Americaযুক্তরাষ্ট্র জুড়ে

এফবিআই প্রধানকে বরখাস্ত করলেন ট্রাম্প: বিস্মিত ওয়াশিংটন

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক জেমস কমি’কে বরখাস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

জেমস কমির ডেপুটি অ্যানডু ম্যাকাবে’কে করা হয়েছে এফবিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক। হোয়াইট হাউজ বলেছে, স্থায়ী ভিত্তিতে একজন পরিচালক খুঁজে বের করার কাজ শুরু হবে অবিলম্বে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন এ সিদ্ধান্ত নেন তখন জেমস কমি লস অ্যানজেলেস সফরে ছিলেন।

উদ্ভট বিষয় হলো, তাকে বরখাস্তের চিঠিটি এফবিআইয়ের কাছে ডেলিভারি দেয়া হয় কিথ শিলারের মাধ্যমে। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সশস্ত্র দেহরক্ষী। বর্তমানে তিনি হোয়াইট হাউজে অভাল অফিস অপারেশন বিষয়ক পরিচালক।

প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে সেখানে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়া কানেকশনের জন্য এফবিআই যে তদন্ত করছে তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেমস কমি। কিন্তু তাকে বরখাস্তের বিষয়ে ট্রাম্প বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ডেমোক্রেট দলের হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল স্ক্যান্ডাল হ্যান্ডেলিংয়ের তদন্তের বিষয়ে বরখাস্ত করা হয়েছে জেমস কমিকে।

তিনি গত সপ্তাহে কংগ্রেসের কাছে দেয়া বক্তব্যে ত্রুটিপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে খবর বের হয়। কমির উদ্দেশ্যে লেখা এক চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, বিচার বিভাগের সাথে তিনি একমত যে মি. কমি এফবিআইকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম নন এবং সেখানে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন।

ওই চিঠিতে ট্রাম্প আরো জানিয়েছেন, আপনি (কমি) আমাকে আলাদাভাবে তিনবার জানিয়েছেন যে, আমি তদন্তের অধীনে নেই। এ জন্য আমি আপনার ভীষণ প্রশংসা করি। তা সত্ত্বেও আমি আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একমত যে, ব্যুরোকে কার্যকরভাবে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা আপনার নেই। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, অনলাইন বিবিসি।

ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপে বিস্মিত ওয়াশিংটন। এতে ডেমোক্রেট, রিপাবলিকান ও অন্যদের মধ্যে সংশয় দেয়া দিয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার জড়িত থাকার বিষয়ে এফবিআইয়ের তদন্তকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছে হোয়াইট হাউজ। ১৯৭৩ সালের ‘সাটারডে নাইট ম্যাসাকার’-এর সঙ্গে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে তুলনা করেছেন অনেক ডেমোক্রেট নেতা।

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে যখন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির তদন্ত হচ্ছিল তখন একজন বিশেষ নিরপেক্ষ প্রসিকিউটরকে বরখাস্ত করেছিলেন তখনকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। সেই ঘটনার সঙ্গে জেমস কমি’কে বরখাস্তের ঘটনা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিনেটে ডেমোক্রেট নেতা চাক শুমার বলেছেন, এ নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি প্রেসিডেন্টকে বলেছেন কমি’কে বরখাস্ত করে তিনি অনেক বড় ভুল করেছেন। তার এমন মন্তব্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো উত্তর দেন নি বলে দাবি করেছেন চাক শুমার। অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়া কানেকশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ট্রাম্প এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউজ এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তারা বলেছে, এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোন উদ্দেশ্য জড়িত নেই। কিন্তু চাক শুমার বলেছেন, নির্বাচনে মস্কোর যে ভূমিকা ছিল তার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই মার্কিন জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরবে। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দু’সপ্তাহেরও আগে ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ের ইমেইল তদন্তের ঘোষণা দেন এফবিআই প্রধান জেমস কমি।

যদিও ওই তদন্তে কোন আপত্তিকর কিছু পাওয়া যায় নি, তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন হিলারির ক্ষতি যা করার তা করে দিয়েছেন জেমস কমি। তার কারণে ও রাশিয়ার নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কারণে নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন হিলারি। নির্বাচন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্প টিমের যোগসূত্র থাকা নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি। এ অভিযোগে বরখাস্ত করা হয় ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল ফ্লিনকে।

তারপর আস্তে আস্তে ট্রাম্প টিমের অনেকের নাম বেরিয়ে আসতে থাকে। ফলে ট্রাম্পের রাশিয়া কানেকশন নিয়ে তদন্তে নামে এফবিআই। এখন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সেই তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে জেমস কমি’কে সরিয়ে দেয়া হয়ে থাকতে পারে। যে সময়ে জেমস কমি’কে ওই পদ থেকে বরখাস্ত করা হলো তা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়।

একে ট্রাবলড টাইম হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান দলের সিনেটর রিচার্ড বারও এই বরখাস্তের সময় নিয়ে অসন্তুষ্ট (ট্রাবলড)। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়ে সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটিও নিজেদের মতো করে তদন্ত করছে।

ফলে রিচার্ড বার বলেছেন, তাকে (কমি) বরখাস্ত করা আমার মনে হয় ব্যুরো (এফবিআই) ও জাতির জন্য একটি বড় ক্ষতি। রিপাবলিকান দল থেকে ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সাবেক ডেপুটি এটর্নি জেনারেল ডনাল্ড আয়ার এফবিআই প্রধান জেমস কমি’কে বরখাস্তের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে প্রশাসন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে তা লজ্জাজনক।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানুয়ারিতে একটি রিপোর্ট দেয়। তাতে বলা হয়, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে বিঘিœত করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। তার উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পকে বিজয়ী হতে সাহায্য করা ও হিলারিকে পরাজিত করা।

বলা হয়েছিল, তিনি হিলারি ক্লিনটনের ওপর প্রতিশোধ নিতে এমনটা করেছেন। অনলাইন সিএনএন মঙ্গলবার রাতে রিপোর্ট করেছে যে, রাশিয়া কানেকশনে বরখাস্ত সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনকে ফেডারেল প্রসিকিউটররা সমন পাঠিয়েছে। তাতে তার রেকর্ড দেখতে চাওয়া হয়েছে। এটা নির্বাচনের রাশিয়ার হস্তক্ষেপের তদন্তের অংশ।

সাবেক এটর্নি জেনারেল স্যালি ইয়েটস সোমবার সিনেট প্যানেলের কাছে বলেছেন, তিনি ২৬ শে জানুয়ারি হোয়াইট হাউজকে অবহিত করেছিলেন ফ্লিনের বিষয়ে। তিনি বলেছিলেন, মস্কোর ব্লাকমেইলিংয়ের ঝুঁকিতে রয়েছেন মাইকেল ফ্লিন।

কারণ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলায়েকের সঙ্গে গোপন আলোচনার বিষয়ে মিথ্যা কথা বলেছেন। ওই ঘটনার ১৮ দিন পরে মাইকেল ফ্লিনকে বরখাস্ত করেছিলেন ট্রাম্প। স্যালি ইয়েটসের এসব বক্তব্যের একদিন পরেই এবার জেমস কমি’কে বরখাস্ত করলেন ট্রাম্প। ওদিকে রাশিয়া বার বারই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনেরও অবস্থান এক।

জেমস কমিকে বরখাস্তের পর হোয়াইট হাউজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি চিঠি প্রকাশ করেছে। এ চিঠিটি তিনি লিখেছেন জেমস কমিকে।

তাতে ট্রাম্প বলেছেন, এটা বলা জরুরি যে, আমরা এফবিআইয়ের জন্য নতুন নেতৃত্ব খুঁজে পেয়েছি। যার মাধ্যমে এ সংস্থার ওপর জন-আস্থা ও এর গুরুত্বপূর্ণ আইনী মিশনে বিশ্বাস ফিরে আসবে।

এতে তিনি আরো বলেছেন, জেমস কমি আর এফবিআইয়ে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারছেন না বলে এটর্নি জেনারেল জেফ সেশনস সুপারিশ করেছেন। তা গ্রহণ করেছেন ট্রাম্প।

তবে এ নিয়ে যে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে তাতে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলেছেন, এফবিআই পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল রড রোজেনস্টেইন।

তিনি উপসংহারে বলেছেন, কমির ওপর তার আস্থা হারিয়ে গেছে। তার এই সুপারিশ পাঠানো হয় জেফ সেশনের কাছে। তিনি সেই সুপারিশ অনুমোদন করে পাঠিয়ে দেন ট্রাম্পের কাছে। ট্রাম্প তা গ্রহণ করেন মঙ্গলবার।

উল্লেখ্য, কমি’র মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। তাকে ২০১৩ সালে ওই পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন ডেমোক্রেটিক দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close