অন্য পত্রিকা থেকে

কতটা আধুনিক বাংলাদেশ রেল

আব্দুল আলীম: বৃটিশ আমলে তৈরি রেললাইনের অনেকটাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ক্রসিংয়ে সিগনাল নিয়ন্ত্রণ, প্লাটফর্মে যাত্রীসেবা ও অফিসের যাবতীয় ব্যবস্থাপনার সবই এখনো আগের মতোই এনালগ রয়ে গেছে।

ডিজিটাল যুগে এখনও যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বার্তা দেয়া হয় মান্দাতার আমলের মাইক্রোফোনে। অনেক সময় মাইক্রোফোনে অস্পষ্ট উচ্চারণে ট্রেনের ঘোষণাগুলোও বুঝা যায় না।

পূর্ববর্তী স্টেশনে আসার আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও বলতে পারেন না ট্রেনটি কোথায় আছে। কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দুই-তিনটি ট্রেন রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে প্লাটফরমে।

চালকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানতে পারেন না অপর ট্রেনটি কোথায় আছে। রেল ক্রসিংগুলোতে ট্রেন আসার আগে ১ কিলোমিটার দূরে থাকতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেল বাজলেও বাঁশ ফেলতে হয় একজন মানুষকে। কোথাও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ সম্ভব হয়নি এখনও। সবকিছুই চলে বৃটিশ আমলের সিস্টেমে।

যাত্রীদের অভিযোগ, সব ট্রেনেরই যাত্রীসেবা নিম্নমানের, বিমানবন্দর রেল স্টেশনে ঢাকাগামী যাত্রীদের জন্য এখনও পর্যন্ত কোনো বৈদ্যুতিক ফ্যানের ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত বসার জায়গারও অভাব রয়েছে।

সারা দেশের মাত্র কয়েকটি রেলওয়ে স্টেশনে কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট বিক্রি করা হলেও সেখানেও রয়েছে নানা ধরনের ভোগান্তি। একই ট্রেনের জন্য কম্পিউটারাইজ সিস্টেমের টিকিট আবার সেই ট্রেনের জন্যই এনালগ সিস্টেমের কাগজের টিকিটও বিক্রি করা হয়। স্টেশনগুলোতে যাত্রী ও ট্রেনের আসন সংখ্যার বিপরীতে টিকিট কাউন্টারের সংখ্যাও সামান্য।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন বিগত বছরগুলোতে রেলওয়েকে দেখার মতো কেউ ছিল না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি দিয়ে গতানুগতিকভাবে পরিচালনা করা হতো। রেলওয়ের সিনিয়র গণসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ১৯৮২ সাল পর্যন্ত রেলওয়ে বোর্ডের নিকট রেলপথের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ন্যস্ত ছিল। পরে ১৯৯৫ সালে এটিকে অধিদপ্তর করা হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত রেলওয়ে অধিদপ্তরের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো।

এসময় তেমন কোন জবাবদিহিতার আওতায় ছিল না। এই খাতের জন্য তেমন কোন বরাদ্দও ছিল না। সরকারি চাকরি হওয়ায় শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন দেয়া হতো। তবে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে রেলওয়েকে আলাদা মন্ত্রণালয় করে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। নতুন নতুন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে রেলওয়ের উন্নয়নে। রেলওয়েতে যে উন্নয়ন হয়েছে তা ২০১১ থেকে ২০১৭ সময়ের মধ্যেই হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রেলওয়ের আমূল পরিবর্তন করে বাংলাদেশ রেলওয়েকে সার্ক করিডরের সঙ্গে যুক্ত করতে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা মূল্যের ২৩৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ এ প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। মহাপরিকল্পনার আওতায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে তিন ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজ আগামী ৫ বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। কোনো কোনো প্রকল্প শেষ হতে একটু বেশি সময় লাগবে। রেলমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মাস্টারপ্লানের আওতায় দেশে নতুন রেলপথ তৈরি করা, বিদ্যমান রেলপথ ডাবল-ট্রিপল ও চার লেন করা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করে রেলওয়েকে ট্রান্স-এশিয়ান রুটে যুক্ত করা হবে। মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বুলেট ট্রেন চালু ও সারা দেশে সার্কুলার রেল রুট রির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে সোনাদিয়া (গভীর সমুদ্র) আবার হাটহাজারী হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত গুনদুম পর্যন্ত রেল পথ সমপ্রসারণ, চিল্লাহাটি-ঈশ্বরদী থেকে খুলনা হয়ে মংলা পর্যন্ত রেলপথ, যশোর থেকে সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবন পর্যন্ত, ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে রাজশাহীর রোহানপুর ও চিলাহাটি বা বিরল পর্যন্ত, ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-যশোর হয়ে বেনাপোল পর্যন্ত, ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত (পদ্মা সেতু নির্মাণ সাপেক্ষে), ঢাকা-ময়মনসিংহ- জামালপুর-তারাকান্দি হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত, ঢাকা থেকে ভৈরব বাজার হয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত। পর্যায়ক্রমে সরা দেশে সার্কেল রেলরুট তৈরী করা হবে। পরিবর্তন আনা হবে রেলওয়ে সিগনালিং ব্যবস্থায়। সিগনালিং ব্যবস্থা কম্পিউটারাইজড করাসহ রেল টেলিকমিউনিকেশনের আমূল পরিবর্তন আনা হবে।

রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক মানবজমিনকে বলেন, রেলের আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ি বিএনপি সরকার। বিএনপির আমলে রেলের প্রতি নজর দেয়া হয়নি। ২০০৬ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী রেলের প্রতি নজর দিয়েছেন।

আগে রেলের জন্য বছরে বরাদ্দ ছিল ৫০০ কোটি টাকা। এখন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। আরো ট্রেন বৃদ্ধির জন্য আমাদের পরিকল্পনা আছে। ঢাকার আসপাশের জেলাগুলোর সঙ্গে রেললাইন ডাবল করা হবে। ঢাকার চার পাশ দিয়ে সার্কেল ট্রেন লাইন তৈরি করা হবে। এর জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে।

রেলের উন্নয়নে আমরা ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৪টি প্রকল্প গ্রহণ করেছি। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা যাবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রেলের চেহারা পাল্টে যাবে। তখন রেলই হয়ে উঠবে দেশের মানুষের প্রথম পছন্দের পরিবহন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close