেনা হয়েছে সেগুলোতে ভবন নির্মাণ, নিজস্ব জমি না থাকলে জমি কিনে ভবন নির্মাণ এবং আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হলে জমিসহ তৈরি ভবন কিনে সেখানে দূতাবাস স্থানান্তর করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে পররাষ্ট্রের প্রস্তাবে।

প্রথম পর্যায়ে নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলস, ক্যানবেরা, জেদ্দা, বন্দরসেরি বেগওয়ান, জেনেভা, কাঠমান্ডু ও এথেন্স; ২য় পর্যায়ে পুত্রজায়া, নেপিডো, আবুধাবি, কলম্বো, অটোয়া, কুয়েত, দোহা ও ব্যাংকক এবং তৃতীয় পর্যায়ে প্যারিস, দুবাই, ম্যানিলা, বার্লিন, হ্যাগ, জাকার্তা, মানামা, রোম, আম্মান, মাস্কট, তেহরান, বাগদাদ, সিঙ্গাপুর, ভিয়েনা, সিউল এবং জাকার্তায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো নিজস্ব জমিতে তোলা ভবনে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অস্ট্রেলিয়ার ক্যানেবেরায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের জন্য নিজস্ব চ্যান্সারি এবং রাষ্ট্রদূত ভবন ও দূতাবাস নির্মাণে সেখানকার কূটনৈতিক এলাকায় প্রায় ১০ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭৪ দশমিক ১০ কাঠা জমি কেনা হয়েছে।

তবে ওই জায়গাটি অস্ট্রেলিয়ার বিপন্ন প্রাণী গোল্ডেন সান মথের প্রজনন ক্ষেত্র হওয়ায় পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বন্দরসেরি বেগওয়ানে নিজস্ব দূতাবাস নির্মাণে ৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় দশমিক ৯৪ একর জমি এবং চ্যান্সারি ভবন নির্মাণে আরও এক দশমিক ৬৯ একর জমির দুটি প্লট ব্রুনাই সরকারের কাছ থেকে গত জুনে কেনার কথা জানানো হয়েছে।

দূতাবাস ও রাষ্ট্রদূত ভবন নির্মাণে নেপালের কাঠমান্ডুর বুধানিকান্থ ও নারায়নথান এলাকায় ২০০৯ সালে ৮৫ দশমিক ২৬ কাঠা জমি কেনা হয়। কেনা জমিতে ভবন নির্মাণে শিগগিরই প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মিয়ানমারের নেপিডোতেও দূতাবাস নির্মাণে ৫ দশমিক ৭৪ একর জমি কেনা হয়েছে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলস-এ ৫টি জমি (ভবনসহ) বাছাই করে কেনার প্রস্তাব এবং গ্রিসের এথেন্সে চেন্সারি ও রাষ্ট্রদূত ভবন নির্মাণে দুটি জায়গা কেনার সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট মিশন। এথেন্সে প্রস্তাবিত জমি ভবনসহ কিনতে ৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে সরকারের। এ ছাড়া কুয়েত সিটিতেও দূতাবাস নির্মাণে বাংলাদেশের ৪৬ কাঠা ও ১৫ কাঠার দুটি প্লট কেনা হয়েছে। তবে ওই জমি এখনো বুঝে পায়নি মিশন কর্তৃপক্ষ।

মালয়েশিয়ার পুত্রজায়া সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির সরকারের বাধ্যবাধকতা থাকায় পুত্রজায়ার কূটনৈতিক এলাকায় ২০০৯ সালে ৪৭ কাঠা এবং ৯১ কাঠা আকারের দুটি জমি কেনা হয়। ওই জমিতে দূতাবাস নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

পাশাপাশি কুয়ালালামপুরেও দূতাবাস নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত কুয়ালালামপুরে জমি কিনে নিজেদের দূতাবাস ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে কনস্যুলেট জেনারেল নির্মাণ ও আবুধাবির বিষয়ে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সেখানে দূতাবাস নির্মাণে নিজস্ব জমি নেই।

দফতর দুটি বিপুল সংখ্যক অভিবাসী বাংলাদেশিদের কনস্যুলার সেবা প্রদান করে থাকে। গুরুত্ব বিবেচনায় সেখানে জমি কিনে স্থায়ী দূতাবাস নির্মাণ করতে বলেছে পররাষ্ট্র। একইভাবে অভিবাসীদের সুবিধা দেওয়া ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের দোহা, দুবাই এবং জেদ্দাতেও জমি কিনে প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

ফিলিপাইনের ম্যানিলা, জার্মানির বার্লিনে, জর্ডানের আম্মান, সিঙ্গাপুর সিটি, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল এবং ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকেও একাধিক জমি বাছাই করে কেনার জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে অন্য যেসব দূতাবাসের তালিকা রয়েছে প্রস্তাবে সেগুলোর কোনোটিরই নিজস্ব জমি নেই।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ক্রমে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওই শহরগুলোতে জমি কিনে নিজস্ব ভবনে দূতাবাস স্থাপনের কথা বলেছে তাদের দেওয়া প্রস্তাবে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close