এশিয়া জুড়ে

মিয়ানমারে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ ও জড়িতদের শাস্তি চায় যুক্তরাষ্ট্র: ভিন্ন সুর চীন ও রাশিয়ার

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: রাখাইনে সামরিক অভিযান বন্ধের জোর দাবি জানালেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরাঁ।

তিনি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতাকে ইংরেজিতে

হিউম্যানিটারিয়ান নাইটমেয়ার বা মানবতার বিকট আতঙ্ক হিসেবে অভিহিত করেছেন। সতর্কবার্তা দিয়েছেন এই অভিযান বন্ধ না হলে সহিংসতা আরো ছড়িয়ে পড়বে। আরো বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হবে।

বাংলাদেশের স্থানীয় সময় রাত একটার দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার সঙ্কট নিয়ে উন্মুক্ত বিতর্কে তিনি এসব কথা বলেন। ওদিকে মিয়ানমারের কাছে সব দেশকে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

একই সঙ্গে জাতি নিধনে যেসব নেতা, বিশেষ করে সামরিক নেতা জড়িত তাদের শাস্তিও দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি নিরাপত্তা পরিষদের ওই অধিবেশনে এসব দাবি উত্থাপন করেন। এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতাকে জাতি নিধন বলে অভিহিত করলো। পাশাপাশি শাস্তি দাবি করলো সেনা কর্মকর্তাদের।

নিকি হ্যালি বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নৃশংসতা চালাচ্ছে। তারা জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নিধন অভিযান চালাচ্ছে। এ অবস্থায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাতে আমাদের ভীত হওয়া চলবে না।

তবে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ও ব্যাপক সংখ্যক মানুষের বাংলাদেশে চলে যাওয়ার কারণে মিয়ানমার সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া হলে তাতে মিয়ানমার ও এর আশপাশের পরিস্থিতিকে আরো উত্তেজিত করবে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত। ভাসিলি নেবেজিয়া।

এক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক উপায় ও আলোচনার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। বলেন, আলোচনা হতে হবে মিয়ানমারের সব জাতি ও ধর্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে। একই সঙ্গে তিনি সব পক্ষের তরফ থেকে সহিংসতা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন। এ সময় তিনি মিয়ানমার সরকারের সুরে সুর মিলান।

বলেন, রাশিয়া যেসব তথ্য পাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলো থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করছে। তিনি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘সন্ত্রাসীরাই’ গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

ওদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের উপ রাষ্ট্রদূত উয়াউ হাইতাও মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সহিংসতার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে চলে গিয়েছেন তাদের সমস্যা দ্রুততম সময়ে সমাধান হওয়ার মতো নয়। এ সময় তিনি মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন।

বলেন, আভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় মিয়ানমার সরকারকে সমর্থন করে চীন। তাই তিনি বলেন, এই সঙ্কট সমাধানে সব পক্ষকেই গঠনমুলকভাবে কাজ করতে হবে, উত্তেজনা নিরসন করতে হবে, ধাপে ধাপে মানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে। তিনি আশা করেন, শিগগিরই সেখানে শৃংখলা ফিরবে। সাধারণ মানুষের ওপর আর সম্ভবত কোনো ক্ষতিকর কোনো কিছু ঘটবে না। সমাজে ফিরবে স্থিতিশীলতা। অন্যদিকে রাখাইন সহিংসতায় নিজেদের দায় বেমালুম এড়িয়ে গেছেন মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইউ থাউং তুন।

তিনি নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, রাখাইন সঙ্কট ধর্মের ভিত্তিতে নয়। এ সঙ্কটের মূলে রয়েছে সন্ত্রাস। তাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যাতে তার দেশের বিরুদ্ধে যেন কোনো পদক্ষেপ না নেয় এমন আহ্বান জানান তিনি। তিনি আবারও বলেন, জাতিগত নিধন হয় নি মিয়ানমারে। কোনো গণহত্যাও চালানো হয় নি।

তিনি দাবি করেন বর্তমান সঙ্কটের জন্য দায়ী রোহিঙ্গা মুসলিম উগ্রপন্থিরা। তাদের সহিংসতার জন্যই মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য হয়েছে। ওদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, মিয়ানমার সরকার অভিযান বন্ধের কথা বললেও এখনও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হয় নি।

এর ফলে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন কমপক্ষে ৫ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৯ লাখ সদস্য এখন বাংলাদেশে। তিনি এই পরিস্থিতিকে সমর্থন অযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেন। আবারও জাতিসংঘের কাছে আহ্বান জানান মিয়ানমারের ভিতরে একটি সেফ জোন সৃষ্টি করতে।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, শরণার্থীরা বলছেন তাদের ওপর কিভাবে গণধর্ষণ করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমার ছাড়া করতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে মিয়ানমার। পাশাপাশি গ্রাম জ্বালিযে দিচ্ছে। লোকজনের সব কিছু কেড়ে নেয়া হচ্ছে। তাদেরকে নির্যাতন করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, এইসব নৃশংসতা প্রমাণ করে যে, মিয়ানমার সরকার রাখাইনকে জনশূন্য করে দেয়ার জন্য অস্ত্র হিসেবে অগ্নিসংযোগ ব্যবহার করছে। ওদিকে নিকি হ্যালি জাতি নিধনের এই খেলায় জড়িত নেতাদের অবিলম্বে তাদের কমান্ডের দায়িত্ব থেকে অবিলম্বে অব্যাহতি দাবি করে এই অপরাধের জন্য বিচার দাবি করেছেন।

জাতিসংঘের একটি প্যানেল যে এলাকায় রোহিঙ্গাদের নিধন করা হয়েছে বা হচ্ছে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু মিয়ানমার সরকার সেই অনুমতি দেয় নি। এরই প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এমন ঝাঁঝালো প্রতিক্রিয়া এলো। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী কমপক্ষে ৫ লাখ এক হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে নির্বিচারে চলছে গণধর্ষণ, গণহত্যা। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে।

ওদিকে বৃহস্পতিবার শতাধিক রোহিঙ্গা বোঝাই করে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করার পর একটি নৌকা বঙ্গোপসাগরে ডুবে গেছে। এতে কমপক্ষে ১৫ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ৯ টি শিশু রয়েছে। এ তথ্য দিয়েছে অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)।

এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এপি, অনলাইন স্কাই নিউজ। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় গতকাল বিকাল তিনটায় (বাংলাদেশ সময় রাত একটায়) এ বিতর্ক শুরু হয়। এতে অ্যান্টনিও গুতেরাঁ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে যে সহিংসতা চলছে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপার তা রাখাইনের মধ্যাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ওই এলাকায় এখন আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছেন। তাদের জীবন এতে আরো ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সহিংসতা বর্তমান বিশে^র দ্রুততম শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এতে মানবাধিকার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিয়ে গিয়েছে।

তিনি বলেন, রাখাইন থেকে শিশু, নারী, পুরুষ, বয়স্ক মানুষ এরই মধ্যে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে। তারা সেখানে সংঘটিত অপরাধের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে গা-শিউরে ওঠে। তাদের দেয়া সাক্ষ্যে প্রমাণ করে সেকানে মানবাধিকাােরর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সহিংসতা, শক্তি প্রয়োগ ও আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে বৈষম্যহীনভাবে অস্ত্রের ব্যবহার। সাধারণ মানুসের বিরুদ্ধে স্থলবোমার ব্যবহার করা হয়েছে। যৌন সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, মিশর, সেনেগাল ও কাজাখস্তানের আহ্বানে শুরু হয় নিরাপত্তা পরিষদের এ বৈঠক। এতে বক্তব্যে মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরাঁ বলেন, অবিলম্বে আক্রান্ত এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার সুযোগ দিতে হবে।

জাতিসংঘ ও সাহায্য বিষয়ক গ্রুপগুলোর প্রতি বর্তমান যে বিদ্বেষমুলক পরিস্থিতি সেখানে বিরাজ করছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close