ভারত জুড়ে

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী ভারতীয় নভোচারী

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: খুব ধীরে ধীরেই নিজের সাফল্যের কাছে পৌঁছেছিলেন রাকেশ। ২১ বছর বয়সে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। তখন থেকেই শুরু হয় সুপারসনিক জেট ফাইটার নিয়ে আকাশে উড়ে যাওয়ার দিন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ২১টি মিশনে অংশ নিয়েছেন এই বৈমানিক। তখন বয়স ২৩ বছর পার হয়নি। ২৫ বছর বয়সে হলেন টেস্ট পাইলট।

আর ৩৫ বছরে প্রথম ভারতীয় হিসেবে উড়ে গেলেন পৃথিবীর বাইরে, মহাকাশে। এই অভিযানে বিশ্বের ১২৮তম মানুষ তিনি। রাকেশ শর্মা বলেন, মহাশূন্যে যাওয়ার আগে আমি বহুবার আকাশে উড়েছি। তাই সুযোগটা যখন এল, কাজে লাগালাম। এটা ছিল খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার।

যে বছর রাকেশ শর্মা মহাশূন্যে উড়েন, সে বছরটা ভারতের ইতিহাসে বাজে বছরগুলোর একটি। ১৯৮৪ সালেই শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের জন্য পাঞ্জাবে স্বর্ণমন্দিরে আক্রমণ করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। পরে প্রতিশোধ স্বরূপ শিখ দেহরক্ষীর হাতে প্রাণ হারান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

ভারত স্বাধীনের পর দেশটির সবচে ভয়াবহ ধর্মীয় সহিংসতার মধ্যে অন্যতম ছিল এই শিখ-বিরোধী দাঙ্গা। বছর শেষ হওয়ার আগেই ভূপালে রাসায়নিক কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস বেরিয়ে কয়েক হাজার মানুষ মারা যায়। বিশ্বের ভয়াবহতম কারখানা দুর্ঘটনা বলা হয় এটিকে।

রাকেশ শর্মার সবচে বড় কৃতিত্ব ছিল- এমন একটি অস্থিতিশীল মুহূর্তে একটুখানি আশার আলো দেখাতে পেরেছিলেন।

১৯৮৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে আগ মুহূর্তে সোনিয়া গান্ধী মহাকাশে একজন ভারতীয়কে পাঠানোর তোড়জোড় শুরু করেন। তিনি তৎকালীন শক্তিশালী মিত্র এবং মহাকাশ গবেষণায় অগ্রগামী সোভিয়েত ইউনিয়নকে ফোন করে সহায়তা চান। এরপরই রাশিয়া থেকে ভারতীয় প্রার্থীদের তালিকা চাওয়া হয়।

প্রাথমিকভাবে ৫০ জন পাইলটের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করে ভারত। ‘অবরুদ্ধতা ভীতি’ দূর করতে ব্যাঙ্গালোরের একটি কক্ষে কৃত্রিম আলোতে ৭২ ঘণ্টার জন্য আটকে রাখা হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত ৫০ জনের মধ্য থেকে রাশিয়ায় প্রশিক্ষণের জন্য দুইজনকে পাঠানো হয়। এরপর সেখানে এক বছরের প্রশিক্ষণ।

প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে প্রশিক্ষণ নিতে হয় তাকে। এটা করতে গিয়ে দ্রুতই শিখে নিতে হয়েছিল রুশ ভাষা। কারণ প্রশিক্ষণগুলো ছিল তাদের ভাষায়। প্রতিদিন শুধু ভাষা শিক্ষার ক্লাস হতো ছয় থেকে সাত ঘণ্টা। মানে, তিন মাসে রুশ ভাষায় রীতিমতো একটা মাস্টার্স ডিগ্রি নিতে হয়েছিল তাকে। খাবারের ব্যাপারে ছিল প্রশিক্ষণ। দিনে ৩ হাজার ২০০ ক্যালোরি খাবার গ্রহণ করতে হতো তাকে। শক্তি, গতি, সহিষ্ণুতা পরীক্ষার জন্য থাকতো অলিম্পিকের প্রশিক্ষকরা।

প্রশিক্ষণের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে তাকে জানানো হয়, তিনি মহাকাশে যাওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছেন। অন্যজনকে চাকরিতে ফিরে যেতে হবে। রাকেশ বলেন, এটা শুধু বড় একটি কাজই ছিল না, যথেষ্ট কঠিনও ছিল।

তার সম্পর্কে ভারতীয় বিজ্ঞান লেখক পল্লব বাগলা লিখেছেন, তিনি এমন একটি দেশ থেকে এসেছেন, যে দেশের নিজস্ব কোনো মহাকাশ কর্মসূচি নেই। মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্নও তিনি দেখেননি।

কিন্তু সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি পরিবেশে ভ্রমণ করেছেন, প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করেছেন, একটি নতুন ভাষা শিখেছেন এবং কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি প্রকৃতই একজন বীর।

৩ এপ্রিল একটি সোভিয়েত রকেটে চড়ে দুই রুশ মহাকাশচারী ইউরি মালিশেভ (৪২) এবং গেন্নাদি স্ত্রেকালভের (৪৩) সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ কাজাখস্তান থেকে উড়ে যান মহাশূন্যে।

১৯৬১ সালে চাঁদের কক্ষপথে ভ্রমণ করেছিলেন মার্কিন নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন। এরপর গেছেন আরো ৫০০ জনের মতো। সৌভাগ্যবানদের সেই তালিকায় আছেন রাকেশ শর্মা। একে ভারত-সোভিয়েত সম্পর্কের উচ্চতম নিদর্শন হিসেবে আখ্যা দিতে শুরু করে গণমাধ্যমগুলো। এ নিয়ে রাকেশের মায়ের সাক্ষাৎকারও ছাপে রুশ বার্তাসংস্থা তাস।

মহাশূন্যে যাওয়ার পর তার স্কুলশিক্ষক মায়ের রাশিয়ার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বলে সংবাদ প্রচার করে তারা। ‘দ্য মিশন’ লিখেছিল, বৈজ্ঞানিকভাবে শুরু হলেও রাকেশের মহাকাশ ভ্রমণ শেষ হলো রাজনৈতিকভাবে।’

এর আট মাসের মধ্যেই খুন হন ইন্দিরা গান্ধী। মা খুনের শোককে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন ছেলে রাজিব গান্ধী। মহাশূন্যে আটদিন অবস্থান রাকেশ। টিভির ছবিতে দেখা যায় তাদের তিনজনের মহাকাশে ভেসে বেড়ানোর ছবি।

সেখানে গিয়ে প্রথম যোগ ব্যায়ামের চর্চাটা কিন্তু ভারতীয় এই নভোচারীই করেছিলেন। মহাকাশে যোগ ব্যায়াম! সেখান থেকে মায়ের সঙ্গে সরাসরি কথাও বলেছিলেন তিনি, মস্কো অডিটরিয়ামে আড়াই হাজার মানুষের উপস্থিতিতে।

কথা বলার সময় ইন্দিরা গান্ধী যখন রাকেশ শর্মাকে জিজ্ঞেস করেন, মহাকাশ থেকে ভারতকে কেমন দেখায়? উত্তরে বিখ্যাত একটি উত্তর দিয়েছিলেন তিনি, যা আজো টুইটারে ভাইরাল হয়।

পাকিস্তানের জাতীয় কবি আল্লামা ইকবালের লেখা দেশাত্মবোধক গান আবৃত্তি করে রাকেশ বলেন- সারে জাহা ছে আচ্ছা (বিশ্বের মধ্যে সবচে সুন্দর)। প্রতিদিনই স্কুলে জাতীয় সঙ্গীতের পর এই গানটি গাইতে হতো তাকে। রাকেশ বলেন, মহাকাশ থেকে ভারতকে বৈচিত্র্যময় দেখায়।

সেখান থেকে আপনি ভারতের বিশাল উপকূল রেখা দেখবেন, বন দেখবেন, নদী, মরুভূমির সোনালী বালুও দেখবেন। হিমালয় সেখান থেকে বেগুনী দেখায়। কারণ ওই উপত্যকায় রোদের আলো পড়ে না।

এই ৩০ বছরে মহাকাশে আর কোনো নভোচারী পাঠায়নি ভারত। অবশ্য ভারতীয়-মার্কিন হিসেবে এর কয়েক দশক পরে মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন কল্পনা চাওলা। ওই অভিযানের পর আবার জেট ফাইটারের পাইলটের পদে ফিরে আসতে হয়েছিল রাকেশকে। বছর আটেক আগে সবকিছু থেকে অবসর নিয়েছেন এই নভোচারী। এখন নিজের স্বপ্নের একটি বাড়িতে সময় কাটে তার।

আবার মহাকাশে যেতে চান কি না- এমন প্রশ্নে রাকেশ বলেন, ‘আমি যেতে চাই। কিন্তু এখন শুধু একজন দর্শনার্থী হিসেবেই যেতে চাই। আমি সেখানে অনেক কাজ করেছি।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close