অন্য পত্রিকা থেকে

পাল্টে গেছেন ট্রাম্প

নাজমুল আহসান: ক্ষমতারোহণের পর তিন মাসও পেরোয়নি। এখনই বদলে যাওয়ার সুর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে। তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ শিবিরের প্রার্থী হিসেবে। তার উত্থানে ইউরোপের ডানপন্থি রাজনীতিতে জোয়ার আসে।

বিশ্বায়নের দরুন কর্মসংস্থান হারিয়েছে পশ্চিমের অনেক মানুষ। উৎপাদনমুখী সব কর্মসংস্থান চলে গেছে চীনসহ সস্তা শ্রমের দেশগুলোয়। সাবেক নেতাদের বাধানো যুদ্ধে অনর্থক ব্যয় হয়েছে রাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার। সব টাকা পকেটে গেছে অস্ত্রনির্মাতাদের। অথচ দেশের অবকাঠামো ধুঁকছে।

যেই জঙ্গিবাদ তাড়াতে বিদেশের মাটিতে হামলা চালিয়েছে পশ্চিমারা, সেই জঙ্গিবাদ নির্মূল হওয়া তো দূরে থাক নিজ দোরগোড়ায় হাজির। সঙ্গে যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে লাখো শরণার্থী গিয়ে পৌঁছেছে ওই পশ্চিমে। সব মিলিয়ে ভোটাররা ভেবেছে, প্রচলিত ক্ষমতাব্যবস্থা নিজেদের স্বার্থে সব পকেটে পুরেছে।

কিন্তু ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। এই ‘লিবারেল’ বিশ্বব্যবস্থা কিছু মানুষকে প্রচণ্ড বিত্তবৈভবের মালিক করেছে বটে। বহু সাধারণ মানুষকে পেছনে ফেলে রেখেছে। তাই এ ক্ষমতাব্যবস্থা-বিরোধী মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মানুষ লুফে নিয়েছে।

তার ব্যক্তিগত জীবনাচরণ তার সমর্থকদের মাথা ব্যথার কারণ নয় একটুও। তার অকপট মিথ্যেগুলোও বড় বিষয় নয়। তার কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনা, যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা, অভিবাসন হ্রাস ও অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো- এ ছিল ট্রাম্পের কাছে তাদের প্রত্যাশা।

এসব প্রত্যাশা কতটুকু ঠিক, কতটুকু আখেরে যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বের জন্য ভালো বা মন্দ- সেটি ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু সেই ট্রাম্প কী পাল্টে গেছেন। পশ্চিমের সামরিক সক্ষমতার অন্যতম স্তম্ভ হলো ন্যাটো। এই প্রকাণ্ড সামরিক জোটের কড়া সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা রাখার বদলে সমঝোতার পক্ষে ছিলেন। বলেছেন, নিজের শাসনামলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবেন।

সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে হটানোর বদলে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস-কে নির্মূলের ওপর গুরুত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আসাদ সন্ত্রাসীদের মারছে। তাকে মারাটা সন্ত্রাসীদের হাত শক্তিশালী করার শামিল। তার এসব বক্তব্যে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছে পশ্চিমের ক্ষমতাশালীরা।

কিন্তু ট্রাম্প আটকা পড়ে গেছেন রাশিয়া স্ক্যান্ডালে। তার অনেক পরামর্শকের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল মাইক ফ্লিনকে পদত্যাগও করতে হয়েছে। খোদ তাকে জেতাতে রাশিয়া কাজ করেছে এমন অভিযোগ রয়েছে বেশ জোরেসোরে।

তার সাবেক নির্বাচনী প্রচারাভিযান প্রধানের সঙ্গে রাশিয়া গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক থাকার অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই বলছে, এ সংক্রান্ত প্রমাণ তাদের হাতে আছে। তদন্ত চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই) সহ কংগ্রেসের একাধিক কমিটি।

এমন চাপে যখন কোনঠাসা ট্রাম্প, তখন তার অন্দরমহলে প্রভাব কমছে সাবেক ঘনিষ্ঠদের। প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের প্রভাব কমেছে। তাকে সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। দ্বন্দ্ব চরমে তার আরেক পরামর্শক ও মেয়ে জামাই জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে। আরেক পরামর্শক কেলিয়ান কনওয়েকে ট্রাম্পের বহু নীতির পক্ষে টিভিতে সাফাই গাইতে দেখা যেত। কিন্তু বিভিন্ন বিতর্কে জেরবার কনওয়ে টিভির পর্দা থেকে অনুপস্থিত।

আর এই যখন অবস্থা, তখন সিরিয়ার মার্কিন সমর্থিত বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় রাসায়নিক হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। মার্কিনিদের দাবি, এ হামলা চালিয়েছে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকারি বাহিনী। দুয়েক দিন পরই ট্রাম্প নির্দেশ দিলেন আসাদ বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে।

এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও আসাদের ওপর হামলা চালাননি। অথচ, যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে জড়িয়ে পড়লেন সিরিয়ার যুদ্ধে। তার এই পদক্ষেপে তার সমর্থকরা দৃশ্যত ক্ষুব্ধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

শুধু তা-ই নয়। এশিয়া ও ইউরোপের মিত্রদের তিনি সাহায্য প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছিলেন, সুরক্ষার বিনিময়ে অর্থ দাবি করেছিলেন। অথচ, এখন সেই গড়পড়তা প্রেসিডেন্টের মতোই মিত্রদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করছেন। এমনকি মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে কোরিয়ান উপদ্বীপে যুদ্ধের দামামা সৃষ্টি করেছেন তিনি। তার কোনো পূর্বসূরিও এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানে ছিলেন না।

চীনের কাছ থেকে কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার পণ করেছিলেন। অথচ, সফররত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে মধুর আচরণ করলেন। চীনকে নিজের প্রচারাভিযানের ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’ বানিয়েছিলেন। কিন্তু পূর্বের সেই বাগাড়ম্বরের কোনো চিহ্ন এখন পাওয়া যায় না।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা থাক, আরও ভয়াবহ হয়েছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে বাজে অবস্থায় রয়েছে। আগে যেখানে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কথা বলতেন, এখন বলছেন, এ সম্পর্ক ভালো হতেও পারে, না-ও হতে পারে, উল্টোটাও হতে পারে।

যে-ই ন্যাটোকে তিনি বলেছেন সেকেলে ও ব্যয়বহুল, সে-ই ন্যাটোর প্রতি তিনি অন্যান্য প্রেসিডেন্টের মতোই সহায়তার অঙ্গীকার করছেন। গতকালই আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বলেছেন, ন্যাটো আমেরিকার জন্য জরুরি।

তাহলে কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট’ ভাবমূর্তির অবসান ঘটছে? তিনি কি তার পূর্বসূরিদের পথই বেছে নিলেন? মার্কিন আধিপত্যবাদ কি তারও পাথেয়? এখনও সময় আসেনি কিছু বলার। কারণ, এক অবস্থানে বেশি দিন থাকা ট্রাম্পের পছন্দ নয়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close