ফিচার

বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্মাণ: জঙ্গিবাদ ও ধান্দাবাজি দমন জরুরি

সর্বজনবিদিত যে, বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বাড়ছে, সম্ভাব্য গড় আয়ু ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে, দারিদ্র্যের প্রকোপ অনেক কমেছে এবং অব্যাহতভাবে কমছে, সামাজিক অন্যান্য কয়েকটি সূচকে ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে এবং মানুষের মধ্যে ভবিষ্যত্ নিয়ে আশাবাদ বাড়ছে।

মোটকথা এখন উন্নতির পরবর্তী ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য বাংলাদেশে পারিপার্শ্বিকতা তৈরি হয়েছে। তবে একটি বিমান যখন উড্ডয়নের জন্য তৈরি হয় তখন এর উল্লম্ফন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তবেই বিমানটি নির্বিঘ্নে নির্ধারিত উচ্চতায় উঠে গন্তব্যের দিকে উড়ে চলে।

অর্থনীতির ধাপ থেকে ধাপে উন্নীত হওয়া এবং গতিশীল অগ্রযাত্রার জন্য উন্নয়নের যাত্রাপথকে সুগম করার জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। ইতিবাচক দিকগুলোকে আরো শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হয় এবং নেতিবাচক দিকগুলোকে দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হয়। এই লেখায় বাংলাদেশের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর কথা বলতে চাই।

একটি হলো জঙ্গিবাদ। সুস্থ সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিতকরণে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা জরুরি। বাংলাদেশে বর্তমানে ঘটমান সমাজবিরোধী এবং মানবতাবিরোধী জঙ্গি কর্মকাণ্ড শক্ত হাতে দমন করা অপরিহার্য এবং আগামীতে যেন এ রকম ঘটনার সম্মুখীন হতে না হয় সেই লক্ষ্যে এসব কর্মকাণ্ডের মূলোত্পাটনে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

যে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র স্বাধীনতার স্বপ্নকে নস্যাত্ করতে চেয়েছিল, তারা ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে স্বৈরশাসনামলে তবে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পরও, ব্যাপক অর্থনৈতিক অস্ত্র ও জনশক্তি সঞ্চয় করে। তাই বিগত দশকগুলোতে সময়ে সময়ে তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতাকল্পে তারা সময়ে সময়ে রাহাজানি, হত্যা, জ্বালাও-পোড়াওসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত করেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচন উপলক্ষে তারা ব্যাপক তাণ্ডব ঘটায়।

এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেন বিলুপ্ত হয় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র-ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ যেন গড়ে উঠতে না পারে সেই লক্ষ্যে তারা ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং সম্প্রতি অন্যান্য বিষয়ে পড়ুয়াদেরও আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে এবং দেখা যায় অনেকখানি কৃতকার্যও হয়েছে।

অনেক তরুণের দারিদ্র্য এবং নানা কারণে সামাজিক ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গিরা তাদেরকে বিপথগামী করেছে এবং আরো অনেককে সেপথে নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত আছে।

অতিসম্প্রতি যে কয়েকটি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। সপ্তাহ তিনেক আগে (১৫ মার্চ) চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দুটি জঙ্গি আস্তানা চিহ্নিত করে উত্খাত করা হয়। প্রায় ঐসময়ে ঢাকার আশকোনায় র্যাবের ব্যারাকে আত্মঘাতী হামলা (১৭ মার্চ) চালায় এক জঙ্গি। অন্য কেউ হতাহত হয়নি।

এদিকে ঢাকার বিমানবন্দরের কাছে পুলিশ ফাঁড়ির কাছে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ (২৪ মার্চ) ঘটানো হয় এবং ঐ জঙ্গি নিহত হয়। তারপর সিলেটের শিববাড়ির আতিয়া মহলে অবস্থানরত সন্ত্রাসীদের উত্খাত সমাপ্ত হওয়ার (২৩-২৭ মার্চ) রেশ যেতে না যেতেই মৌলভীবাজারের বড়হাট ও নাসিরাবাদে দু’টি বাড়িতে সন্ত্রাসীদের অবস্থানের সন্ধান পাওয়া যায় এবং তাদেরকে দমন করা হয় (২৯ মার্চ-২ এপ্রিল)।

এছাড়া কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার একটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মেলে এবং সেখানে অভিযান চালানো হয় (২৯-৩১ মার্চ)। কোনো জঙ্গি পাওয়া যায়নি তবে তাদের রেখে যাওয়া বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি পাওয়া গেছে। দোহারে জঙ্গি সন্দেহে ২৯ মার্চ কয়েকজনকে আটক করা হয়।

দেখা যাচ্ছে, বিগত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটার পর একটা জঙ্গি তত্পরতা ঘটেছে। তেমন বড় না হলেও এ সমস্ত ঘটনা অব্যাহত থাকলে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে এবং ধারণা করি সে কাজটি করাই তাদের উদ্দেশ্য। নিশ্চয়ই যারা এসব কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে তাদের পেছনে অন্যান্য শক্তি রয়েছে।

তবে খুবই আশ্বস্ততার বিষয় যে, এই তত্পরতাগুলো প্রায় সবক্ষেত্রেই কোনো বা তেমন কোনো ক্ষতিসাধন করার আগেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অর্থাত্ পুলিশ ও র্যাব সেগুলোকে চিহ্নিত করতে পারছে এবং নিজেরাই বা প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে খুবই প্রশংসনীয়ভাবে তা দমন করা যাচ্ছে।

বিশেষ করে গুলশানের হলি আর্টিজানে হত্যাযজ্ঞের (১-২ জুলাই ২০১৬) পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসীদের আস্তানার খোঁজ দ্রুত সংগ্রহ করছে এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

অবশ্য নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিভিন্ন উন্নত দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে ঘটছে। সার্বিক বিবেচনায় সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রশংসার দাবি রাখে। তবে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। সন্ত্রাসীরা যে প্রকাশ্যে বা চোরাগোপ্তা তত্পরতা চালানোর চেষ্টা করবে আগামীতে তা ধরে নেওয়া যায়।

সেগুলো আগেভাগে চিহ্নিতকরণ এবং দমনের কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে, বাস্তবতার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ক্রম-উন্নত পর্যায়ের প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অগ্রসর প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে পাশাপাশি, কেন এই ঘটনাগুলো ঘটছে, কারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে অর্থাত্ মূল হোতা কে বা কারা তা খুঁজে বের করা এবং দমন করা খুবই জরুরি। এটিই বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মূলোত্পাটন করার পথ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব জোরালোভাবে মা-বাবা ও শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চলেছেন যে, তাদের সন্তান ও ছাত্র-ছাত্রীরা যেন জঙ্গিবাদের পথে না যায় সেদিকে তারা যেন কড়া নজর রাখেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। দেশের সর্বত্র এরকম সচেতনতা সৃষ্টিতে সকল সুনাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে।

এক্ষেত্রে জঙ্গিরা ইসলামের যে বিকৃত ব্যাখ্যা দিচ্ছে তা যে শুধু ভুল তা নয় বরং উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইসলামের অপব্যাখ্যার বিষয়টি উদাহরণসহ ব্যাপকভাবে সম্প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি সঠিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যাতে সকলের মধ্যে প্রোথিত হতে পারে সে লক্ষ্যেও প্রচারণা চালাতে হবে, বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণদের উদ্দেশ্যে।

এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সম্মিলিত নাগরিক সমাজ এই কাজটি করার চেষ্টা করছে। নৈরাজ্যবাদ অবশ্যই ঘৃণ্য। মানুষের অন্তর্নিহিত মানবিকতার ওপর আস্থা রাখতে চাই। যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্বে আছেন, সুস্থ সমাজ সৃষ্টির লক্ষ্যে সঠিক পারিপার্শ্বিকতা তৈরি করতে তাদেরকে জোরালোভাবে সচেষ্ট হতে হবে।

যারা বিপথগামী এবং যারা বিপথগামিতা ছড়াতে সচেষ্ট তাদেরকে পরাজিত করতে হবে। একই সঙ্গে ন্যায়ের পথ, সাম্যের পথ, সুস্থ সমাজ রচনার পথ যেন প্রসারিত হয়, গতিশীল হয় এবং শক্তিশালী হয় সেই লক্ষ্যে সুস্থ চিন্তার সকলকে যার যার অবস্থান থেকে এবং সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে সচেষ্ট হতে হবে।

এই লক্ষ্যে সমাজের সকল পর্যায়ে সম্মিলিত কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘সম্মিলিত নাগরিক সমাজ’ সুযোগ তৈরি করতে সচেষ্ট রয়েছে। অন্য বিষয়টি হচ্ছে ধান্দাবাজি। দেশের আর্থ-সামাজিক বিভিন্নখাতে নানা ধান্দাবাজি চলছে। উদাহরণস্বরূপ ব্যাংকিং খাতকে বিবেচনায় নেওয়া যায়। সরকারি ব্যাংকগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও খেলাপিঋণ ব্যাপক এবং বাড়ছে।

কিছু কিছু ব্যক্তি দুর্নীতি করে ব্যাংকিং খাত থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করার পর চিহ্নিত হলেও এবং অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়নি। সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি এবং বেসিক ব্যাংকের ব্যাপক অর্থ চুরির বিষয়টি সবারই জানা।

কিন্তু মূল হোতাদের বিচারের সম্মুখীন করা এখনো হয়নি। এরা বা এদের মতো বড় দুর্নীতিবাজ ও আত্মসাত্কারীদের বিচারের সম্মুখীন না করা হলে অন্য অনেকে এই পথে যেতে উত্সাহিত হতেই পারে। এগুলো ছাড়াও যোগসাজশের মাধ্যমে আরো অনেক অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চুরি করা হয়েছে বা ফেরত পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির মূল আর্থিক চালিকা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য সঞ্চয় সম্প্রসারিত হয় এবং বিনিয়োগে অর্থায়ন করা হয়। যদি লেনদেন স্বচ্ছ না হয় এবং এই ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত না হয় তাহলে উপযোগী কর্মকাণ্ডে অর্থ সরবরাহ কমে যায়।

সেসঙ্গে নানা অপকর্মকাণ্ডে বা পরিকল্পিত দুর্নীতিতে অনেক অর্থ চলে যায় এবং যাচ্ছে। এসব ধান্দাবাজি দমন করা জরুরি। ব্যাংকিং খাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এখানে দুর্নীতিবাজ ও আত্মসাত্কারীদেরকে দ্রুত বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায়, অর্থাত্ প্রত্যেক ব্যাংকে এবং সার্বিকভাবে খাতটিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই প্রস্তাব খাটে অর্থনীতি ও সমাজের যেখানে যেখানে ধান্দাবাজি চলছে সবখানেই।

লেখক: কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, অর্থনীতিবিদ

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close