রাজনীতি

সিনহাকে নিয়ে শঙ্কা কাটছে না আওয়ামীলীগের

রাজনীতি ডেস্ক: সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমঝোতার পথ প্রশস্ত হলেও প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে নিয়ে সংকট কাটছে না আওয়ামী লীগে।

এসকে সিনহা প্রধান বিচারপতি থাকাকালে আওয়ামী লীগ রায়ের রিভিউ করতে চায় না বলে দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেছে, এসকে সিনহাকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না আওয়ামী লীগ; উল্টো তার হাত দিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটারও শঙ্কা দলের সিনিয়র নেতাদের।

আগামী জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না আওয়ামী লীগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে আগামী ৩১ জানুয়ারি।

সূত্র জানায়, গত ২৩ আগস্ট প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গহওর রিজভীর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর আইনগতভাবে সমঝোতার পথ প্রশস্ত হয়েছে। ঈদের দিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান বিচারপতির সাক্ষাতও সংকট কাটাতে কাজ করেনি।

ওই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা শেষে চলমান জটিলতা নিরসনে নির্বাহী ও বিচার বিভাগ উভয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এ কারণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগের দাবিতে দেওয়া আল্টিমেটামের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেননি আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের একমাত্র সংগঠন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতারা।

তবে এসকে সিনহা ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও যেকোনো সময় তিনি বিগড়ে যেতে পারেন বলেন আশঙ্কা আওয়ামী লীগের। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালও করতে পারেন এসকে সিনহা-এমন আশঙ্কাও করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কবর হয়েছে। এটা পুনর্বহালে কেউ হাত দিতে চাইলে তার হাত পুড়ে যাবে।’

আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, সরকারের বিরুদ্ধে নতুন নতুন চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তবে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতিও সরকারের রয়েছে। সূত্র জানায়, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ ইস্যুটি নিয়ে বিএনপি ষড়যন্ত্র করছে, এমন ইঙ্গিত পেয়েছে ক্ষমতাসীনরা। ধীরে ধীরে অন্য মহলও ইস্যুটি পুঁজি করে নানান খেলায় মেতে উঠতে পারে।

তাই এটি জিইয়ে রেখে ষড়যন্ত্রেও খেলা বাড়তে দিতে চায় না ক্ষমতাসীন দল। প্রধানমন্ত্রী প্রধান বিচারপতির বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত ও অবস্থান নিয়ে রাখলেও বাস্তবায়নে যেতে পারছে না। কারণ সামনে জাতীয় নির্বাচন। আর নর্বাচনের আগে ষড়যন্ত্র শুরু হয় নানামুখী। তাই এখন আওয়ামী লীগের কৌশল হলো- কিছুটা কঠোর ও কিছুটা আপস করা।

জানা গেছে, সরকারের নীতি নির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করেন, ষোড়শ সংশোধনীর রায় সরকারকে বিব্রত করলেও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ আত্মঘাতী হয়ে যেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা হিসেব মিলিয়ে এখনো সমঝোতা করে চলার ব্যাপারেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে থাকলেও প্রধান বিচারপতিকে এখনই সরাতে চায় না সরকার। তবে প্রধান বিচারপতি বিব্রত হয়ে নিজে থেকে সরে দাঁড়ালে আওয়ামী লীগ মহাখুশি। আপাতত এই কৌশল গ্রহণ করে জানুয়ারিতে প্রধান বিচারপতির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় পার করতে চায় সরকার।

আর রিভিউটা এসকে সিনহার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেই করতে চায় আওয়ামী লীগ। সূত্র জানায়, সংবিধান ও রাষ্ট্রপতির হাতে থাকা ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়া অনেকখানি ‘রিস্ক’ মনে করায় এখনি এ সিদ্ধান্ত নিতে চায় না তারা। এক্ষেত্রে আরও ধৈর্য ধারণ করতে চায় সরকার। তবে ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে সংবিধানে থাকা এখতিয়ার অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে যাবে ক্ষমতাসীনরা। জানা গেছে, আরও একটি বিকল্প চিন্তা ভর করেছে সরকারের ভেতরে।

তা হলো ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে পরবর্তী প্রধান বিচারপতি যিনি হবেন, তিনি কতখানি আস্থাশীল হবেন, তা নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কয়েক জন নেতা জানান, প্রধান বিচারপতির প্রতি তাদের আস্থা-বিশ্বাস একেবারেই তলানিতে, এটা ঠিক। কিন্তু পরে যিনি প্রধান বিচারপতি হয়ে আসবেন, তিনি যে আরও জটিলতা সৃষ্টি করবেন না, তার নিশ্চয়তা কতটুকু?

ফলে সিদ্ধান্ত যেটাই হোক না কেন, এক্ষেত্রে সময় নিতে চায় সরকার। আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, ‘সরকারের হাতে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ রয়েছে, যা বিকল্প অপসন হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে। ৯৭ অনুচ্ছেদকে সরকার মনে করছে তাদের হাতে সর্বশেষ অস্ত্র।

আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা’ ও ‘একক নেতৃত্ব’-এই দু’টি ইস্যু আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তবে প্রধান বিচারপতি আরও অপ্রত্যাশিত কোনো কাজ করে বা বক্তব্য দিয়ে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেন কিনা এসব ইস্যুও আওয়ামী লীগকে ভাবাচ্ছে। ফলে বিষয়গুলো মাথায় রেখেই জানুয়ারি পর্যন্ত সতর্ক থাকবে দলটি।

সর্বশেষ গণভবনে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর যৌথসভায়ও দলীয় নেতাকর্মীদের জানুয়ারি পর্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, জানুয়ারির মধ্যে যেন কারও বক্তব্য বা কাজের জন্য দলকে বেকায়দায় পড়তে না হয়, সেদিকে সবাইকে বিশেষ নজর রাখা এবং সহনশীল থাকতে বলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এব্ং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে তা আইনগতভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে। এ ব্যাপারে সমঝোতার প্রক্রিয়া থেমে নেই। ইতিমধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। তিনি বলেন, একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি সমঝোতার পর্যায়ে আছে। সাংবিধানিকভাবে আইনগত প্রক্রিয়ায় এর সমাধান হতে পারে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close