Americaযুক্তরাষ্ট্র জুড়ে

মুসলিম নিষিদ্ধকরণ আদেশ দিয়ে বিপাকে ট্রাম্প: নিষেধাজ্ঞায় ট্রাম্পের দলেই অস্বস্তি

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে অত্যন্ত চৌকস একজন মানুষ হিসেবে পরিচয় করাতে ভালোবাসেন। তিনি বই পড়েন না, অথবা গোয়েন্দাদের ব্রিফিং শোনার প্রয়োজন দেখেন না।

কারণ তাঁর কথায়, আমার আইকিউ (বা বুদ্ধিমত্তা) অত্যন্ত উঁচু। সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে দেশজুড়ে যে প্রবল বিরোধিতার ঝড় উঠেছে, তাতে মনে হয় না কাজটাতে তিনি উঁচু বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসী ও শরণার্থীদের ওপর যেসব বিধিনিষেধ দিয়েছেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে কংগ্রেসে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের অনেকেই বক্তব্য দিয়েছেন। এতে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে তাঁর নিজ রাজনৈতিক দলের মধ্যেই অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

এই অভিমত শুধু ডেমোক্রেটিক সমালোচকদের নয়, তাঁর নিজের দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বেরও। রিপাবলিকান দলের দুই বর্ষীয়ান সিনেটর ম্যাককেইন ও লিন্ডসি গ্রাহাম এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার বদলে আরও সন্ত্রাসী সংগ্রহে আইএসকে সাহায্য করবে।

সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান বব কর্কার বলেছেন, নির্বাহী আদেশটি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। ওহাইওর রিপাবলিকান সিনেটর রব পোর্টম্যান কিঞ্চিৎ পরিহাসের সঙ্গে বলেছেন, ট্রাম্প উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে কঠোর বাছাই (এক্সট্রিম ভেটিং) এর যে নির্বাহী আদেশটি দিয়েছেন, সেটি প্রকাশের আগে মোটেই যথেষ্ট বাছাই করা হয়নি।

হোয়াইট হাউসে বারাক ওবামার আমল শেষে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই বেশ কয়েকটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বিতর্কিত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। এসব নিয়ে তাঁর দলে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার প্রভাবে প্রেসিডেন্টের প্রতি রিপাবলিকান পার্টির বৃহত্তর সমর্থনে ফাটল ধরবে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা মেলেনি।

গত সোমবার পর্যন্ত সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের অন্তত ৩০ জন রিপাবলিকান প্রকাশ্যে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের বিরোধিতা করেছেন। ট্রাম্পের ওই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পর গত শুক্রবার থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০০ জনকে বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা-কর্মীরা এ পরিস্থিতিতে সর্বসম্মত নিন্দা জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সাত দেশ ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ৯০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ১২০ দিনের জন্য সব শরণার্থীর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া স্থগিত হয়ে পড়েছে।

আর দেশটির দরজা সিরীয় শরণার্থীদের জন্য অনির্দিষ্টকাল স্থগিত থাকবে। সিনেটের শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্রেটিক সদস্য চাক শুমার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ট্রাম্পের এই ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ সিদ্ধান্ত মার্কিন ভূখণ্ডে নিঃসঙ্গ চরমপন্থাকেই উৎসাহিত করবে।

সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির রিপাবলিকান সদস্য কোরি গার্ডনার বলেন, নির্বাহী আদেশটির ব্যাপ্তি অনেক বড় এবং এটা সংশোধনের প্রয়োজন আছে। আর তিনি এ বিষয়ে আগে কিছুই জানতেন না।

ওই কমিটির প্রধান সিনেটর বব কর্কারও ওই আদেশের ব্যাপারে আগে থেকে কোনো ইঙ্গিত পাননি বলে জানিয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে যে তিনি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ওই সিদ্ধান্ত প্রকাশ করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিল। এমনকি হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধানের মতো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে সময়মতো জানানো হয়নি।

ট্রাম্পের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত সিনেটর জন ম্যাককেইন গত রোববার এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নির্বাহী আদেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নিজের পায়ে কুড়াল মারার সমতুল্য হতে পারে। দোভাষীদের অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কাজ করছেন। নির্বাহী আদেশের আওতায় তাঁরাও তো যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ পাবেন না।

ইরাকি যেসব নাগরিক অনুবাদক হিসেবে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাজ করেন, তাঁরা বিশেষ অভিবাসন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের ওই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে তাঁরাও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের আসা স্থগিত করে এবং সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে যে নির্বাহী আদেশ ট্রাম্প শুক্রবার জারি করেন, তা নিয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আদেশটি জারি করার আগে তা নিয়ে কোনো সলাপরামর্শ হয়নি।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জন কেলি সম্ভাব্য মুসলিম নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি নিয়ে যখন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করছিলেন, তখন টিভির পর্দায় দেখতে পান, ট্রাম্প নির্বাহী আদেশটি ঘোষণা করছেন।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ম্যাটিস এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত টিলারসনও খবরটি জানতে পেরে বিস্মিত হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কোনো মতবিনিময় করা হয়নি।

এই আদেশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনাটি এসেছে সদ্য চাকরিচ্যুত ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল স্যালি ইয়েটসের কাছ থেকে। ত্রুটিযুক্ত এই আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রবিরোধী—এই যুক্তিতে ইয়েটস তাঁর দপ্তরের আইনজীবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালতে এই আদেশের পক্ষে শুনানিতে অংশ না নিতে।

গত সোমবার তিনি জানিয়েছিলেন, বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ন্যায়বিচার ও সত্যের পথে থাকা। এই নির্বাহী নির্দেশে সেই আদর্শ অনুসৃত হয়নি বলে ইয়েটস জানিয়েছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ইয়েটসকে চাকরিচ্যুত করেন এবং একজন নতুন অস্থায়ী অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিয়োগ দেন।

উল্লেখ্য, ইয়েটস ওবামা আমলে এই দায়িত্বে নিয়োগ পান এবং নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্সের নিয়োগ সিনেটে চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পের অনুরোধে দায়িত্ব পালনে সম্মত হয়েছিলেন। একই দিন ট্রাম্প অভিবাসন নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত বিভাগের অস্থায়ী প্রধান ড্যানিয়েল র্যা গডেলকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রায় দু শ কর্মকর্তা ও কূটনীতিক মুসলিম নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তের প্রতি ‘ভিন্নমত’ প্রকাশ করে একটি খসড়া চিঠি বিলি করেছেন। এই চিঠিতে তাঁরা জানিয়েছেন, মুসলিমদের আগমন নিষিদ্ধ করে সন্ত্রাসী হামলা থেকে মার্কিন নাগরিকদের রক্ষা সম্ভব হবে না; বরং এর ফলে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে মার্কিনবিরোধী মনোভাব আগের চেয়ে তীব্রতর হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ব্যাপারে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই মন্ত্রণালয়ের সদস্যদের ভিন্নমত প্রকাশের জন্য একটি ‘ডিসেন্ট চ্যানেল’ চালু করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ডিসেন্ট চ্যানেল ব্যবহার করেই ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের সদস্যরা পাকিস্তানি গণহত্যায় নিক্সন প্রশাসনে নীরবতার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। গত বছর প্রেসিডেন্ট ওবামার সিরিয়া নীতির প্রতি অসম্মতি জানিয়ে অনুরূপ একটি ‘ভিন্নমতে’ ৫১ জন স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছিলেন।

ট্রাম্পের নতুন অস্থায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল ডানা দেন্তে বলেছেন, তিনি নির্বাহী আদেশটি সমর্থন করে এর পক্ষে সওয়াল জবাবে অংশ নেবেন। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন ফেডারেল আদালতে এই আদেশ অশাসনতান্ত্রিক এই যুক্তিতে তা বাতিলের আবেদনে করে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই আবেদনের ভিত্তিতে দেশের চারটি আদালত আদেশটির বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

ভার্জিনিয়ায় দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই নির্বাহী আদেশের আলোকে কয়েক ডজন গ্রিন কার্ডধারী ব্যক্তির কাছ থেকে তাদের পরিচয়পত্র আটক করা হয়েছে। নিউইয়র্কের আমেরিকান নাগরিক অধিকার ইউনিয়নের পক্ষে অনুরূপ একটি মামলায় একই অভিযোগ তোলা হয়েছে।

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের করা অন্য আরেক মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অভিবাসী ও অনাভিবাসী এমন মুসলিমদের বহিষ্কারের এটি প্রথম পদক্ষেপ।

এদিকে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। গত সোমবার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক বিবৃতিতে এই বিক্ষোভের প্রতি তাঁর সমর্থন জানিয়েছেন।

একজন মুখপাত্রের মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শুধু ধর্মবিশ্বাসের কারণে এক শ্রেণির মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। এই আদেশের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে নাগরিক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, ওবামা তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

ট্রাম্প নিজে দাবি করেছেন, নির্বাহী আদেশের বাস্তবায়ন খুব ভালোভাবেই হচ্ছে। কিন্তু তাঁর সে কথাকে সত্য না বলে বিকল্প সত্য বলাই অধিক সংগত হবে। অধিকাংশ ভাষ্যকার একমত, অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে, চারদিক ভাবনাচিন্তা ছাড়াই ট্রাম্প কাজটি করে ফেলেছেন। নির্দেশটি লেখার দায়িত্বে ছিলেন তাঁর দুই মুখ্য উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন ও স্টিভ মিলার।

ট্রাম্প প্রথম দিন থেকেই কট্টর দক্ষিণপন্থী এই দুই উপদেষ্টার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তাঁর অভিষেকে ট্রাম্প যে প্রবল নেতিবাচক ও জাতীয়তাবাদী ভাষণটি দেন, সেটির লেখকও ছিলেন ব্যানন। তথ্যমাধ্যমকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে প্রতিপন্ন করার যে প্রচার চলছে, তার নেতৃত্বেও রয়েছেন ব্যানন।

দুই সপ্তাহও হয়নি ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু এরই মধ্যে নানা বিতর্কে যেভাবে জড়িয়ে পড়েছেন, তাতে রিপাবলিকান দলের ভেতরেই উদ্বেগ বাড়ছে। সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান, বর্তমানে জনপ্রিয় টিভি হোস্ট জো স্কারবরো বলেছেন, এ পর্যন্ত যে অদক্ষতার প্রমাণ ট্রাম্প ও তাঁর টিম দেখিয়েছে, তা রীতিমতো লজ্জাজনক।

বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টিও ট্রাম্পের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজনৈতিক পত্রিকা পলিটিকো জানিয়েছে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিলের পাশাপাশি তাঁর মন্ত্রিসভার বিতর্কিত সদস্যদের নিয়োগ বিলম্বিত করার সব চেষ্টা ডেমোক্রেটিক পার্টি চালাবে। তারা বিশেষভাবে আগ্রহী সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থী তাদের মনঃপূত না হলে তা আটকাতে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close