ফিচার

বাজেটে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত

২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট-নীতি হচ্ছে, “নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, ইতিহাস-ঐতিহ্য গোল্লায় যাক”। সরকারি দল ও গৃহপালিত বিরোধীদলের সংসদ-সদস্যগণের নীতি হচ্ছে, “সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল, তাতে কার কি বাল”। এভাবেই ৪ লক্ষ ২৬৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেট থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৩৯৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। তাদের যুক্তি হল- বেশ কয়েকবছর যাবৎ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ হচ্ছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত না হলে; এবারের নির্বাচনী বাজেটে না হয় একটু বেশি বরাদ্দ হয়েছে, তাতে ইতিহাস বিকৃত হবার নয়। শুধুমাত্র স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে স্বার্থ হাসিলে বাধা দিচ্ছে।

স্বাধীনতার স্থপতি বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাজেটে ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ নামে বরাদ্দ ছিলনা। বর্তমানে এখাতে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর বাজেটের (৭৮০ কোটি টাকা) পাঁচগুণ বরাদ্দ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা-শহীদ বিভাজন ছিলনা। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও কোটাসুবিধা ছিলনা। দেশের সবাই মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য বিবেচিত ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রায় দুই লাখ। তাদের দেয়া হচ্ছে, বড় অংকের ভাতা ও বিবিধ সুবিধা। বলা হয়েছে, এ মুক্তিযোদ্ধাগণই দেশ স্বাধীন করেছেন। তারা লড়াই না করলে দেশ স্বাধীন হতোনা। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ বরাদ্দ অতি সামান্য। তাদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিদেরও এতে অধিকার রয়েছে। তাদেরকে সকল চাকুরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে ৩০ভাগ কোটাসুবিধা দেয়া হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে এযাবতকালে ত্রিশভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পালনে যেটুকু ঘাটতি হয়েছিল, ইতোমধ্যে তা কড়ায়-গন্ডায় পূরণ করা হয়েছে। কয়েকবছর যাবৎ বিসিএস, ব্যাংক-বীমা, সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা পরিপালন হয়েছে। ফলে, দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহির্ভূত ২৬ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত দু’লাখ পরিবারে এসেছে পৌষমাস, বাকি জনতার বঞ্চণা ও সর্বনাশ। দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর চেতনা বিবর্জিত হয়েছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির জ্বলন্ত প্রমাণ।

দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার জন্য বাজেট-বরাদ্দের ফলে ত্রিশ লাখ বীর শহীদের ব্যাপারে সন্দেহ জেগেছে। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ত্রিশ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নাকি রাজাকার ছিলেন, তাতে প্রশ্ন উঠেছে। শহীদগণ মুক্তিযোদ্ধা হলে, প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা অবশ্যই অবৈধ। কারণ, ত্রিশ লাখ শহীদের বিপরীতে শুধু দুই লাখ যোদ্ধা পৃথিবীর কোথাও নেই। শহীদগণ যোদ্ধা তালিকার বাইরে নয়। বঙ্গবন্ধু শহীদদের যোদ্ধা থেকে আলাদা দেননি। তিনি ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করেছেন। সাতজন শহীদকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব দিয়ে ৬৭৬ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করেছেন। এতে জাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, ৬৭৬ যোদ্ধার মধ্যে যেমন মাত্র সাতজন শহীদ রয়েছেন; তেমনি ত্রিশ লাখ শহীদের তুলনায় আরো অনেক বেশি মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। সাতজন শহীদ যেমন বীরশ্রেষ্ঠ, তেমনি ত্রিশ লাখ শহীদ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এদের বাদ দিয়ে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা ও তাদের জন্য বাজেট-বরাদ্দ দেয়া অবৈধ। এতে শহীদদের প্রতি অবমাননা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়।

বাজেটে সুবিধাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, লাখো বীর শহীদ, আত্মত্যাগী, বন্দী, শরণার্থী ও অগণিত সাধারণ যোদ্ধার নাম নেই। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও তালিকা বহির্ভূত বীরগণ মুক্তিযোদ্ধা নন। মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান নেই। তাদের সন্তানেরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নয়। তাই বাংলাদেশে ত্রিশ লাখ শহীদের বংশ ও পরিবারের অস্তিত্ব নেই। শুধু দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তান-সন্ততি রয়েছেন। এতে বঙ্গবন্ধু ও প্রকৃত যোদ্ধাগণ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বঞ্চিত হয়েছেন। রক্রের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছে।

অতএব বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধে আমাদের উচিত, প্রচলিত দুই লাখ তালিকা বাতিল করে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাসহ সকল বীর বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদান করা। বাংলাদেশের ১৬কোটি নাগরিককে তাদের প্রজন্ম ঘোষণা করা। বাজেটের অর্থ সমগ্র্র মুক্তিযোদ্ধা প্রজম্মের মাঝে সমবন্টন করা।

লেখক: সিরাজী এম আর মোস্তাক, শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close