ফিচার

সুচি বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছেন

সুফিয়া আহমেদ: এক সময় আমি অং সান সুচিকে আমার জীবনের সর্বোত্তম মডেলদের একজন হিসেবে দেখতাম। কিন্তু এখন তিনি বিশ্বাসঘাতকতায় পরিণত হয়েছেন। আব্রাহাম লিঙ্কন একবার বলেছিলেন, ‘প্রায় সব মানুষই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে থাকে। কিন্তু যদি আপনি একজনের চরিত্র সম্পর্কে পরীক্ষা নিতে চান তাহলে তাকে ক্ষমতা দিন’। এখন আব্রাহাম লিঙ্কনের সেই উদ্ধৃতি দুঃখজনক হলেও যোগ্য হয়ে উঠেছে অং সান সুচির ক্ষেত্রে।

ন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে এক নিবন্ধে এসব কথা বলেছেন লেখিকা সুফিয়া আহমেদ। তার জন্ম ভারতে। শিশু অবস্থা থেকেই তিনি বসবাস করছেন বৃটেনে। ল্যাঙ্কাশায়ারের বল্টনে তার বসবাস ছিল। সেখান থেকে এখন রয়েছেন লন্ডনে। তিনি লিখেছেন উপন্যাস ‘সিক্রেটস অব দ্য হেনা গার্ল’।

সুফিয়া দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে তার নিবন্ধে লিখেছেন, কয়েক বছর আগে আমার লেখা এই উপন্যাসটি প্রকাশের আগে আমার কাছে নারী রোল মডেলদের একটি তালিকা চাওয়া হয়েছিল। আমার উপন্যাসটি একজন বৃটিশ বালিকাকে নিয়ে। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান। এ জন্য আমার কাছে ওই তালিকা চাওয়া হয়েছিল। তাতে আমি জয়ী হয়েছিলাম। আমার প্রকাশক হয়তো ভেবেছিলেন, মানবাধিকারের পক্ষে উপন্যাস লেখায় যেসব নারী আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তাদের তালিকাটি হবে খুবই চমকপ্রদ। ক্ষমতাধর নারীদের নিয়ে ইতিহাসের পাতা ভরা। তারা নিষ্ঠুরতা ও নিষ্পেষণমূলক ভূমিকায়ও ছিলেন।

কিন্তু আধুনিক সময়ে অধিকতর নায়কোচিত কে অথবা রোজা পার্কসের মতো তালিকায় কে থাকতে পারেন? অবশ্যই এ তালিকার একজন ছিলেন অং সান সুচি। তিনি তার নিজের দেশে গণতন্ত্রের জন্য ও মানবাধিকারের জন্য ছিলেন একজন অক্লান্ত যোদ্ধা। গণতন্ত্রের জন্য অহিংস আন্দোলন ও মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে মানবাধিকারের জন্য তাকে ১৯৯১ সালে দেয়া হয় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। সুচির গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ছিল ব্যক্তিগত যোগাযোগ।

সুফিয়া আহমেদ আরো লিখেছেন, ১৯৬২ সালের ২রা মার্চ বেসরকারি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের। সেই থেকে বহু মানুষ তাদের জীবন-জীবিকা হারিয়ে পালিয়েছেন মিয়ানমার থেকে। তারা আশ্রয় নিয়েছেন বৃটেনেও। এমন অনেক আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে তাদের কাহিনী শুনতে শুনতে বড় হয়েছি আমি। আমার এসব আত্মীয়-স্বজন রোহিঙ্গা নন। তারা ছিলেন ভারতের গুজরাটের অধিবাসী। বাণিজ্যের কারণে এক পর্যায়ে বসতি স্থাপন করেন মিয়ানমারে।

ওই সময় মিয়ানমার ছিল বৃটিশ ভারতের একটি প্রদেশ। সেখানে বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছিল বৃটিশ সরকার। আমার কাছে অং সান সুচি হয়ে উঠেছিলেন একজন হিরোইন। তিনি শুধু ভবিষ্যতের জন্যই লড়াই করছিলেন না। পাশাপাশি সবকিছু হারিয়ে ১৯৬২-৬৩ সালে যেসব মানুষ শরণার্থী হয়েছিলেন তাদের জন্য ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করছিলেন তিনি। তাদের মধ্যকার অনেক আত্মীয়-স্বজন ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি বসতি স্থাপন করেন বৃটেনে।

তারপর থেকে তারা এখানেই বসবাস করতে থাকেন। ইয়র্কশায়ার ও ল্যাঙ্কাশায়ারে উল ও কটন কারখানা স্থাপন করে তারা তাদের জীবনযাত্রা আবার শুরু করেন। এ জন্যই সুচি আমার তালিকায় ছিলেন। সুফিয়া আহমেদ আরো লিখেছেন, যে জন্য তিনি ১৫ বছর ধরে গৃহবন্দি ছিলেন সেই প্রতিশ্রুতি, নীতি থেকে কিভাবে তিনি সরে আসতে পারেন। তাকে দেখা হতো আধুনিক সময়ের ম্যান্ডেলা, কিং অথবা গান্ধী হিসেবে। সবার বৈশিষ্ট্যই যেন তার মাঝে ছিল। তিনি পশ্চিমাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাকে পশ্চিমারা চেনে ‘দ্য লেডি’ হিসেবে। আমরা এমন ধারণাকে সমর্থন দিতে পছন্দ করতাম। তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে। বিয়ে করেছিলেন ইংলিশ একজন শিক্ষাবিদকে।

অন্যভাবে বলা যায়, তিনি আমাদেরই একজন ছিলেন, যিনি (মিয়ানমারে) গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে লড়াই করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন, প্রতিকূতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় প্রায় সব মানুষ। কিন্তু আপনি যদি কোনো মানুষের চরিত্র পরীক্ষা করতে চান তাহলে তাকে ক্ষমতা দিন। লিঙ্কনের এই উদ্ধৃতি দুঃখজনক হলেও যোগ্য অং সান সুচির ক্ষেত্রে। তাকে যেন এই উক্তি আষ্টেপৃষ্ঠে আবৃত করে রেখেছে। তাকে যারা আধুনিক যুগের সেইন্ট বা সাধু হিসেবে দেখতেন তাদের অনেকেই তার ক্ষমতায় আরোহণের পর হতাশ হয়েছেন। তার সম্পর্কে তাদের ধারণা যেন এক বিভ্রাটে পরিণত হয়েছে।

সুফিয়া আহমেদ আরো লিখেছেন, ২০১৫ সালের নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয় অং সান সুচির রাজনৈতিক দল (এনএলডি)। তিনি ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু আমরা দেখতে পাই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কমার পরিবর্তে বেড়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট ও জীবিতদের সাক্ষ্য থেকে পরিষ্কার যে, সেখানে জাতি নির্মূল চলছে।

অং সান সুচি এ ব্যাপারে একেবারে নীরব রইলেন।

তিনি জাতিসংঘের তদন্তকারী ও বিশ্ব মিডিয়ার সাংবাদিকদের রাখাইনের দুর্গত এলাকায় যেতে অনুমতি দেন নি। সেখানে রোহিঙ্গাদের গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, তিনি জাতিসংঘের সব রকম ত্রাণ সহযোগিতাকে আটকে দিয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে কয়েক দিনে এক লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আরো হাজার হাজার মানুষ, যারা পালাতে পারেন নি, তারা আত্মগোপন করে আছেন জঙ্গলে। বাতাসে খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে, প্রমাণ লুকানোর জন্য সেনাবাহিনী মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে ফেলছে। সেনাবাহিনীর গণহত্যার এই বীভৎসতায় আরেক নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি ওই বিবৃতিতে সহিংসতার জন্য অং সান সুচিকে নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

দৃশ্যত, একবিংশ শতাব্দীর আইকন আর নন অং সান সুচি। অথচ পশ্চিমে অবস্থানরত আমরা তাকে আইকন হিসেবেই কল্পনা করেছিলাম। ভেবেছিলাম তিনি তা হয়ে উঠবেন। নারী মডেলের তালিকায় তো তিনি থাকেন, যিনি সবার জন্য সুবিচারকে উৎসাহিত করেন।

এক্ষেত্রে অং সান সুচির নীরবতা বলে দেয়, তিনি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার চেয়েছিলেন শুধু নিজের জন্য, রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, যাদেরকে তিনি ‘আদার’ বা অন্য মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এখনো অনেকে আছেন, যারা রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগে অং সান সুচির নীরবতাকে নিরপেক্ষতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। পাওলো ফ্রিয়ার বলেছেন, শক্তিধর ও শক্তিহীনের মধ্যকার সংঘাত থেকে কেউ যদি নিজেকে সরিয়ে রাখেন তার অর্থ হলো তিনি শক্তিধরের সঙ্গে আছেন, নিরপেক্ষ নন।

সুফিয়া আরো লিখেছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোয় নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করতে পারেন না অং সান সুচি। দেশের নেত্রী হিসেবে তিনি এই দুষ্কর্মে সহযোগিতাকারী। অনেক মানবাধিকার বিষয়ক কর্মীরা তার বিশ্বাসঘাতকতা অনুভব করতে পারছেন।

অথচ তার ক্ষমতায় আরোহণের প্রশংসা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, বৃটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন। সম্ভবত সুচির মানবাধিকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকার কারণে তারা তাদের নিন্দা জানিয়ে টুইট করা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি মনে করি তারা এখনো হতাশায়। তাদের মুখে কোনো কথা নেই।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close