অর্থনীতি

ইসলামী ব্যাংক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে: চলছে লুটতরাজ

অর্থনীতি ডেস্ক: বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

বিভিন্ন নামে সাতটি প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে ১৪ শতাংশের বেশি শেয়ার কিনে ইতিমধ্যেই ব্যাংকটির মালিক বনে গেছে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি শিল্পগ্রুপ। প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গ্রুপটি ঋণ বাবদ তুলে নিয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

লুটপাট আর সিমাহীন অনিয়মের কারণে ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদে দেখা দিয়েছে চরম দ্বন্ধ। এরই ধারবাহিকতায় মঙ্গলবার পদ হারিয়েছেন ব্যাংটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আহসানুল আলম।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের শুরু থেকেই ইসলামী ব্যাংকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে এস আলম গ্রুপ। সাত মাসে প্লাটিনাম এনডেভার্স, প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল, ব্লু-ইন্টারন্যাশনাল, এবিসি ভেঞ্চার, গ্রান্ড বিজনেস, এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং, হযরত শাহজালাল (র.) ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির নামে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার শেয়ার কেনে।

এগুলো ব্যাংকের মোট শেয়ারের ১৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে শেয়ার ধারণের পর গত জুনে এজিএম’এ নতুন পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়। গত ডিসেম্বরে হযরত শাহজালাল (র.) ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি সব শেয়ার বিক্রি করে দেয় আরমাডা স্পিনিং মিলের কাছে।

এরপর গত ৫ জানুয়ারি পরিচালনা পরিষদের সভায় ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল আনা হয়। পুনর্গঠন করা হয় পরিচালনা পরিষদ। তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোস্তফা আনোয়ার পদত্যাগ করলে নতুন চেয়ারম্যান করা হয় সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে। তিনি কমার্স ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। কমার্স ব্যাংকের ৪০ ভাগ শেয়ার এস আলম গ্রুপ কিনে নেয়ার পর তাকে ওই চেয়ারম্যান করা হয়।

ব্যাংকের নতুন এমডির দায়িত্ব দেয়া হয় ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি মো. আবদুুল হামিদ মিঞাকে। এই ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম। ব্যাংকের কোম্পানি সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের কোম্পানি সচিব জাহিদুল কুদ্দুস মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় গ্রাহকও এস আলম গ্রুপ। ২০১৫ সালে ব্যাংকটিতে গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের নেওয়া ঋণ ছিল ৩ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। ২০১৬ শেষে তা তিন হাজার ৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। বছরের ব্যবধানে এসআলম গ্রুপ ঋণ বাবদ ইসলামী ব্যাংক থেকে তুলে নেয় প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বিশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে ওই প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে। বাজারমূল্য হিসেবে ২ শতাংশ শেয়ারের মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

তবে পরিবর্তনের ধারায় যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন, তাঁদের পরিচয় নিয়েই রয়েছে নানা প্রশ্ন। বস্ত্র খাতের স্বল্প পরিচিত প্রতিষ্ঠান আরমাডা স্পিনিং মিলস ইসলামী ব্যাংকের ২ শতাংশের বেশি শেয়ার কিনেছে। আরমাডা স্পিনিং মিলের কর্ণধার মো. আরশেদ বলে নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনেরও সদস্য নয়।

ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের চার মাসের মাথায় দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন পরিচালকরা। এ দ্বন্ধের পেছনে অন্যতম কারণ ব্যাংকটির মালিকানায় আসতে একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপের তৎপরতা। এ ছাড়া তাদের স্বার্থের দ্বন্ধ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলার অভাব, নিয়োগ-পদায়ন নিয়ে অনিয়মসহ নানা কারণে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকের সদ্য সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গত ১১ মে হঠাৎ ফেসবুকে বিশাল বিবৃতি দিয়ে তাকে পদত্যাগ করতে একটি পক্ষ হুমকি দিচ্ছে বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, পর্ষদে মাইনাস-প্লাস ষড়যন্ত্র চলছে।

এরপর থেকে অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় নিয়ে কয়েক দিন ধরে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান ও ভাইস চেয়ারম্যান আহসানুল আলম পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন। ব্যাংকের বিভক্ত পরিচালকদের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আলাদা দুটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকটিতে কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সম্প্রতি দেড় শতাধিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন পরিচালকরা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও এ নিয়ে দ্বন্দ্ব হচ্ছে কোনো কোনো পরিচালকের। আবার মধ্যম ও শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে আহসানুল আলম বলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান ও এমডি ইসলামী ব্যাংককে বেসিক ব্যাংক বানাতে চাইছেন। চেয়ারম্যান জাকাত ফান্ডের ১৪৬ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলেছেন।

কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা করে নিয়ে প্রচুর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যারা চাকরি নিয়েছে তাদের মধ্য থেকেই এ ধরনের ৩৮ জন অভিযোগ করেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংকটি দুই হাজার কোটি টাকা মুনাফা করার পরও মাত্র ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। এভাবে কৌশলে শেয়ারের দাম কমানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close