অন্য পত্রিকা থেকে

স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রার আত্মকাহিনী

মো. সাইদুর রহমান: প্রিয় বাংলাদেশ। প্রায় ২০ কোটি মানুষের এক অস্থির সমাজ। যেখানে তরুণ জনগোষ্ঠির সংখ্যা এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। এই তরুণ জনগোষ্ঠির বেশিরভাগই আবার শিক্ষিত। সুষ্ঠ পরিকল্পনা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর অপরিকল্পিত শিক্ষানীতির কারণে এই তরুণ জনগোষ্ঠির অধিকাংশই এখানে বেকার। প্রিয় বাংলাদেশের এই বেকার তরুণ জনগোষ্ঠির এক সদস্য আমি।

দুরন্ত কৈশোরে শস্য-শ্যামল-সবুজ প্রকৃতি, ছোট-বড় নদী-নালা, খাল-বিল আর হাওড়-বাওড়ে বড়পুর মাতৃভূমি ছিলো ভালো লাগার উর্ধে। নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করতাম এই দেশে জন্মেছি বলে। কিন্তু যখন কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনের প্রথম ধাপে পদার্পণ করলাম, যখন থেকে নিজেকে নিয়ে ,পরিবার (মা,বাবা,ভাই বোন) নিয়ে, সমাজ নিয়ে , দেশ নিয়ে, সর্বোপরি সমাজে নিজের একটি সুন্দর অবস্থান নিয়ে চিন্তা করতে শিখলাম, তখন প্রিয় বাংলাদেশ আমার কাছে আবির্ভুত হলো নতুন রুপে। যেখানে কেবল নাই নাই নাই…।

রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বাস-ট্রেন, ব্যাবসা-বাণিজ্য, চাকরি সর্বত্রই হাহাকার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দুর্নীতি আর নৈতিকতার অভাব রাষ্ট্র ব্যবস্থার সর্বত্র।তখন নিজেকে বড়ই দূর্ভাগা মনে হতো এই ভেবে যে আমি বাংলাদেশে জন্মেছি। যে কারণে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বৈধ/অবৈধ পথে দেশ ছেড়ে পালাতে চাইছে বা পালাচ্ছে আমার মতো অসংখ্য তরুণ। যাদের বেশিরভাগেরই মূল লক্ষ্য ইউরোপ কিংবা আমেরিকা।

এখানে বৈধ পথে যাওয়ার রাস্তা খুবই অল্প থাকার কারণে বাকিদের বেছে নিতে হচ্ছে অবৈধ রাস্তা। সফল হচ্ছেন কেউ কেউ কালে-ভদ্রে,আবার অনেকে হারিয়ে যাচ্ছেন অজানা-অচেনা অথৈ সমূদ্রে কিংবা পর্বত সম পাহাড়ের গভীর খাদে।কারো কারো খোঁজ মিলে বেঁচে যাওয়া সহযাত্রীর মুখে আবার কেউবা নিখোঁজ থাকে বছরের পর বছর।স্বজনরা অন্ধকারে খুঁজে ফিরে প্রিয়জনের মুখ দিনের পর দিন।

উত্তাল সমুদ্র আর পর্বতসম পাহাড়ের সকল গিড়িখাত পাড়ি দিয়ে ফ্রান্স পৌছানোর ভয়াবহ ও চমকপ্রদ এক কাহিনী আমার ইউরোপ যাত্রা।চেষ্টায় আছেন বা রাস্তায় অবস্থানরত সকলের অবগতির জন্যই মূলত আমার এই লেখার চেষ্টা। দীর্ঘ দিন বৈধ উপায়ে ইউরোপ কিংবা আমেরিকা যাওয়ার চেষ্টা করে বর্থ্য হওয়ার পর এক রকম বাধ্য হয়েই জর্জিয়া আসার সিদ্ধান্ত নেই। সঙ্গে আমার এক বড় ভাই এহসান রশিদ রাজু।পরিচিত এক ভাইয়ের (দালাল) সাথে কথা হয়।তিনি আমাদের জর্জিয়া হয়ে বৈধ উপায়ে এক মাসের মধ্যে সেনজেন ভুক্ত দেশে পাঠাবেন।

সম্ভাব্য দেশ পোলেন্ড বা চেক রি পাব্লিক। চুক্তি অনুযায়ী সেপ্টম্বর মাসে আমরা জর্জিয়া আসি। আমাদের রিসিভ করে আনান নামের একজন। যে আমাদের সেনজেন ভিসার সকল কাজ করবে। রিসিভের পর থেকেই আনান বিভিন্ন কাজের (রিসিভ করা, গাড়ি ভাড়া, সিম কিনা, হোটেল, বাসা খোঁজা, বাস কার্ড, ভিসা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ, উকিল ধরা) জন্য এক টাকার জায়গায় দশ টাকা করে নিতে থাকে।

যদিও চুক্তি অনুযায়ী সেনজেন ভিসা হওয়ার পূর্বের সকল ব্যয় তাঁদের বহন করার কথা। দেশে (দালালের সাথে) কথা হলে সে বললো আপাতত আমরা দেওয়ার জন্য, পরবর্তীতে পাঠানো হবে। আসার পর বিভিন্ন মাধ্যেমে জানতে পারলাম জর্জিয়া থেকে বৈধ ভাবে সেনজেন ভিসা নেওয়া অসম্ভব। তারপরও আমরা অপেক্ষা করি এবং পরামর্শ করে ঠিক করলাম অযথা টাকা খরচ না করে আমরা একজন একজন করে সেনজেন ভিসার প্রসেসিং করবো।

আজকাল করে দুই মাস চলে গেলেও কোন কাজ হলো না। ইতিমধ্যে দেশ থেকে ১ হাজারেরও বেশী লোক চলে আসে জরজিয়া। সবার সাথে মোটামোটি একই রকম চুক্তি। কেউ ফ্রান্স, কেউ ইতালি, স্পেন, আবার কেউ কেউ আমাদের মতো পোলেন্ড বা চেক রি পাবলিক। কিন্তু আসার কিছু দিন পর থেকে বেশির ভাগের সাথেই দালালের যোগাযোগ নেই। এই রকম অবস্থায় সবাই দিশেহারা।

এই দিকে ভিসার মেয়াদ ১ মাস থাকার কারণে প্রায় সবাই অবৈধ। বৈধ ভাবে জর্জিয়া থেকে অন্যকোন দেশে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই। আবার অবৈধ ভাবে যাওয়ার কোন রাস্তা কেউ জানে না। এরই মধ্যে জর্জিয়ায় থাকা পুরাতন কিছু ভাই জর্জিয়া থেকে বাহির হওয়ার রাস্তা খুঁজতে থাকেন। বিভিন্ন দালালের সাথে কথা হয়।

জর্জিয়ার পার্শবর্তী দেশ রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান এবং আজারবাইজান। স্বাভাবিক কারনেই সবার ১ম পছন্দ ছিলো তুরস্ক। কিন্তু অবৈধ ভাবেও জর্জিয়া থেকে সরাসরি তুরস্ক ঢুকার কোন নির্ভরযোগ্য মাধ্যেম পাওয়া যাচ্ছে না। যা ছিলো তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বাধ্য হয়েই সবাই অন্যদেশ হয়ে তুরস্ক ঢুকার চিন্তা করে। কেউ ইরান হয়ে আবার কেউ আজারবাইজান হয়ে।

আবার কেউ ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি তুরস্ক যাওয়ার চেষ্টা। যতটুকু মনে পড়ে, সবার সাথে কথা বলে সবথেকে নির্ভরযোগ্য রাস্তা মনে হচ্ছিলো ইরান হয়ে তুরস্ক যাওয়াটা। তাই আমরা ১মে দুই ধাপে ছয়জন ইরান হয়ে তুরস্ক যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা তিন জন পরে যাবো। প্রথমে যাবে আরও একটা গ্রুপ। কিন্তু ১ম গ্রুপ তাঁদের সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করলো, তারা আমাদের না জানিয়েই সরাসরি জর্জিয়া থেকে তুরস্ক ঢুকার রাস্তায় রওয়ানা দিলো। তিন দিন অতিক্রম হওয়ার পরও তাঁদের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আমাদের দালাল তাড়াহুড়া শুরু করে।

আরো দুই দিন পর তাঁদের সাথে যোগযোগ হয়। তারা তুরস্ক পৌঁছেছে। কিন্তু তারা এই রাস্তায় অন্য কাউকে না যাওয়ার জন্য বলে। তারা তিন দিন তিন রাত পায়ে হেঁটে তুরস্ক সিমান্তে যায়। পথিমধ্যে বরফ আর ঠান্ডায় গভীর জঙ্গলে তাঁদের রাত্রি যাপন করতে হয়। সীমান্তে তাঁরা মাফিয়াদের হাতে পড়ে। মাফিয়ারা তাঁদের উপর টাকার জন্য নির্যাতন চালায়, সেখান থেকে তুরস্ক সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষ তাঁদের উদ্ধার করে তুরস্ক বর্ডার গার্ডের নিকট প্রেরণ করে।

এই সময় তাঁরা পাঁচ জনের মধ্যে সকলের অবস্থা ছিলো করুন। পাঁচ দিন না খেয়ে, মেঘ-বৃষ্টি আর ঠান্ডায় সবাই ছিলো দুর্বল। পাহাড়ি গাছের কাঁটায় তাঁদের শরীর ছিলো ক্ষতবিক্ষত, বরফ আর ঠান্ডায় কারও হাত আবার কারও পা কাজ করছিলো না। এই অবস্থায় বর্ডার গার্ড তাঁদের খাওয়া, কাপড় ও ওষুধের ব্যবস্থা করে।

আর দুই দিন জেলে রাখার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের ইস্তাম্ভলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। তাঁদের কথা শুনে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ইরান হয়েই গেইম করবো। পূর্বের চুক্তির কারনেই আমাদের তিনজনের পাসপোর্টে ইতিমধ্যে আজারবাইজানের বাকু থেকে ইরানের ভিসা নেওয়া হয়েছে। ভিসা অরিজিনাল হলেও ভিসা নেওয়ার মাধ্যেম ছিলো অবৈধই।

কারন আমরা ছয় জনের কেউই বাকু না গিয়ে ভিসা নেই। একদিকে জর্জিয়ার ভিসার মেয়াদ নেই, আবার আমরা ফ্লাই করার পর যদি ইরান ইমিগ্রেশন আমাদের আটক করে অবৈধ ভাবে ভিসা নেওয়ার জন্য, তাহলে আমাদের দেশে ফিরত পাঠাবে কারণ আমাদের জর্জিয়ার ভিসার মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ।

সকল ঝুঁকি নিয়েই আমরা তিনজন আল্লাহ্র উপর ভরষা করে রওয়ানা দিলাম। ইরান ইমিগ্রেশনে প্রায় ত্রিশ মিনিট তর্ক-বিতর্কের পর আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বাহির হই। ইমিগ্রেশন বারবার আমাদের একটি কথাই বলছিলো যে, তোমরা বাকু না গিয়ে কিভাবে বাকু থেকে ভিসা সংগ্রহ করলে,এখানে আমাদের যুক্তি ছিলো ভিসা অরিজিনাল কি না।

আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা শেষ পর্যন্ত ইরান ঢুকলাম। আমার এখনও মনে হয় ঐ ৩০ মিনিটের চেয় লম্বা সময় আমি এখনও অতিক্রম করিনি।

চলবে…

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close