আরববিশ্ব জুড়ে

তুরস্কের সাংবাদিকরা যখন কাঠগড়ায়

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: আদালতের কাঠগড়ায় তুরস্কের ১৭ সাংবাদিক। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনে সহযোগিতা দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

দি অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে ৪৩ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে তাদের। এজন্য সরকার বিরোধ পত্রিকা কামহুরিয়েত নিজেই এখন সংবাদের শিরোনাম। তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে এ খবর দিয়েছেন বিবিসির সাংবাদিক সেলিন গিরিট।

তিনি লিখেছেন, কামহুরিয়েত পত্রিকার সাংবাদিক ও ম্যানেজার সহ এক ডজনের বেশি মানুষকে বিচারের আগেই আটক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনকে জেলে রাখা হয়েছে ৯ মাস ধরে। এ নিয়ে এসব সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। এর মধ্যে সাংবাদিক তুরহান গুনাই-এর কন্যা আলিফ গুনাই অন্যতম।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি বাবাকে স্পর্শ করতে পারি না। জড়িয়ে ধরতে পারি না। শুধু কাচের ওপারে থাকা বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারি। তাও সময় শেষ হয়ে গেলে কর্তৃপক্ষ ফোনের লাইন কেটে দেয়। প্রতি সপ্তাহে তার কাছ থেকে এভাবে সরে আসতে ভীষণ কষ্ট হয়।

উল্লেখ্য, সাংবাদিক তুরহান গুনাইয়ের বয়স এখন ৭১ বছর। তিনি কামহুরিয়াত পত্রিকার বইয়ের সাপ্লিমেন্ট বিষয়ক প্রধান সম্পাদক। তার সঙ্গে মেয়ে আলিফকে সপ্তাহে একদিনমাত্র এক ঘন্টার জন্য সাক্ষাত করার অনুমতি দেয়া হয়।

আলিফ বলেছেন, বাবা বলেছেন তিনি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত। এর মধ্যে রয়েছে আথারোস্কে¬রোসিস। অপারেশন পরবর্তীতে ধমনীতে এ সমস্যা দেখা দেয়। আলিফ বলেন, তা সত্ত্বেও তাকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। কি অপরাধে তাকে তাকে জেলে রাখা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আলিফ।

তার ভাষায়, আমার যেটা মনে হচ্ছে তা হলো এটা হলো একটি রাজনৈতিক খেলা। দায়িত্ব পালন করার জন্য এসব সাংবাদিকদের আটক করে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, সপ্তাহখানেক আগে গত বছরের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের প্রথম বার্ষিকী পালন করেছে তুরস্ক। তাতে উল্লসিত জনতার হাতে ব্যাপক আটকের প্রশংসা করা হয়। গণতন্ত্রের পক্ষে জোরালো কথা বলা হয়। কিন্তু ওইদিন সমালোচকরা বলেছেন, ঘটনার পরই জরুরি অবস্থা জারি ছিল প্রকৃতপক্ষে ব্যাপকহারে দমনপীড়ন শুরুর কৌশল। গত বছর তুরস্কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষকে।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক গ্রুপগুলো বলছে, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে মিডিয়ার ওপর। প্রায় ১৫০টি মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সাংবাদিককে জেলে রাখার শীর্ষে রয়েছে তুরস্ক। সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো বলছে, ১৫০ জনেরও বেশি সাংবাদিক রয়েছেন জেলে।

তবে এ সংখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সরকার। এসব সাংবাদিকের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মাসের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান বিবিসি’কে বলেছেন, তার দেশে মাত্র দু’জন সাংবাদিককে জেলে রাখা হয়েছে। বাকিরা হয়তো সন্ত্রাসী না হয় তারা অস্ত্র বহন করছিল না হয় এটিএম বুথে ডাকাতি করছিল।

সোমবার বিচার শুরু হওয়ার কথা এক নম্বর সন্দেহভাজন কামহুরিয়াত পত্রিকার সাবেক প্রধান সম্পাদক কান দুনদারের বিরুদ্ধে। আরেকটি মামলায় গুপ্তচরের কাজ করার দায়ে তাকে গত বছর তিন মাসের জেল দেয়া হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। বর্তমানে তিনি জার্মানিতে নির্বাসনে রয়েছেন। স্কাইপ মারফত তিনি বিবিসিকে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এরদোগান যে দু’জন সাংবাদিককের কথা বলেছেন তারা কারা, এ নিয়ে আমি বিস্মিত।

তার মতে, জেলে থাকা সাংবাদিকের সংখ্যা ১৫০ এর বেশি। তার ভাষায়, এরদোগান সমালোচনাকে ঘৃণা করেন। তার বিরুদ্ধে প্রতিটি সমালোচনাকে তিনি নিজের অপমান অথবা সন্ত্রাসী কর্মকা- হিসেবে দেখেন। আমরা জানি আটক এসব মানুষ সাংবাদিক। তারা সাংবাদিকতা ছাড়া অন্য কিছু করেন নি।

ওদিকে কামহুরিয়াত পত্রিকার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা সহিংস ও বিভক্তি সৃষ্টিকারী সংবাদ পরিবেশন করে। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর নেতাদের সাক্ষাতকার প্রকাশ করে। তারা সম্পাদকীয় নীতি পাল্টে এসব করে।

আসামীদের আইনজীবী আদিল ডেমিরসি বলেন, এটা উদ্ভট অভিযোগ। হাস্যকর অভিযোগ। আসলে এটা অবশ্যই রাজনৈতিক অভিযোগ। সরকার বিরোধী বলে কামহুরিয়াত পত্রিকাকে টার্গেট করা হয়েছে।

ওদিকে পেন তার্কি, জেনেপ ওরালের মতো সংগঠন মনে করে কয়েক দশক ধরে তুরস্কে মিডিয়ার স্বাধীনতার যে অবস্থা বিরাজ করছে এখনকার পরিস্থিতি তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। তিনি বলেন, আগামীকাল আপনার ভাগ্যে কি ঘটবে আপনি তা কখনো জানতে পারবেন না। যেকেউ আপনাকে এ সময়ে জেলে ঢুকিয়ে দিতে পারে।

যদি কোনো কারণ ছাড়া একজনও সাংবাদিক জেলে থাকেন তাহলে এই দেশে কোনো মানুষ কোনোদিন মুক্ত থাকবে না। ওদিকে সোমবার শুরু হওয়া কামহুরিয়াতের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়ার দিকে সারা বিশ্বের সাংবাদিক ও মিডিয়ার স্বাধীনতার পক্ষের কর্মীরা নিবিড় নজর রাখছেন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close