জাতীয়

তরুণদের হতাশা দূর করতে হবে রাষ্ট্রকেই

তরুণ সমাজ একটি জাতির স্বপ্ন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধের অবক্ষয়- এ বিষয়গুলো দেশের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে উজ্জ্বল কোনো ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে পারছে না তরুণরা। তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। এ থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা নিতে হবে। এজন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে তরুণদের সম্পৃক্ত করা, তাদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

বুধবার (১ নভেম্বর ২০১৭) জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে ‘যুবদের জাগরণ, বাংলাদেশের উন্নয়ন’ শীর্ষক তরুণদের এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সকাল ১১টায় লালমাটিয়ায় সিডিএসবি মিলনায়তনে সভার আয়োজন করে ইয়ং জার্নালিস্ট ফোরাম বাংলাদেশ। এতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ হাসান।

আলোচনায় অংশ নেন টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা মাহবুব মুকুল, মিডিয়া মিক্স কমিউনিকেশন্সের ব্যবস্থাপক মানজুর হোসাইন, টেক ডেকোরের প্রধান নির্বাহী সাইফ মাহদী, সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক কাজী মুস্তাফিজ, রানার বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট শাফি হাসান, সদস্য আবদুর রাজ্জাক, দ্যা একটিভ সার্ভিসেসের প্রধান নির্বাহী তুহিন ভূইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষার্থী তাজওয়ার কাশেম, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ জামাল, ইয়ুথ ইন টেকের এক্সিকিউটিভ রুবেল আহমেদ প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যে আব্দুল্লাহ হাসান বলেন, তরুণ সমাজ একটি জাতির স্বপ্ন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধের অবক্ষয়- এ বিষয়গুলো দেশের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে উজ্জ্বল কোনো ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে পারছে না তরুণরা। তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। এ থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রকেই ভূমিকা নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু উন্নয়নভিত্তিক বাস্তবমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তরুণদের সম্পৃক্ত করা। দেশের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে তারা অসম্ভবকে সম্ভব করবে।

মাহবুব মুকুল বলেন, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই যুবক। তারাই আগামী দিনে দেশের নীতি-নির্ধারণীর ব্যাপারে নেতৃত্ব দেবে। তাই যুবকদের মতামত নিয়ে তাদের দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা গেলে সরকারের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন করা কষ্টসাধ্য কোনো বিষয় হবে না।

কাজী মুস্তাফিজ বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের তরুণরা এগিয়ে আছে। এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনেক তরুণ ঘরে বসেই বিদেশী মুদ্রা আয় করছে। তবে অনেক তরুণ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানে না। অথচ এই সময়টা যে দেশ যত বেশি প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে সে দেশ ততো দ্রুত উন্নয়ন করবে। আর আমাদের দেশে তরুণদের সংখ্যা বেশি। তাদের সঠিক প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভবনায় একটি দ্বার খুলে যাবে।

শাফি হাসান বলেন, বর্তমান প্রজন্মের নৈতিকতার ভিত্তিও বেশ দুর্বল। শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যবোধের চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি রাজনীতিতেও ইতিবাচক কাজের চর্চার অভাব তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। যে বয়সে তরুণদের মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াবার কথা সে বয়েসে তা বেঁকে যাচ্ছে। তরুণদের মধ্যে ঐক্যের অভাবও আজ লক্ষ্যণীয়। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রায়ই গঠনমূলক কোনো প্রতিবাদে তারা অংশ নিতে পারেন না। তরুণরা যদি সত্য ও ন্যায়বোধ থেকে জাগরিত হয় তাহলে কোনো বাধাই তাদের থামাতে পারবে না।

সাইফ মাহদী বলেন, পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। এ পরিবর্তিত পৃথিবীতে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশকে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। একটি সুন্দর, সুখী বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। সব বাধা-বিপত্তি পেছনে ফেলে তরুণরা যদি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে কাজকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে আমাদের দেশের জন্য তা হবে ইতিবাচক।

তুহিন ভূইয়া বলেন, সমাজে বসবাসরত প্রতিটি মানুষের দায়বদ্ধতা রয়েছে। যার যার অবস্থান থেকে দেশের কল্যাণে কাজ করলে তা হবে দেশপ্রেমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর তরুণরা হবে সে পথের যাত্রী।

মানজুর হোসাইন বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে সমাজ পরিবর্তনে নতুন যুগের লক্ষ্যে। এ পরিবর্তন বা নতুন যুগের সূচনায় হচ্ছে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণ। অনাগত প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর, সমাজ কাঠামো নির্মাণ। এটাই তরুণদের জীবন দর্শন হওয়া উচিত।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থার তথ্য মতে বাংলাদেশ সেইসব ভাগ্যবান দেশের তালিকায় আছে যেসব দেশে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম তরুণ রয়েছে। কাগুজে ভাষায় এই বাড়তি সুবিধাকে বলা হচ্ছে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হচ্ছে সেই অবস্থা যখন একটি দেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ বা তার কাছাকাছি সংখ্যক মানুষের বয়স থাকে ১৫ থেকে ৫৯ বছর। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে বাংলাদেশের ৪০ শতাংশ তরুণই নিষ্ক্রিয়।

বিশ্বের তরুণদের নিয়ে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করা বিভাগ ইউএন ডেসা (ইউনাইটেড ন্যাশনস ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স) কর্তৃক চলতি বছর প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, যে ধরনের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে তরুণেরা বসবাস করে, সেটার ওপর নির্ভর করে ওই পরিবেশে তারা কতটুকু যুক্ত হচ্ছে বা মানিয়ে নিচ্ছে। অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার, রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারার মতো বিষয়গুলো দীর্ঘ মেয়াদে একজন তরুণকে ব্যক্তিগতভাবে ও সমাজকে লাভবান করতে পারে।

অন্যদিকে ভালো কাজের অভাব, শ্রম অধিকার চর্চার সীমিত সুযোগ এবং সামাজিক সেবা নিতে বাড়তি ব্যয় একজন তরুণের সমাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সামর্থ্যকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ধরনের পরিস্থিতি বৃহৎ পরিসরে উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ওআরজি-কোয়েস্ট পরিচালিত তারুণ্য জরিপ ২০১৭ অনুযায়ী, প্রায় ৭৪ শতাংশ তরুণ দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু তারপরেও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র নিয়ে ভরসা করতে পারছে না ৮২ শতাংশের বেশি তরুণ। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থানের যথেষ্ট সুযোগ তৈরি না হওয়ায় এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির যে মন্দা, তাতে তারা নিজেদের নিয়ে খুব আশাবাদী হতে পারছে না।

আবার জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৬৩ শতাংশই বলছে, তারা জানে না তাদের জীবনের লক্ষ্য কী। দেশের দুর্নীতি নিয়ে তারা চিন্তিত, দেশের আইনকানুন নিয়ে আছে তাদের উদ্বেগ, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও তরুণেরা চিন্তিত। ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ তরুণ উদ্বিগ্ন তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই। সব মিলিয়ে উজ্জ্বল কোনো ভবিষ্যতের ছবি নিজেরাই আঁকতে পারেনি তরুণেরা। সার্বিকভাবে তরুণদের এই হতাশা দূর করতে ভূমিকা নিতে হবে রাষ্ট্রকেই।

-প্রেরিত সংবাদ

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close