জাতীয়

কূটনীতিকদের মনের ভয় এখনো দূর হয়নি

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গি হামলার ১০ মাস অতিবাহিত হলেও বিদেশি নাগরিক ও কূটনীতিকরা এখনও নিরাপত্তা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নন। তবে তারা সতর্ক।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করেন। অবস্থা বুঝে দৈনন্দিন রুটিনে কাটছাঁট করেন। নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় রেখে বাইরে কোথাও যাওয়া বা না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হলি আর্টিজানের হামলার মতো ভয়াবহ আক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে কূটনীতিকরা নিজেরাই নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত মিখায়েল হেমনিটি উইন্টার।

রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সরকারি উদ্যোগ এবং কূটনীতিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেন। ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ-ডিকাব ওই মতবিনিময়ের (ডিকাব টক) আয়োজন করে।

সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জোটের সদস্য রাষ্ট্রের ওই প্রতিনিধি বলেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর সরকার যে সব পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে আমরা (কূটনীতিকরা) খুশি। ওই ঘটনায় যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা থেকে মুক্তি মিলেছে। এটি স্বস্তিদায়ক।

তবে বিদেশি কূটনীতিকদের মনের ভয় দূর হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এখনো নিরাপত্তা ঝুঁকি অনুভব করি। এ জন্য চলাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন করি। হলি আর্টিজানের হামলার এক মাসের মাথায় ব্যাংকক মিশন সম্পন্ন করে ঢাকায় আসা জ্যেষ্ঠ ওই কূটনীতিক বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, আমার নিজের দেশেও জঙ্গি আক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্বের ১৪০টি দেশ কমবেশি জঙ্গি হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে প্রত্যেকটি দেশের ঝুঁকির মাত্রা আলাদা। যে দেশের গোয়েন্দা কার্যক্রম যত ভালো সেখানে ঝুঁকি তত কম।

রোহিঙ্গা, রামপাল ও ডেনিশ বিনিয়োগ নিয়ে যা বললেন: এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা ‘ডিকাব টক’ শীর্ষক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকট, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে ডেনিশ বিনিয়োগসহ সম-সাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে রাষ্ট্রদূত মিখায়েল কথা বলেন।

রোহিঙ্গা সংকটকে একটি জটিল বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ডেনমার্ক কেউই এর সমাধান দিতে পারবে না। আন্তর্জাতিক নীতি মেনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকেই এর কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের অবস্থা সম্পর্কে মিখায়েল উইন্টার বলেন, সেখানে মানুষ মারা যাচ্ছে। আমরা তাদের মানবিক সহায়তা দিচ্ছি।

রামপাল প্রকল্পকে বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এ নিয়ে আরো স্টাডি হওয়া প্রয়োজন। এটি পরিবেশের ওপর কি প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া জরুরি। ওই প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বা দেশটির জনগণ কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সে সম্পর্কে একজন বিদেশি হিসেবে আমাদের খুব বেশি কথা বলা সমীচীন হবে না।

তবে আমরা মনে করি, এ অবস্থায় পরিবেশের ওপর প্রভাব সম্পর্কিত যত বেশি স্টাডি করা যায় ততোই ভালো। বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমলাতন্ত্র, দুর্নীতি এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিগুলোর দ্রুত পরিবর্তনই আমার কাছে বড় বাধা মনে হয়।

তবে এটি সব সময় নয়, বা সর্বাবস্থায় পরিস্থিতি এক নয়। আমরা এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে নিয়মিত কনসালটেশন বা আলোচনায় রয়েছি। বাংলাদেশে ৭০ এর বেশি ডেনিশ কোম্পানির সরাসরি কিংবা যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যান্য প্রসঙ্গ: ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া ডেনমার্ক রাষ্ট্রদূত ঢাকা-কোপেনহেগেন বর্তমান সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করেন। মতবিনিময় অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তৃতাতেই তিনি চার দশকে বাংলাদেশের দৃশ্যমান উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসাও করেন।

১৯৭২ সালেই ঢাকায় দূতাবাস খোলে ডেনমার্ক। বাংলাদেশ অবশ্য কয়েক বছর আগে দেশটিতে দূতাবাস খোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সমপ্রতি এর কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে অতি সমপ্রতি দুই দেশের মধ্যে তিনবছর মেয়াদি কৌশলগত সহায়তা চুক্তি এবং পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন সহযোগিতা চুক্তি সই হয়েছে। ক’মাস আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ডেনমার্ক সফর করেছেন। তার সফরে দুই দেশ সবুজ প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়।

দারিদ্র্য নিরসন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ উলেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে মন্তব্য করে রাষ্ট্রদূত বলেন, অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ডেনমার্ক বাংলাদেশে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, কৃষি, মানবাধিকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

ডেনমার্কে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ভোগ করায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশটিতে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হলেও ওষুধ, সিরামিক পণ্য এবং চামড়াপণ্য রপ্তানির বাজারও খোঁজা হচ্ছে।

মতবিনিময়ে রাষ্ট্রদূত মিখায়েল জানান, বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যেসব খাতের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, তাতে উন্নয়ন সহযোগিতা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ডেনমার্কের। সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনে ডেনমার্কের অভিজ্ঞতার কথাও জানান তিনি। বলেন, এ বিষয়ে ডেনমার্কের দক্ষতা বিশ্বজুড়েই স্বীকৃত।

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আমরা ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার শুরুর লক্ষ্য নিয়েছি। ডিকাব সভাপতি রেজাউল করিম লোটাসের সভাপতিত্বে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পান্থ রহমান স্বাগত বক্তৃতা করেন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close