ফিচার

এসব সন্ত্রাসী কেন তৈরি হলো

দাঁতে ব্যথা। সেই ব্যথা নিয়ে আপনি ছুটে গেলেন ডেন্টিস্টের কাছে। ডেন্টিস্ট সাহেব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দাঁতটি উঠিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত দিলেন। দাঁতটি উঠাতে গিয়ে পড়লেন আরেক নতুন ঝামেলায়। ডেন্টিস্ট সাহেব আপনার দাঁতটি চিহ্নিত করতে ভুল করলেন। দাঁতের পরিবর্তে উনি আপনার আলজিহবাটিই তুলে ফেললেন। ব্যথাযুক্ত দাঁতটি যে জায়গায় থাকার কথা ছিল সেখানেই রয়ে গেল।

বরং সেখান থেকে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ল আশেপাশের অন্য দাঁতেও। ব্যথা আগে অনুভূত হতো শুধু এক দাঁতকে কেন্দ্র করে, আর এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে অন্য সব দাঁতেও। সঙ্গে নতুন ঝামেলা বেড়েছে যে, আলজিহবাটিও ইতোমধ্যে হারিয়ে ফেলেছেন। ঠিকঠাক মতো আর খেতেও পারছেন না। আগে মাছ, মাংস, শাকসবজি, তরমুজ, বাঙ্গি সবকিছুই কতো না আরাম-আয়েশে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে পারতেন, অথচ সেসব যেন এখন অতীত, শুধু স্বপ্ন। ব্যথার চোটে সেগুলো আর চিবুতেই পারছেন না। জুস বা তরল খাবার খেয়ে কোনোরকমে সামলে নিতে হচ্ছে আপনাকে। ব্যথাযুক্ত দাঁত উৎপাটন করতে এসে আলজিহ্বা হারিয়ে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তা নিশ্চয় অনুধাবন করতে পারছেন।

কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য কাকে দায়ী করবেন আপনি? ব্যথাযুক্ত দাঁতকে, নাকি আলজিহ্বাকে, নাকি ডেন্টিস্ট সাহেবকে?

কথায় আছে না, মাথাব্যথা হলে তো মাথা কেটে ফেলা যাবে না। সঠিক ডায়াগনোসিস দরকার। তারপর সঠিক ঔষধ। কিন্তু ডাক্তার সাহেবের ডায়াগনোসিস যদি ভুল হয়ে যায়, তখন কী হবে? ভুল ঔষধ, ভুল চিকিত্সা। যার অর্থ দাঁড়ায় যে, অসুখ থেকে মুক্তি আপনার আর মিলছে না বরং মিলছে যা তা হচ্ছে আরো নতুন করে সাইড ইফেক্ট, ভুল চিকিত্সার কারণে ড্রাগের সাইড ইফেক্ট বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া।

এতো গেল ছোট খাটো ব্যথার কথা। কিন্তু পরিস্থিতি যদি আরো জটিল হয়ে দাঁড়ায়, যেমন ক্যান্সারের মতো জটিল ব্যাধি। তখন কী হতে পারে? ক্যান্সার শনাক্ত করতে দেরি হয়ে গেল অথবা শনাক্তকরণ হলেও ভুল চিকিত্সাও দেওয়া হলো, কর্কট রোগে আক্রান্ত এই রোগীর পরিস্থিতি কী ভয়াবহ হতে পারে একবার ভাবুন তো?

ক্যান্সার ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে শরীরের এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে, দূষিত হয়ে পড়েছে দেহের ভেতরের সেলগুলোও। যাকে বলে ম্যাটাসস্থেসিস। এমতাবস্থায় আপনাকে নিশ্চিত হতেই হবে যে, ক্যান্সার এখন আর স্টেজ ওয়ান-এর মধ্যেই সীমিত নয়, বরং তা অতিক্রম করে স্টেজ টু, বা থ্রি এমনকি স্টেজ ফোরে অবস্থান করেছে। রোগীকে আর বাঁচানো যাবে না। সম্ভব নয়।

সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে আজ সারা পৃথিবীতে। ঠিক ক্যান্সার যেমন ছড়িয়ে পড়ে দেহের সর্বত্র। কোথাও শান্তি নেই। এশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা। কোথাও না। পৃথিবীটা যেন হয়ে উঠেছে বিষময়। সন্ত্রাসের ছোবলে বিষাক্ত। কেউ সে ছোবল থেকে মুক্ত নয়। কখনো কোথাও আচমকা হয়তো প্লেন হাইজ্যাক হয়ে গেছে অথবা সাধারণ মানুষের উপরে ট্রাক উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আছে বন্দুক, ছোরা, গ্রেনেড, বোমা— এমনকি আত্মঘাতী।

অর্থাৎ সন্ত্রাসীরা মারবেনও, মরবেনও। নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার বলুন আর ব্রাসেলস বা বার্লিন বা প্যারিস বা সদ্য ঘটে যাওয়া ম্যানচেস্টার বা লন্ডনের সন্ত্রাসী হামলাই বলুন, সব সন্ত্রাসের মূল টার্গেট হয়ে পড়ে কিন্তু সাধারণ মানুষ। ঝরে যায় মূলত সাধারণ তরতাজা কিছু প্রাণ। যে প্রাণগুলো কিছুক্ষণ আগেই হয়তো কথা বলত, পৃথিবীর বুকে কত শত স্বপ্ন এঁকে যেত। এখন তারা নিস্তব্ধ। সন্ত্রাসীরা তাঁদের জীবনকে, চলার পথকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে, এসব সন্ত্রাসে আসলে কি কেউ কখনো হারে বা জেতে? বলতে পারবেন কি? এসব কুিসত কর্মকাণ্ডে হারজিত্ কি সত্যি সত্যিই আসলে আছে? নাকি আমরা সকলেই হেরে যাচ্ছি সন্ত্রাসের কাছে, সন্ত্রাসীর কাছে? কিন্তু কেন, কীভাবে?

অনেক সময় আমরা বলে থাকি যে, দুধকলা দিয়ে সাপ পুষলেও সাপ কিন্তু পোষ মানবে না। সুযোগ পেলেই ছোবল দেবে। যে হাত দিয়ে দুধকলা সাপের কাছে এগিয়ে দেওয়া হবে, সে হাতেই হয়ত ছোবল মারবে। পৃথিবীর এই সন্ত্রাসী অবস্থাটা যেন দুধকলা দিয়ে সাপ পোষার মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোথাও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটলেই তার দায়ভার আইএস নিয়ে নেয়। আইএস মানেই তাঁদের যে নামগুলো ধীরে ধীরে চলে আসতে শুরু করে, সেগুলোর সঙ্গে মুসলিম নামগুলোই মূলত চলে আসে। বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাই তখন আমরা সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায়।পাশ্চাত্যে। সারা বিশ্বে। পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যালঘু। হেট্রেড ক্রাইমের আশঙ্কা থেকে যায়।

একজন মুসলিম কখনো হত্যাকারী হতে পারে না, একটি হত্যাকেও সমর্থন জানাতে পারে না। আইএস সন্ত্রাসীরা তাহলে মুসলিম হয় কীভাবে?

তাছাড়া এ প্রশ্ন রাখা কি অযৌক্তিক হবে যে, মুসলিম নামধারী এসব সন্ত্রাসী কেন তৈরি হলো?

কারা তাদের পৃষ্ঠপোষক? অর্থের জোগানদাতা? অস্ত্রের জোগানদাতা? উসকানিদাতা? এই প্রশ্নগুলোর যে সঠিক ও সুস্পষ্ট উত্তরও আছে, তা কি আমরা সব সময় বলতে পারি? কখনো বলতে পারব?

সন্ত্রাস সৃষ্টির পেছনের কুশীলবরা আসলে কারা এবং সন্ত্রাসের মূল কারণ যদি সঠিকভাবে ডায়াগনসিস না হয়, তাহলে সন্ত্রাসের মূলোত্পাটন করা কি আদৌ সম্ভব হবে? আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে, বিশেষ করে আরব মুসলমানরা কেন ভায়োলেন্সের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে? মধ্যপ্রাচ্যের মূল সমস্যাগুলো কী কী ছিল?

প্যালেস্টাইনিরা কেন অধিকারবঞ্চিত থেকে গেল? ইসরাইল নামক দেশটি কীভাবে বেপরোয়া হতেই থাকল?

আফগানিস্তানের মাটি কেন এবং কীভাবে পরাশক্তিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো?

ইরাকিদের আজকের পরিণতির জন্য তাঁদের আসলেই কোনো অপরাধ ছিল কি না? সিরিয়াই-বা কেন অরক্ষিত থেকে গেল? আয়লান কুর্দির নিষ্প্রাণ দেহ কেনই-বা সাগরতীরে পড়ে ছিল?

এতসবের পরেও যদি প্রশ্ন রেখে দেওয়া হয় যে, আরবদের তেল বা গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর ভাগ বাটোয়ারা কি আরবদের হাতে আছে? যদি না থাকে তাহলে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে?

আজ মুসলমানদের যারা ঢালাওভাবে সন্ত্রাসী বলছেন, তারা আসলে ভুল করছেন। বরং সন্ত্রাসের পেছনের প্রকৃত সন্ত্রাসী কারা, সেই ডায়াগনসিস ব্যতীত প্রকৃত সন্ত্রাসকে রুখে দেওয়া কখনোই সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

লেখক: ড. মো. রওশন আলম, বোস্টন, ইউএসএ।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close