এশিয়া জুড়ে

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের সত্য-মিথ্যা

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে কিনা এ বিষয়ে সরকার নিযুক্ত একটি কমিশনের চুড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। উত্তর রাখাইন প্রদেশে সাংবাদিকদের প্রবেশ এখনও নিষিদ্ধ। বার্মিজ সরকার এবার দেশটির সৈনিকদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের ধর্ষণ ও হত্যার যে অভিযোগ উঠেছে মোকাবিলার চেষ্টা করছে।

কয়েক মাস আগেই সামরিক সরকারকে হটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসেছে। এ নিয়ে বিবিসির মিয়ানমার প্রতিনিধি জোনাহ ফিশার কথা বলেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির মধ্যে মানুষের ধারণার চেয়েও বেশি মিল রয়েছে।

দু’ জনের বয়সই ৭০-এর উপরে। দু’জনের চুল নিয়েই আলোচনা হয়েছে বিস্তর। আর তাদের উভয়েরই অপছন্দের তালিকার একেবারে শুরুর দিকে রয়েছেন সাংবাদিকরা। ট্রাম্প সঙ্গে মিডিয়ার উত্তাল স¤পর্ক ফলাও করে প্রচার হয়েছে। তবে সু চির সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক কেমন, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকতে পারে।

নামে বেশি পরিচিত। ১৯৯০ সালের দিকে তিনি মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের আইকন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সু চি যখন মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের হাতে গৃহবন্দি, তখন অনেক সাংবাদিক নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে যায় তার সাহসী প্রতিরোধের কাহিনী শুনতে। তিনি এখন ক্ষমতায়, অথচ পরিস্থিতি একেবারে আলাদা।

নিজের জন্য স্টেট কাউন্সেলর নামে একটি ক্ষমতাধর পদ তৈরি করেছেন তিনি। যাতে তিনি ‘প্রেসিডেন্টের ওপরে থাকার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন। কিন্তু দৃশ্যত দেখা যাচ্ছে, তিনি জন-জবাবদিহিতারও উর্ধ্বে। আজকাল তিনি মিয়ানমারের কোন গনমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন না।

এমনকি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কথা বলেন মর্জি মতো বেছে বেছে। পার্লামেন্টে এমপিরা তাকে নিয়মিত প্রশ্ন করতে পারেন না। কোন সংবাদ সম্মেলনও আয়োজন করেননি এখন পর্যন্ত। সর্বশেষ করেছিলেন ১৪ মাস আগে নির্বাচনের পূর্বে। এরপর সরকারী প্রোপাগান্ডা তো আছেই। যেগুলো বার্মার সামরিক শাসন আর সেন্সরশীপের কালো দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়।

 রোহিঙ্গা কারা?

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশা নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তার নিন্দা জানিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রপত্রিকায় প্রায় প্রতিদিনই নিবন্ধ ছাপা হয়। মিয়ানমারে বর্তমানে বসবাসকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। প্রায় কয়েক দশক ধরে তারা বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। আর গত সাড়ে তিন মাস ধরে, উত্তর রাখাইন প্রদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা এক নির্মম সামরিক অভিযানের শিকার।

সেখানে মূলত কি ঘটছে, তার উত্তর নির্ভর করবে আপনি কাকে বিশ্বাস করবেন বলে ঠিক করবেন তার ওপর। কারণ, নিরপেক্ষ প্রত্যেককেই এ প্রদেশে প্রবেশ থেকে বিরত রেখেছে সরকার। কেউ দাবি করছেন, সেখানে বার্মিজ সেনাবাহিনী জাতিগত নির্মূলাভিযন চালাচ্ছে, এমনকি গণহত্যাও। কিন্তু সুচি ও তার বার্মিজ সেনাবাহিনী এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সুচির বক্তব্য, পুলিশ চৌকিতে আক্রমণ করে সংকট সৃষ্টিকারী রোহিঙ্গা জঙ্গিদের ধরতে সন্ত্রাসবাদ-প্রতিরোধ অভিযান চলছে সেখানে।

 বিরল সাক্ষাৎকার

এই যখন পরিস্থিতি, তখন গত সপ্তাহে বিবিসিকে সংঘাত উপদ্রুত রাখাইন অঙ্গরাজ্যে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে সরকার। একে চমক হিসেবেই দেখেছেন জোনাহ ফিশার। তিনি বলেন, আমরা খুব দ্রুতই রাজ্যের রাজধানী সিতওয়েতে চলে যাই। সেখান থেকে মায়ু নদীতে একটি ফেরিতে চড়ে রওনা দিই বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে।’ কয়েক ঘন্টা পর, আমরা অবশেষে বুথিডং নামে এক জায়গায় আসি। যেখান থেকে সংঘাত উপদ্রুত এলাকা মাত্র ৪৫ মিনিট দূরে।

জোনাহ ফিশারের ভাষ্য, দূর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে কর্তৃপক্ষও ছিল। আগে থেকে সেখানে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল আমাদের অপেক্ষায় ছিল। তারা আমাদেরকে স্থানীয় শহর প্রশাসনের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেখানে গিয়ে আমাদেরকে খুব ভদ্রভাবে জানানো হয় আমাদের এই ভ্রমণের অনুমতি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এই বিবিসি প্রতিবেদক বলেন, আমাদেরকে অনুমতি দেওয়ার খবর রাজধানী ন্যপিদং-এ সু চি সরকারের কানে পৌঁছায়। সেখান থেকেই আমাদের আটকানোর আদেশ জারি করা হয়। তবে ফিরতি নৌকায় উঠার আগে, স্থানীয় এক প্রশাসক ক্যামেরায় সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হন। এক হিসাবে, এটিই ছিল এক বড় বিজয়। কারণ, অক্টোবরের পর সু চি ও তার মুখপাত্রের সঙ্গে রাখাইন নিয়ে কথা বলার সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।

জোনাহ ফিশার বলে যান, পেশায় ডাক্তার এই স্থানীয় প্রশাসক থ্যান তুত ক্যায়াও হলেন একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তিনি উত্তর রাখাইন অঙ্গরাজ্যে ১০ বছর ধরে থাকছেন। তার সঙ্গে কথা বলে খুব দ্রুতই বোঝা গেল অনেক বার্মিজের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার যে প্রতিবেদন, তা স্রেফ বানানো। থ্যানের ভাষ্য, আমাদের এখানে লুকানোর কিছু নেই। পরিস্থিতি নিয়ে সরকার সব সত্য তথ্য প্রকাশ করছে। বার্মিজ বৌদ্ধ মতবাদের শিক্ষা ধর্ষণ অনুমোদন করে না। এগুলো সব গুজব।

যাচাই বাছাইয়ের চ্যালেঞ্জ

তবে সুচির জন্যে সমস্যা হচ্ছে এসব অভিযোগকে নিছক গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সাংবাদিক বা ত্রাণকর্মীরা পৌঁছাতে পারলেও, রোহিঙ্গারা নিজেরাই রিপোর্টিং-এর কাজ হাতে নিয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে দুনিয়াকে তাদের প্রকৃত অবস্থা জানাচ্ছে। প্রতিবেদক ফিশার বলেন, ‘গত কয়েক মাসে আমি অনেকগুলো মর্মস্পর্শী ভিডিও দেখেছি। মুখে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে নারীরা বলছেন তাদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মাটিতে পড়ে আছে শিশুদের নিথর শরীর। ছাইয়ের স্তূপে দেখা যাচ্ছে পোড়া মাথার খুলি।’ ফিশারের মতে, এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। প্রায়ই একই জায়গায় একাধিক সূত্র থাকে। পাশাপাশি কিছু সংগঠনের নিজস্ব সূত্রের নেটওয়ার্ক আছে মাঠপর্যায়ে। সাধারণত, বার্মিজ রাষ্ট্রায়ত্ত মিডিয়া ঘটনার নিজস্ব বিবরণ প্রকাশ করে থাকে।

তবে নির্যাতিতদের সঠিক সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব নয়। কারণ, মানুষ প্রায়ই পালিয়ে বেড়ায়। ফলে সামগ্রিক চিত্র পাওয়া কঠিন। কিন্তু ওই ভিডিওগুলো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ খ-চিত্র, যেগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, ভয়ংকর কিছু একটা সেখানে ঘটছে। আর সু চি ও তার কর্মকর্তারা যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তা সরাসরি ট্রা¤েপর কাছ থেকে ধার করা বলা যেতে পারে।

মিডিয়া কী বলছে?

প্রথমত, মিডিয়ার করা অল্প কিছু ভুলকে তুলে ধরে, রাষ্ট্রায়ত্ত মিডিয়া রোহিঙ্গা সংক্রান্ত বিপুল প্রমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। যেমন, বৃটেনের মেইল অনলাইনে প্রকাশিত এক খবরে এক নির্যাতিত শিশুকে রোহিঙ্গা বলে উল্লেখ করা হয়। মূলত, ওই শিশু ছিল কম্বোডিয়ার। এই একটি ভুলই রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকার প্রথম পাতার সংবাদ হয়ে উঠে, যদিও ভুলের বিষয়টি নজরে আসার পরপরই ডেইলি মেইলের ওয়েবসাইট থেকে খবরটি প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া, সু চির একটি বক্তব্যকে রোহিঙ্গাদের দিকে উপহাসের হাসি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। এ নিয়েও তুমুল হৈ চৈ হয় মিয়ানমারে। হুমকি দেওয়া হয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার।

আবার সু চির কর্মকর্তারা যেসব প্রোপাগান্ডা ছড়ান, সেগুলো মাঝে মাঝে খুবই অদ্ভুত প্রকৃতির হয়।

জানুয়ারির শুরুতে স্টেট কাউন্সেলরের অফিস থেকে হলিউড তারকা সিলভেস্টার স্ট্যালোনের একটি ছবি পোস্ট করা হয়। এই ছবিটিকে মিথ্যা রোহিঙ্গা নির্যাতন প্রচারণায় ব্যবহৃত ছবির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়।

এই ছবিটি পোস্ট করার মত নির্বুদ্ধিতা কে দেখিয়েছে তা জানা যায়নি। খুব সম্ভবত কোন এক ফেসবুক ব্যবহারকারী। তবে, লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এমনই কৌশল এ সপ্তাহে ওয়াশিংটনেও দেখা গেছে। অর্থাৎ, একজনের করা সামান্য ভুল ফলাও করে প্রচার করে, অন্যদের প্রকাশ করা বিপুল পরিমাণ প্রমাণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা মনোযোগ অন্যদিকে প্রবাহিত করা।

সিএনএন বা গার্ডিয়ানে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে আরো বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এগুলোকে বেশ স্থুলভাবে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য আরেক ধরণের ফর্মুলা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যেসব রোহিঙ্গা গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয় সেসব গ্রামে নিরাপত্তা কর্মী পাঠানো হয়। তারা গিয়ে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রতিবেশি ও পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করে। এরপর তাদের কাছ থেকে আদায় মিথ্যা বিবৃতিতে সই আদায় করা হয়। এতে মিডিয়ার প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তার উল্টোটা লেখা থাকে।

প্রোপাগান্ডা কি থামানো যাবে?

আশ্চর্যজনক হলেও বৃটেন সহ অনেক দেশ এখনও সু চিকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিচ্ছেন। তারা জোর দিচ্ছেন একনায়কতন্ত্র থেকে মিয়ানমারের সরে আসার ইতিবাচক দিকগুলোর দিকে। কারণ, সু চি এখনও ক্ষমতায় নতুন। আর সংবিধান মোতাবেক, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই।

তিনি চাইলেও হয়তো মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক অভিযান ঠেকাতে পারতেন না। আর তার যত ত্রুটিই থাকুক না কেন, সবাই একমত যে, বর্তমানে মিয়ানমারের সেরা ভরসাস্থল তিনিই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আর কিছু না পারুক, সু চি চাইলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে অবমাননাকর প্রোপাগান্ডা অন্তত বন্ধ করতে পারতেন। সুচির অধীনে যেসব মন্ত্রণালয় রয়েছে আর যেসব কর্মকর্তাকে তিনি নিজে সরাসরি নিয়োগ দেন, তারা মরিয়া রোহিঙ্গাদের বক্তব্য উড়িয়ে দিচ্ছেন। আর মিয়ানমার আর্মিরা যেসব বলছে সেগুলোকেই সত্য বলে প্রচার করছেন। অথচ, এটি সে-ই একই সেনাবাহিনী। যেই বাহিনীর কিনা মিয়ানমারের বহু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদেরকে ধর্ষণ ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার দীর্ঘ ট্রাক রেকর্ড রয়েছে।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে আং সান সুচি এই নির্যাতনের ঘটনা তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করেছেন বটে। কয়েকদিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দেওয়ার কথা এই কমিশনের। কিন্তু এ কমিশনের প্রধান হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মিন্ট সোয়ে। তিনি একজন সাবেক জেনারেল। তাই, অনেকের ধারণা, এই চ’ড়ান্ত প্রতিবেদনটি একটিও ‘দামাচাপা’ ছাড়া কিছুই হবে না।

উত্তর রাখাইনে আসলে কি ঘটছে, তা হয়তো কখনই জানা যাবে না।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close