ফিচার

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি চান রণাঙ্গনের বীর সেনানী সুজিত নাগ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছোট অপারেশন থেকে বড় সফল অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ধলঘাটের কমান্ডার মো.করিমের সাথে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে গ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে সবাইকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পাড়ায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন এই যোদ্ধা। জীবনে ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করা এবং সাথে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা তুলে সচেতনতা বৃদ্ধি করে নজর কাড়েন সবার। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা সুজিত নাগ।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর সারোয়াতলীতে স্বদেশী আন্দোলনে অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। বিপ্লবী তারকেশ^র দস্তিদার, কালিপদ চক্রবর্তী, নেপাল চন্দ্র দস্তিদারসহ বহু বিপ্লবীর তীর্থ ছিল সারোয়াতলী। এই গ্রামে ব্র্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ণ সেন উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় তৎকালীন দক্ষিণ চট্টগ্রামে আলো দানের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ছিল।

স্যার আশুতোষ কলেজও ছড়িয়েছে শিক্ষার আলো। এই মাটিতেই মুক্তিযোদ্ধা সুজিত নাগ জন্মেছিলেন ১৯৫০ সালের ৩১ আগস্ট। পিতা প্রয়াত মনমোহন নাগ, মাতা প্রয়াত সুষমা নাগের ৬ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। ব্যক্তি জীবনে দুই সন্তানের জনক তিনি। ছোট ছেলে মিঠুন নাগ ধর্মীয় সাধনা ও মানবসেবায় নিজেকে সঁপেছেন এবং বড় ছেলে পীযুষ নাগ বেসরকারী চাকুরীর পাশাপাশি সংগীত শিল্পীও। তাঁর স্ত্রী উমা নাগকে হারিয়েছেন ১৯৮৭ সালে।

তিনি অনেকটা ক্ষোভ দুঃখ আর হতাশার সুরে বলেন, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অনেকে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণ না করেও ৫০ টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়েছেন। এমনকি অনেক যুদ্ধাপরাধীও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে অবলীলায়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা দিচ্ছেন, তাদের সন্তাদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন।

অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ের জন্য আবেদনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে, নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে স্থানীয় সাংসদ, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিদের খবরদারিত্বমূলক ভূমিকা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নিবন্ধিত হতে নিরুসাহিত করবে।

তিনি বলেন, রাজনীতিকরা টাকার বিনিময়ে অনেক অমুক্তিযোদ্ধাদেরও মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। আবার কিছু রাজনীতিবিদরা এই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কলংকৃত করেছে।

রণাঙ্গনের এই বীর সেনানী বলেন, মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে যাই যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও কিছু সাংসদ, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে। এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। এমনকি মুক্তিযুদ্ধকালীন এই দেশে যারা ছিলেনও না, তারা কিভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলেন আর অন্যকে কিভাবে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করবেন?

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিরা বারংবার ব্যবহার করেছেন নিজেদের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে। যার কারণে দেশ আজও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নির্ণয় জটিল ও কঠিন কাজ। প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন, ‘একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাই আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে চিহ্নিত করতে পারবেন।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ আজও পাইনি। জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, মা-মাটি বাংলার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। সার্টিফিকেট, সরকারী ১০ হাজার টাকা ভাতা কিংবা যেকোন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়।

তাই আমার সন্তানদের কোন প্রকার সরকারী চাকুরীর জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগের চেষ্টা করিনি। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, কিন্তু যখনি সরকারী বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হল তখনি সবাই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো।

এলাকার অনেক রাজাকার-আলবদর-সামস-যুদ্ধাপরাধী যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পাকিস্তানীদের সহযোগীতা করেছে, পাশাপাশি এদেশের হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান-আদিবাসীদের উপর নির্যাতন, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সম্পদ লুটতরাজ করেছে, তারা অনেকেই এখন জনপ্রতিনিধি।

আবার অনেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক, যারা এলাকার দানশীল ব্যক্তি হিসেবেও পরিচয় দেয়। দেশে-বিদেশে রয়েছে তাদের নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়। আমার বেশি ভয় কাজ করে, মুক্তিযুদ্ধের আদি সংগঠন আওয়ামী লীগের ভিতরে দিনকে দিন মীরজাফর-বেঈমানদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, যার কারণে আবার না পাকিস্তানের ভাবধারায় ফিরে যেতে হয়। যখন দেখি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করে, দিনমজুরের কাজ করে, রিক্সা চালায় তখন কষ্ট হয়।

সামান্য কটা টাকার অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয় অনেকে কিংবা একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, স্ত্রী তার অধিকারটুকু চাইতে চরম অপমান লাঞ্ছনার শিকার পর্যন্ত হতে হয়। তাতে যতটা কষ্ট পাই তার চেয়ে যুদ্ধে অন্যান্য শহীদদের মতো মরে গেলেও অনেক ভালো হতো। তাহলে অন্তত আজকের এই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান দেখতে হতে না।

সম্মুখ যুদ্ধের এই বীর সেনানী বলেন, বোয়ালখালীর সারোয়াতলীর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা জাফর, ভূপাল পারিয়াল, বিমল দে, পুলিন দাশ ধনা, অনন্ত বিশ^াসসহ অনেকে ধুকে ধুকে মরছে। তাদের স্ত্রী-সন্তানেরা অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে দিনযাপন করছে। অনেকে সুচিকিৎসার অভাবে বিভিন্ন শারিরীক কষ্টে দিনযাপন করছে।।

তেমনিভাবে পটিয়ার ধলঘাটস্থ বাগদন্ডী গ্রামের প্রয়াত ডা. গোপাল চন্দ্র দাশের মতো অনেক স্বীকৃতি বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন যাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগীতাই আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে বেগবান করে দেশ স্বাধীন হতে সহযোগীতা করেছিলেন। তাঁদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে সম্মান জানানো হলেই দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

মুক্তিযোদ্ধা সুজিত নাগ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করে জয়লাভ করেছিলেন কোন প্রকার বিশাল বাজেটের নির্বাচনী খরচ ছাড়াই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন রাজনীতি ব্যবসা। নির্বাচনে হাজার কোটি টাকা খরচ করে তারপর উশুল করো রে ভাই। নির্বৃাচনী ব্যয়বহুলতা থেকে ফিরে আসতে হবে।

একজন সৎ নির্লোভ ত্যাগী শিক্ষিত ব্যক্তি কিভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, তারতো অবৈধ পথে আয়কৃত হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। যার কারণে দুর্নীতি এখন প্রশাসনের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একজন সরকারী চাকুরীজীবি ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে চাকুরী পেলে তার কাছ থেকে বিনামূল্যে সেবা প্রত্যাশা করা যায় না। দুর্নীতি রোধ করার জন্য চাই আমাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন।

সাংসদ, সচিব, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধিরা যদি অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রতিযোগীতা বন্ধ করেন, তাহলে আমাদের দেশ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ হতে বেশি সময় নেবে না। দুর্নীতির মূল উৎপাটন করা কিংবা বন্ধ করা শুধুমাত্র আমাদের মন-মানসিকতার ব্যাপার মাত্র। প্রসাশনের প্রতিটা স্তরে জনগণের কাছে জবাবদিহিতামূলক কার্যক্রম আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।

যুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের আকাশবাণী বেতার থেকে সংবাদ পরিক্রমায় দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর প্রচার করে মুক্তির সেনানীদের দেশ স্বাধীন করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা নির্যাতন অত্যাচার শুরু হয়, যা আজ পর্যন্ত চলমান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। বোয়ালখালী সার্কেলের অফিসার এনামূল হক মুক্তিযোদ্ধা সুজিত নাগকে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালায়। এরপর নিয়ে যায় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে।

সেখান থেকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকি তাকে উদ্ধার করেন। এরপর তিনবার জেল খাটতে হয়েছে, আরো অনেকবার হুলিয়া জারীর কারণে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে থাকতে হয়। এমনকি ৭৪ সালেও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন করিয়েছে ভুল তথ্য দিয়ে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে তাদেরকে ঘায়েল করতেই ঘরে অস্ত্র রয়েছে-এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে পর্যন্ত থাকতে দেয়নি।

একাত্তরের রণাঙ্গনের কথা বলতে গিয়ে বলেন, গোমদন্ডী সিও অফিস সংলগ্ন এলাকায় বড় ধরনের অপারেশন করা হয়। এসময় পাকিস্তানী এবং দেশীয় সরাফাত রাজাকার, এনায়েত খাঁ, দেলওয়ার সওদাগর রাজাকারের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে বেবী, ওয়াজেদ, ফজলুসহ আরো অনেক সহযোদ্ধা নিহত হয়।

ভাগ্যক্রমে আমরা যারা বেঁচে যাই তারা করলডেঙ্গা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে সারা দিন-রাত কাটাতে হয়। দোহাজারী রেললাইন বেঙ্গুরা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ে প্রায় রাত কাটিয়েছি নির্ঘুম, কারণ দিনে এলাকায় আসতে পারতাম না। কালাইর হাট, বেঙ্গুরা, গোমদন্ডী, ধলঘাট, বাগদন্ডী এলাকার ব্রীজ কালভার্ট গুঁড়িয়ে দেই, যাতে পাকিস্তানি সেনারা গাড়ি নিয়ে আসতে না পারে। এরপর ধলঘাট, বাগদন্ডী ও পটিয়ায় জিরি মাদ্রাসা এলাকায় হাট-বাজার বারে দিনে পুনরায় অপারেশন চালানো হয়। এর পরবর্তীতে কাপ্তাই প্রজেক্টে ড্যাম ধ্বংস হয় পাকিস্তানীদের সাথে যুদ্ধে। শঙ্খ নদীর ব্রীজও গুঁড়িয়ে দেই আমরা।

এরপরই পাকিস্তানী ও রাজাকারদের আগ্রাসী ধ্বংসলীলা শুরু হয়। পটিয়ার সুলতান আহম্মদ কুসুমপুরী, আবু সালেহ, ফজলুল হক মণি, শওকত ওসমান, আমি ও ধলঘাটের কমান্ডার মো.করিম সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাদের এভাবে ছোট খাটো অপারেশন দিয়ে আমরা পাকিস্তানী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে সফল হতে পারবো না। তাই আমাদেরকে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং, অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে তরুণদেরকে সম্পৃক্ত করে বড় ধরনের অপারেশন চালাতে হবে।

কুমিল্লা দিয়ে ভারতের দেবাগ্রী গিয়ে ট্রেনিং নিলাম। অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে রাঙ্গামাটি সীমান্তে হরিণা বাজার দিয়ে আবার দেশে ফিরে পুনরায় সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তানীদের পরাজিত করি। মহান মুক্তিযুদ্ধে ছোট-বড় অনেক অপারেশন করি যা মনে নেই, অনেক অপারেশনে পাকিস্তানি-রাজাকারদের বিধস্ত করেছি, আবার কোনটাতে অনেক সহযোদ্ধাদের হারিয়েছি।

পাকিস্তান আমলের প্রায় ৩০ ভাগ সংখ্যালঘু থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখন প্রায় ৮ ভাগ এসেছে। এর কারণ হলো, ৭২ এর সংবিধান মোতাবেক দেশ পরিচালিত না হওয়া, মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃতি করা, সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করা।

সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর জায়গা-জমি রক্ষায় প্রসাশনের নিরব ভূমিকা, যেকোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সময় পুলিশ বাহিনী দিয়ে পাহাড়া দিতে হয়। অপ্রিয় সত্য হল, কোন প্রকার ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে সংখ্যালঘুদের জায়গা দখল, বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে, উপাসনালয় ধংস করে, তার সম্ভ্রম নষ্ট করা, তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কারণে আজ সংখ্যালঘু কমে গিয়েছে।

আত্মপ্রচার বিমুখ এই অভিমানী বীর সেনানী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে পাকিস্তানী ও রাজাকারদের হাতে। এলাকার মানুষদের মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করেছিলাম। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ কাজ করেছিলাম বলেই আমার বাড়িটি অনেকবার ধংস করা হয়েছিল। এই বীর সেনানী কিছু পাওয়ার আশা না করলেও উনার ভাগ্যে জুটেনি একুশে পদক।

তবে রাজনীতিকে এড়িয়ে চলেন কারণ রাজনীতি এমন এক ব্যবসায় দাঁড়িয়ে গেছে, জনগণের কল্যাণ থেকে জনপ্রতিনিধিদের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই মুক্তির সেনানী বলেন, জীবনে সৎ ছিলাম। ন্যায়ের পথে ছিলাম। সেই শিক্ষাই সন্তানদের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পিসি সেন উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৯৭ সালের দিকে ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্বও পালন করেছিলাম, যখন এই বিদ্যালয়টির সুনাম কিছুটা ভাটা পড়তে যাচ্ছিল। বাড়বকু-ে গালফা-হাবিব জুট মিলে বেশ কিছুদিন চাকুরী করেছিলাম।

ওই প্রতিষ্ঠানে সিবিএ’র নেতৃত্বও দিয়েছিলাম। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে বার্ধক্যজনিত কারণে নিজ বাড়িতেই আছি। ছেলেদের শত অনুরোধেও গ্রামের বাড়ি জন্মস্থান ছেড়ে যাইনি কোথাও। যে মাটিতেই জন্ম হয়েছে যেন একই জায়গায় মৃত্যুর পর দেহটা সমাহিত হয়। জীবনটাকে সাদা-মাটা সহজ সরল ভাবে কাটাতে চাই তাই ধর্মের লেবাস গাঁয়ে না মেখে এর আদর্শ কিছুটা হলেও মনে-প্রাণে, কাজে-কর্মে প্রয়োগ করে পথ চলার পাথেয় করার চেষ্টা করেছি।

সারোয়াতলীর পূর্ণ চন্দ্র সেনের উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা সুজিত নাগ। বাংলাদেশের রাজনীতি পরিশুদ্ধ হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি। ঘুনে ধরা রাজনীতি আমাদেরকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা পরিবারেই হতে পারে সুসন্তান তৈরি হওয়ার একমাত্র কেন্দ্র।

বর্তমানে জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে কিন্তু মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এখন খুব কম মা-বাবাই সন্তানদের চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেন। একজন সুসন্তানই সমাজ-রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে পারে। সুসন্তান জনপ্রতিনিধি হলে তখনই প্রকৃত সেবার মন-মানসিকতা নিয়ে কাজ করে থাকেন। বর্তমানের তরুণ প্রজন্মদের মধ্যে স্বার্থপরতা,ভোগবাদিতা বৃদ্ধির মনভাব বৃদ্ধির প্রবনতা সমাজের জন্য অশুভ সংকেত।

ব্রিটিশরা শাসন-শোষণ দুটোই করেছিল কিন্তু পাকিস্তানীরা শুধুই শোষণ করে পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙ্গালিকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিল।

নোংরা রাজনীতি থেকে নিজেকেই বরাবরই দূরে সরিয়ে রেখেছেন মুক্তিযোদ্ধা সুজিত নাগ। অবসর জীবনে এসে বাড়ীতেই কবুতর, হাঁস, মুরগী, গরু, ছাগল পালন করে সময় কাটান তিনি। বিভিন্ন ফুল-ফলের বাগান করা নেশা। রবীন্দ্র-নজরুল-দেশাত্ববোধক সংগীতের পাশাপাশি ভালো কীর্তনও গাইতেন তিনি।

সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগের ব্যাপারে তিনি বলেন, একজন সংখ্যালঘু যখন প্রসাশনের দ্বারস্থ হন তখন কি সহযোগীতা পান? প্রায়ই দেখা যায় নির্যাতিতদের পাশে প্রশাসনও থাকে না। বি-বাড়িয়া নাসিরনগর, বাঁশখালী ১১জন পুড়িয়ে হত্যা, ফটিকছড়ি, ফতেয়াবাদ, রাউজান, শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত, যুদ্ধাপরাধী বিচার শুরু হওয়ার পর হিন্দুর বাড়ি-উপসনালয়ে হামলা তার বাস্তব উদাহরণ।

পাশর্বর্তী দেশ থেকে একজন সংখ্যালঘু মুসলিমও দেশ ত্যাগের চিন্তা কখনো করে না। তার কারণ নিরাপত্তা, মেধার মূল্যায়ন, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয় না।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা কিভাবে পেলেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাধীনতা সংগ্রামের এই বীর সেনানী বলেন, আমাদের বাপ-দাদারা ব্রিটিশের ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে তৎকালীন আন্দোলনে কাজ করেছেন। তাদের কাছ থেকেই দেশ প্রেমে নিজেকে নিবেদিত করার শিক্ষা পেয়েছি। এলাকার জাত বর্ণ নির্বিশেষে সেবা করার শিক্ষা পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল।

সেই থেকেই সামাজিক সাংস্কৃতিক সাংগঠনিকভাবে এলাকার সকলের জন্য কাজ করেছি স্বার্থহীনভাবে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বই নয় এলাকার জনগণকে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছি। এলাকার হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রীস্টান সকলের সাথে ভ্রাতৃত্ববোধ সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার কাজ করে সফল হয়েছি। চাইলে হাজার কোটি টাকার পাহাড় গড়তে পারতাম, কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের পথে এ পর্যন্ত চলে এসেছি। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে গিয়ে বারে জীবনের উপর বিপদ এসেছে, হানা দিয়েছে মৃত্যুর পদধ্বনি। দ্ব্যর্থহীন চিত্তে ত্যাগ করেছি বিভিন্ন লোভনীয় অফার। রাজনীতিতে অনেক বড় পদের অফার দেওয়া হয়েছিল কিন্তু আমার মতো বিবেক দ্বারা ন্যায়ের পথে পরিচালিত হওয়া মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়।

পারিবারিক পূর্ব-পুরুষদের শিক্ষা, ছোট বেলায় সামাজিক সাংস্কৃতিক সাংগঠনিক কর্মকা-ে নিজেকে জড়িয়ে রাখার ফলে তরুণ বয়সে এসে ভাবলাম দেশের মা-মাটির জন্য বড় ধরনের কাজ করা চাই। সেই থেকেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া ও অন্যদেরকে প্রেরণা দেওয়া। তিনি মনে করেন, বর্তমানে যুবক-তরুণ সমাজ দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়ন করা যাবে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ নব প্রজন্মের হাতে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সেইসাথে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই স্বীকৃতি পাক-এটাই এই বীর সেনানীর চাওয়া।

লেখক: ডা. শোভন দাশ, প্রাবন্ধিক

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close